বিজ্ঞান-দৃষ্টি গড়ে তোলার কালক্রম

- উজ্জ্বল কুমার মুখোপাধ্যায়
পরিবেশবিজ্ঞানী ও বিজ্ঞান লেখক

ভাষার কথা ভাবি; ভাবতে ভাবতে ভাসি ভাষার ভাবে। ভাবি আর একটা ভাষার কথা, আমার মা’য়েরটা ছাড়া, যে ভাষায় দু-দুটি দেশের জাতীয় সংগীত লেখা হয়। পৃথিবীতে ভাষা, যা ভাবপ্রকাশের আধার, তাকে নিয়ে যত আলোচনা হয়েছে আর হবে, তার সবচেয়ে বেশী মা’য়ের ভাষার পৃথিবীটাকে চিনতে, জানতে আর বুঝতে শেখা নিয়ে । ন্যাটোর ব্যাটোর ক’রে অন্য ভাষা বলতে পারা- তা সে আধাআধি হলেও। বলতে পারে কেউ, কতো কাজ হ’ল আর কতো চাকরী পেল বাঙালি ফটর ফটর ইংরেজী ব’লে আর কতো মান কতো মর্যাদা আর দিকনির্দেশ হারিয়ে গেল – কতো সত্যেন, মেঘনাদ বা নিদেনপক্ষে টেনিদা ঘনাদারা জন্ম নিতে ভুলে গেল এই ধন ধান্যে পুষ্পে ভরা বসুন্ধরায় শুধুমাত্র ‘না-বাংলা’র আত্মঘাতী অভ্যুত্থানে ? বাংলা শুধু একটা ভাষা না – একটা কৃষ্টি, একটা সংস্কৃতি । এই ভাষাটায় অমৃত ঝরে সমুদ্র মন্থনের পর – সে সমুদ্র জ্ঞানসমুদ্র । কি জাতীয়তা কি বিদ্রোহ কি প্রাণত্যাগের ইতিহাস স্বাধীনতার জন্য – কি কবিতা কি উপন্যাস, কি গাছের প্রাণের গূঢ় তত্ত্ব অথবা অজানা কণার ভর-শক্তির সম্পর্ক নিয়ে আইনস্টাইনের চোখে চোখ রেখে এগিয়ে দেওয়া পৃথিবীটাকে এক লাফে কয়েক দশক । এ সব কিছুতে বাঙালিয়ানার মাঝে আপোষ করতে হয়েছিল নাকি কখনও ? বরং ঠিকঠিক মালুম করতে পেরেছিলেন ব’লেই দাওয়াই ঠাওরেছিলেন সেই সত্যেন বোস- মায়ের ভাষায় বিজ্ঞান চিন্তার দাওয়াই – যাঁর ১২৫ তম জন্মবছর উদযাপনে আগামী বছরভরই বারবার ফিরতে হবে এই আলোচনায় – এসো মায়ের ভাষায় বিজ্ঞান শিখি । পৃথিবীটাকে যে দেখায় অমর হয়েছে বাঙালী, অমর করেছে এক আন্তর্জাতিক সংস্কৃতিকে – ‘বাঙালিয়ানা’ যার নাম ।
মাতৃভাষায়, বিশেষভাবে বলতে গেলে বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান শেখা, মায়ের ভাষাটাকে আলোকবর্তিকা ক’রে বিজ্ঞানের দর্শনটাকে আপন করে নিয়ে যুক্তিবোধের আধারে পৃথিবীটাকে দেখতে, চিনতে, বুঝতে আর সেই মতো নিজের ভূমিকা নির্ণয় করতে পারার আবেদন যে একটা আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তার জন্ম দেবে তা বুঝেছিলেন আচার্য সত্যেন্দ্রনাথ বোস । অবশ্য বাংলায় বিজ্ঞানচিন্তার সেই যে শুরু, তা বলা চলে না । সে কথায় যাওয়ার আগে বাংলা ভাগের সময়কালের দিনগুলোর কথা স্মরণে রাখতেই হবে । সেই রামমোহন বিদ্যাসাগরের হাত ধ’রে রবিঠাকুর-শ্রীরামকৃষ্ণ-নরেন দত্তরা যে কাণ্ডকারখানার জন্ম দিলেন দেশের পূর্বপ্রান্তে, যাতে এক বিশাল জনগোষ্ঠী এই ভাষা ব্যবহারের নিপুণ স্বাভাবিকতায় প্রত্যেকে এক একজন স্বাভাবিক সম্পূর্ণ বিজ্ঞানী হয়ে গড়ে উঠেছেন, যার প্রভাবে অন্য ভাষার মানুষরাও ভারতজুড়ে সম্ভবনার জন্ম দিচ্ছে – এই দিকনির্দেশ বুঝতে পারার মতো ক্ষমতা ব্রিটিশরাজের ছিল । আর ছিল বলেই ছক – শুধু প্রদেশটা নয়, ভাঙার পরিকল্পনা ঐ ভাষার স্যাকরাটিকেও । ফেলে আসা শতাব্দীটায় প্রথমপর্বে বাংলা ভাঙার মোক্ষম আঘাতের সেই ছিল শুরু – যার অন্তরা আমরা দেখেছি ঐ শতাব্দীরই শেষভাগে ইংরাজি কপচিয়ে চাকরি হবার ভ্রান্ত আবেদনে এই বিপুল জনগোষ্ঠীর বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলার আশ্চর্য ক্ষমতার মূলে কুঠারাঘাতের আন্তর্জাতিক চক্রান্তের মাধ্যমে । কর্পোরেটের ইচ্ছাদাস হবার আবেদনে বিজ্ঞান, সংগীত, সাহিত্য – এমন সবকিছুতে শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারকে বাজি রাখার সামাজিক চিন্তা গড়ে তোলা ঐ ভাষাটাকেই আক্রমণের নামান্তর । মাতৃভাষায় বিশ্বদর্শন আর সাজিয়ে গুছিয়ে ইংরাজি বলাকে একে অপরের শত্রুতায় পর্যবসিত করা যে ভাষাটাকেই দুর্বল করলো ! আর বাংলা ভাষায় যদি না পারি, তবে যে অন্য ভাষায় পারবো না – এটার প্রমাণ দিতে আরও কতো পথ পার হতে হবে তার হিসাব রাখে কে ? বাংলা ভাগের সেই আঘাত আজ শতবর্ষ পেরিয়েও সমান মাত্রায় । ঐ ভাষায় ‘মা’ বলে ডাকতে শিখেছি আমরা যারা, যারা ‘বাঙালী’, আজও তাদের সমান দায়িত্ব এই ভাষার উপর আক্রমণের প্রতিরোধ তৈরি করে ধীর পায়ে সেই সমাজবীক্ষা গড়ে তোলা, যা আবার জন্ম দেবে মহাজাতকদের, যারা শুধু বাংলায় নয়, ভারত তথা সারা পৃথিবীর সব মানুষের মানবতার পতাকাধারী হবার ক্ষমতাবান হবে । এই ভাষাকে সেটা আর প্রমাণ করতে হবে না । ইতিহাস ঘষে মেজে পালটে ফেলা যায় না ।
বিষয়টা বাংলায় বিজ্ঞান চিন্তা আর তাতে করে যুক্তিবোধের আলোর চাষ । আমার ভাষায় এর নিদর্শন সুপ্রাচীন ।

সত্যেন্দ্রনাথ বসু

যাঁদের নামোল্লেখে এই প্রতিবেদনের প্রথমভাগ আলোকিত তাঁদের পথ ধরেই বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চার প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন আচার্য সত্যেন্দ্রনাথ বোস । বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদের কার্যকলাপ এক নতুন লহমার দিকনির্দেশ করে । আমরা পাই ‘জ্ঞান ও বিজ্ঞান’-এর মতো পত্রিকা যার দেখানো রাস্তাতেই ধর্ম-জাত নির্বিশেষে পারিপার্শ্বিক দেখতে শেখা বিশশতকের মধ্যভাগে বেড়ে ওঠা বাঙালী মাত্রেই । বিশেষ করে শ্রীযুক্ত গোপাল চন্দ্র ভট্টাচার্য মহাশয়ের ‘প্রাণীবীক্ষণ’ এক নতুন মাত্রা যোগ করে বেড়ে ওঠার সময়কার কিশোর মনের পৃথিবীটাকে দেখতে শেখার চাহিদায় । ‘জ্ঞান ও বিজ্ঞান’ আজও আছে, অবয়ব পরিবর্তনে চাকচিক্যে আধুনিক হলেও বাংলা ভাষায় অন্য সাধারণ সব ম্যাগাজিনের মতোই প্রভাবে অনেক পিছিয়ে । আমাদের দায়িত্ব এই পত্রিকাতে আবার প্রাণপ্রতিষ্ঠা করার ।
কিশোর মনে বিজ্ঞানবীক্ষার বীজবপনের উদ্দেশ্য নিয়ে অনেক প্রচেষ্টা হয়েছে এই বাংলায় । ‘কিশোর জ্ঞান-বিজ্ঞান’ এদের মধ্যে নিশ্চিতভাবে উল্লেখের দাবীদার । অনিয়মিত প্রকাশে প্রভাব হারানো আর ইংরাজি মাধ্যমে স্কুলশিক্ষার সরকারী বেসরকারী পৃষ্ঠপোষকতার যুগোপযোগী প্রত্যাখ্যানের ‘কিশোর জ্ঞান-বিজ্ঞান’-কে আজ ব্রাত্যই বলা চলে । আর এক পত্রিকা ‘কিশোর বিজ্ঞানী’ পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চের বিজ্ঞান পত্রিকা । সংগঠনের কোটাভিত্তিক বন্টনব্যবস্থায় আর বাধ্যতামূলক আর্টিকেল জটে এক জড়ভরত এই পত্রিকা সময়ের চাহিদায় আজ অকিঞ্চিৎকর । অন্য উল্লেখ্য বাংলা বিজ্ঞান পত্রিকাদের মধ্যে অবশ্যই স্মরণীয় ‘উৎস মানুষ’ এবং ‘বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানকর্মী’ । এরা সকলেই কিন্তু সময়ের ফসল । আর নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর চিন্তাকল্পের বাইরে বেরিয়ে একটু অন্য ফর্মের না-চিন্তায় এই দুটি অত্যন্ত উচ্চ আবেদনের পত্রিকা আজ বিলুপ্তপ্রায় । এ ছাড়া কিন্তু আরও আছে । এই বাংলার জেলায় জেলায় মানুষ বারবার কিন্তু ভেবেছে এই কথাটা – বিজ্ঞানের আলোকবর্তিকা বহনে মাতৃভাষাই একমাত্র বাহন । আর তাই বাংলায় বিজ্ঞান পত্রিকা জন্মেছে অহরহ । বর্তমান প্রবন্ধের এই উদ্দেশ্য নয়, যে এই সব মহৎ প্রচেষ্টার একটা সংকলন করা হবে, কিন্তু যেটা উল্লেখ করার প্রয়োজন, যে এইসব উৎসাহের অপমৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান আমরা কখনও করিনি ।
একটা প্রশ্ন এই অবকাশে উঠতে বাধ্য । আচ্ছা, শিক্ষায়, বিজ্ঞানে, শিল্পে এগিয়ে থাকা দেশগুলোয় কি এই জন্মমৃত্যুর ঘাত-প্রতিঘাত নেই বিজ্ঞান দৃষ্টিভঙ্গির বীজবপনের কার্যকলাপের ? এখানেই ভূমিকা রাষ্ট্রের । যে প্রয়োজনের অনুভব থেকে বাংলায় জন্ম অজস্র ছোটবড় বিজ্ঞান পত্রিকার, তার আসল দায় কিন্তু রাষ্ট্রের বা সরকারের । স্বচ্ছ স্বাভাবিক বিচার বীক্ষণ আর যুক্তিবোধের চালচিত্র তৈরি করা কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থারই কাজ । আমাদের দুর্ভাগ্য, যে এই দেশের কোনো সরকারই সেই উদ্দেশ্যের ধার মাড়ায়নি কখনও, পরন্তু ঠিক উলটো পথে হেঁটে কীভাবে অবিজ্ঞান কায়েমি স্বার্থসিদ্ধির পথে এগিয়ে দিতে পারে সরকার পরিচালকদের, তারই রূপরেখা আঁকতে ব্যস্ত থেকেছে সরকারের একপরত পিছনে থাকা পরিচালকরা । অধুনা কি কেন্দ্র কি রাজ্য কি দিল্লি কি কলকাতা – সর্বত্রই এই অবিজ্ঞানেরই সরকারী জয়জয়াকার । অতএব আমাদের বলতেই হবে । খুঁজে পেতে নতুন পথে চলতেই হবে।
চলতে চলতে বহু পথ পেরিয়ে আজ যেখানে দাঁড়িয়ে আমার দেশ, আমার রাজ্য, তাতে মানুষের মনে যুক্তিবোধের উন্মেষ ঘটানোর কোনো প্রচেষ্টার হাজার ক্রোশের মধ্যে নেই কোনো সরকারী চিন্তা । বরং তাদের হাঁটা এর উলটো পথে । ‘উন্নয়ন’ নামক এক অদ্ভুত মোহগ্রস্ততায় সকলেই চায় কর্পোরেটোক্রেসির চাষ । আর এই সব প্রচেষ্টার মধ্যে কেন্দ্রীয় অধ্যায় সব সময়েই আমার ভাষা, আমার মায়ের ভাষার উপর আক্রমণ । একে ঠেকাতেই হবে । আমাদের আজকের এই ই-ট্যাবলয়েড বাংলা ভাষায় দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলার প্রচেষ্টার দীর্ঘ পথের এক নতুন সংযোজন মাত্র । আমাদের অনেক কাজের একটা হবে পূর্বসূরিদের সব প্রচেষ্টার অ্যাকাউন্টিং । অবশ্য অনেক বেশী করে আমরা করতে চাইবো তাদের প্রভাব হারানোর কারণ বিশ্লেষণ । আমার মায়ের ভাষায় আমার চোখ ফোটানো রুখতে চায় কে সেটা জানতে চাওয়া অত্যন্তই আবশ্যিক । আবার এ কাজ ক্রমাগত করে চলাও সমানভাবেই করণীয় । এ কাজে আর আমরা খামতির অবকাশ রাখবো না ।

Add Comments