ঔপনিবেশিক মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতেই হবে

-কৃষ্ণস্বামী বিজয়রাঘবন
সচিব, জৈব-প্রযুক্তি দপ্তর, ভারত সরকার

উদ্ভাবনী ক্ষমতার প্রকাশ এবং বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের ক্ষেত্রে মতামত দেওয়া নেওয়ার প্রধান মাধ্যম কোন ভাষা হবে তার ওপর ভিত্তি করে পৃথিবীতে প্রতিনিয়ত এক বিশেষ ভারসাম্যহীনতা এবং কৌলীন্যের ব্যবধান তৈরী হয়। এই মুহুর্তে এই অসাম্য এবং আভিজাত্যের মূল ভিত্তি হচ্ছে ইংরেজি ভাষার অবিসংবাদী আধিপত্য। এটা মনে রাখা দরকার যে পশ্চিমের দেশগুলি তাদের চিন্তার প্রভাববিস্তারের ক্ষেত্রে নিজেদের ভাষাকে খুবই মুন্সীয়ানার সাথে ব্যবহার করেছেন। একাজ তারা করেছে তাদের নিজ নিজ ভাষার প্রায়োগিক বিকাশ ঘটিয়ে এবং তা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিতে পারে। সব মানুষই আপন আপন ভাষায় ভাবেন, স্বপ্ন দেখেন এবং নিজস্ব ভাবনাকে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেন। চিন্তার উদ্ভব এবং বিকাশের কাজটা সব থেকে ভালো করা যায় নিজের ভাষায়। এটা মনে রাখা দরকার যে কোনো ব্যক্তি বা জনসমষ্টি যদি নিজের ভাষার ওপর দখল না অর্জন করেন এবং তা বিজ্ঞানের অঙ্গনে প্রয়োগ না করেন – তাহলে অন্যের চিন্তার – কিংবা অন্যের ভাবনার অনুসারী পরিচিতি পাওয়া যেতে পারে। নেতৃত্ত্ব দিতে গেলে কাজটা করতে হবে নিজের ভাষায়।
নিতান্তই দুঃখের সাথে বলতে বাধ্য হচ্ছি যে রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক দাসত্ব থেকে মুক্তি পাওয়ার সাথে সাথে বৌদ্ধিক উপনিবেশের বেড়াজাল থেকে মুক্তি পাওয়ার কাজটা আমরা এখনও করে উঠতে পারিনি। আর এটা না ঘটার অন্যতম কারণ হচ্ছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, শিক্ষা ও চর্চার ক্ষেত্রে আমরা ইংরেজি ভাষার উপর অন্ধ নির্ভরতার বাইরে বেরিয়ে আসতে পারিনি। এতে আমরা হারিয়েছি অনেক কিছু। ব্যতিক্রম নেই যে তা নয়। কিন্তু দ্বিধাহীন কন্ঠে একথা বলতে পারি যে যতদিন ইংরেজি উন্নত বিজ্ঞান আলোচনার একমাত্র মাধ্যম থাকবে ততদিন আমাদের দেশের সবথেকে অগ্রণী বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠানগুলিও পারবে না বিশ্বশাসনের ক্ষমতা অর্জন করতে। এরই অনুষঙ্গ হিসেবে আমাদের সবথেকে উজ্জ্বল বিজ্ঞান মস্তিষ্কগুলি পরিচিতি পাবে এই বলে যে তারা নিদারুণ দক্ষতায় অন্যের ভাবনার সফল প্রয়োগ করতে পারেন। আর এই কাজ করতে করতে আমাদের বিজ্ঞানীদের বৌদ্ধিক নেতৃত্ত্ব দেওয়ার ক্ষমতাও ক্রমশ কমে আসবে। কিছু মানুষ অবশ্যই এত প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজেদেরকে মেলে ধরবেন। কিন্তু এটাই হবে সাধারণ চিত্র। ফলে আমাদের বুদ্ধিজীবীরা ক্রমাগত পৃথিবীর অঙ্গনে উপস্থিতির ও দৃশ্যমাণতার জায়গায় ক্ষীণকায় হবেন। শ্রেষ্ঠত্ব তো অনেক দূরের বিষয়।


অন্য ভাষার বলগাহীন আধিপত্যে আরও একটা ক্ষতিকারক প্রভাব আছে। তা হচ্ছে এই যে বৌদ্ধিক আভিজাত্যের বারান্দায় প্রবেশের দরজা সাধারণ মানুষের জন্য বন্ধ হয়ে থাকে। এরফলে সমাজের ব্যাপকতর অংশের মানুষের ভাব এবং ভাষার সাথে পেশাগত ক্ষেত্রে যারা নেতৃত্ব দেন তাদের যোগাযোগ কমে যায়। এতে বিজ্ঞানীরা সম্মান পেতে পারেন দূর থেকে, সমীহও করেন মানুষ তাদেরকে। কিন্তু তাঙ্করেন ব্যবধান রেখেই। বিজ্ঞানীরা যে সমাজের সকলের জন্যই কাজ করেছেন তা বোঝানোর জায়গাটাও কঠিন হয়ে পড়ে। আর এই দূরত্ব সমাজকে ক্রমশঃ দুর্বল করে এই ভাবে যে জ্ঞান অর্জনের প্রয়োজনীয়তা মানুষ গুরুত্ব দিয়ে বুঝতে পারেন না। চিন্তার দিক দিয়ে এগিয়ে থাকাটা যে সমাজের সামনে চলার অঙ্গ তা বুঝতেও পারেন না বেশিরভাগ মানুষ। এতে সমাজে পড়াশুনোর প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। একে বলা যেতে পারে জ্ঞান চর্চার প্রতি সমাজের অভিমান। যা আমার কাজে লাগে না, বুঝিও না যা, যে জিনিস সমাজের কিছু মানুষই শুধু ব্যবহার করেন বৃহত্তর সমাজ তার থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকে।
অন্যদিকে, পৃথিবীতে অনেক দেশ এবং জাতি আছে যারা এক্ষেত্রে বানিয়েছে নতুন নতুন উদাহরণ। এক দিকে নিজের ভাষার প্রশস্ত অঙ্গনে নিজের বিজ্ঞান ভাবনাকে বিকশিত করার ক্ষেত্র তৈরি করেছে এই জাতিগুলি। অন্যদিকে, এই চর্চার ব্যাপকতার ফলে এই দেশগুলিতে তৈরী হয়েছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বিশ্বশাসন ও দেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতাশালী এক বৌদ্ধিক সমাজ। জার্মানিতে বিজ্ঞানের ছাত্ররা জ্ঞান অর্জন ও প্রয়োগ করেন মূলত জার্মান ভাষায়। কিন্তু তারা ইংরেজি ভাষাতেও সমান ভাবে সাবলীল। উল্লেখ্য যে, জার্মানির অনেকগুলো আন্তর্জাতিক গবেষণাগারে ইংরেজিতেই ভাব বিনিময় ও বিজ্ঞান চর্চা হয়। কিন্তু এর প্রাথমিক ভিত্তি হিসেবে জার্মানির বিজ্ঞানীরা নিজেদেরকে তৈরী করেন নিজের ভাষায় বিজ্ঞান চর্চার মধ্য দিয়েই। এরই বিপরীত মেরু আমরা ভারতবর্ষ। একমাত্র ইংরেজিকেই আমরা বিজ্ঞান ভাবনা ও চর্চার ভাষা হিসেবে জায়গা দিয়ে আমরা কখনও বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত শক্তি হিসেবে পরিচয় অর্জন করতে পারিনি।


দেশীয় ভাষায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষণ নিয়ে যখনই কোনো আলোচনা হয় তখন মূলত দুটি যুক্তি উঠে আসে তার বিরুদ্ধে। প্রথমটি যথেষ্ট ন্যায্য এবং যুক্তি সঙ্গত। অস্বীকার করার উপায় নেই যে আজকের বিশ্বায়িত পৃথিবীতে ইংরেজি জানাটা অপরিহার্য্য হয়ে পড়েছে মত বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে। এই যুক্তির বিপক্ষে যা বলা যায় তা হল এই যে প্রতিই স্তরে দেশীয় ভাষার ব্যবহার বাড়লে ইংরেজি জানার ও বোঝার ব্যাপারটা দুর্বল হয়ে পড়বে – এ ধারণা ঠিক নয়।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে দেশীয় ভাষার ব্যাপক ব্যবহারের বিরুদ্ধে আরও একটি যুক্তি প্রায়ই শোনা যায়। দেশীয় ভাষার ওপর নির্ভর করে বিজ্ঞানের বিকাশ ঘটানোর চেষ্টা ফলপ্রসূ হবে না এবং এধরণের উদ্যোগ নাকি প্রয়োগ করতে গেলেও হোঁচট লাগবে। স্পষ্ট করে বলা দরকার- এ ভাবনার কোন ভার নেই। এই উদ্যোগ না নেওয়া মানে বৌদ্ধিক জরাগ্রস্ত ও বিকলাঙ্গ দশা থেকে মুক্ত পাওয়া যাবে না। এটা ক্ষতিকারক এজন্যেই যে এক অকর্মণ্য এবং নিস্পৃহ অভিজাতকূল এই ভাবনাকেই জিইয়ে রাখতে চায়। এটা এই মুহুর্তে মাথা থেকে সরানো দরকার এজন্যই যে একাজ করলে ফল পাওয়া যাবে এবং এটা করা সম্ভব মন লাগিয়ে আর নজর দিয়ে করলে।
তাহলে কী করা দরকার?
এদেশের বড়ো অংশের ছাত্রছাত্রীই স্কুল কলেজে বিজ্ঞান পড়েন স্থানীয় অথবা মাতৃভাষায় আর বিশ্ববিদ্যালয়ে তা পড়েন ইংরেজিতে। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান সীমাবদ্ধ থাকে মূলতঃ শহুরে, উচ্চমধ্যবিত্ত কিছু ছাত্রছাত্রীর গ্রহণযোগ্যতার উপর। আরও বোঝা দরকার, যে ইংরেজিতেও যখনও পড়ানো হয়- তখনও তা গুণগত উৎকর্ষের দিক দিয়ে ধারালো হয় না। অনুবাদ নির্ভর বিজ্ঞান শিক্ষা তো আরও ভয়ংকর। এর বিকল্প হিসেবে যা শুরু করা যেতে পারে তা হল- কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়গুলিতে এবং নবোদয় বিদ্যালয়গুলির থেকে শুরু করে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ। প্রথম ধাপ হিসেবে। সাফল্য হতে পারে এরকম যাতে করে ছাত্র একই সাথে মাতৃভাষা এবং ইংরেজিতে বিজ্ঞান শিক্ষা করতে পারে। এই ধরণের দুটি ভাষাতেই বিজ্ঞান শিক্ষা কিন্তু সাধারণ ভাবে ভালোই প্রচলিত আছে বহুজায়গায়। দরকার শুধু এর প্রথাগত স্বীকৃতি। পরীক্ষায় উত্তর দেওয়ার ক্ষেত্রে ছাত্রছাত্রীদের স্বাধীনতা দেওয়া যেতে পারে। তারা মাতৃভাষা কিংবা ইংরেজি- যাতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে তাতেই উত্তর লিখুক। প্রয়োজন হলে দুভাষার সংমিশ্রণও ঘটাক। বিজ্ঞান শিক্ষার এই মিশ্রিত প্রকরণ ও পদ্ধতি প্রয়োগ করতে হবে ধাপে ধাপে। প্রথমে তা করা যেতে পারে কিছু শিক্ষাকেন্দ্র- যে গুলি সাধারণত গুণগত মানের দিক দিয়ে এগিয়ে থাকা বলে পরিচিত। তার পর হতে পারে এর আরো ব্যাপকতর প্রয়োগ। এ কাজে সরকারী এবং বেসরকারী দুধরণের কলেজগুলিকেই অংশ নেওয়া দরকার। ‘স্টেম’ বিষয়গুলি প্রাথমিক ভাবে এই প্রয়োগের ক্ষেত্রে হতে পারে। অবশ্যই এধরণের উদ্যোগ নিতে গেলে তাকে যথেষ্ট আকর্ষক এবং আর্থিক দিক দিয়ে লাভজনক করে তোলা দরকার। নানান নতুন নতুন কারিগরি উপকরণের প্রয়োগ করাই যেতে পারে একে আরও আকর্ষক করার জন্যে। কিন্তু সবার আগে প্রয়োজন গেড়ে বসে থাকা ভাবনাটাকে পালটানোর ইচ্ছে।


সারা পৃথিবী জুড়ে ভারতীয়রা প্রশংসা কুড়ান এই বলে যে আমরা অন্যজাতির মানুষদের থেকে ভালো ইংরেজি বলি। ইংরেজিতে এই তারিফের জায়গাটা অক্ষুণ্ণ রাখা অবশ্যই দরকার। এর পাশাপাশি আমাদের থাকা দরকার সেই ক্ষমতা যা বিজ্ঞানের সব থেকে জটিল ও দূর্ভেদ্য রহস্যগুলো সমাধান করার পথ বার করতে সাহায্য করবে। আর এটা তখনই সম্ভব যখন ফরাসিদের মতো কিংবা ডাচ অথবা জার্মানদের মতো রাজস্থান, কেরালা কিংবা উড়িষ্যার জনপদগুলিতে ছাত্রছাত্রীরা বিজ্ঞানের আলোচনা করবে, চর্চা করবে নিজেদের ভাষায়। বাণিজ্য বিস্তারের কাজে কিংবা বিশ্বজুড়ে যোগাযোগের মাধ্যম হিসাবে গুরুত্বকে কখনও চিন্তার উৎকর্ষ সৃষ্টি আর ভাবনার বিকাশের জন্য তার ভূমিকা কী হবে– এর সাথে এক করা উচিত নয়।

Add Comments