ডারউইন ও গান্ধীবাদ

-মণীষা বন্দোপাধ্যায়

গান্ধী এবং ডারউইনকে একসাথে ধরতে গেলে অদ্ভুতভাবে মনে আসে গান্ধীর সেই তিন বাঁদরের কথা। শোনা যায় গান্ধীর শেষ বেলায় ব্যক্তিগত সম্পদ ছিল মাত্র পাঁচটি – চশমা, পকেট ঘড়ি, চটি, একটি ছোটো বাটি ও চামচ এবং তিন বাঁদরের মূর্তি। জাপানের শিন্টো ধর্মীয় ভাবনার সাথে যুক্ত এই ত্রয়ীর মূর্তি কোনও চীনা অতিথির কাছে পেয়েছিলেন হয়ত বা শান্তিনিকেতনে, যা তাঁর সঙ্গী ছিল চিরকাল। মিজারু, যে কোনো খারাপ দেখে না, কিকাজারু যে কোনো খারাপ শোনে না আর ইয়াজারু যে খারাপ কিছু বলে না। ডারউইনের বিবর্তনবাদ এবং তাঁর অতিসরলীকৃত ব্যাখ্যার বিতর্কে বাঁদরের বিশাল ভূমিকা। গান্ধীর তিন বাঁদরকে নিয়েও বিতর্ক আছে, অজস্র ঠাট্টা–তামাশাও হয়েছে। কিন্তু গান্ধীর কাছে এর বৈশিষ্ঠ্য ছিল নৈতিকতা।
যে কালে গান্ধীর বিচরণ, সেই কালে ডারউইনের মত বিজ্ঞান এবং ধর্ম দু’য়েরই সাথে সংঘাত পেরিয়ে স্বীকৃত হয়েছে। গান্ধী সম্বন্ধে চালু ধারণা যা’ই হোক তিনি বিজ্ঞান-বিরোধী ছিলেন না। তিনি প্রযুক্তির নীতিহীনতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বহু আগে আজ যা বিশ্ব জুড়ে ধ্বনিত হচ্ছে। ডারউইনকেও তিনি নীতির চোখে দেখেছেন। Darwin’s Views on Ethics নামক একটি প্রবন্ধে তিনি তাঁকে গত শতাব্দীর এক মহান ইংরেজ যিনি বিশাল বৈজ্ঞানিক আবিষ্কর্তা হিসাবেই বর্ণনা করেছেন। এমন মানুষ যার স্মৃতি ও পর্যবেক্ষন শক্তি বিস্ময়কর। গান্ধী বলেছেন তাঁর লেখা বই সকলেরই পড়া ও ভাবা দরকার, বাতিল করার কোনো প্রশ্নই ওঠে না এখানে।
ডারউইন তথ্যপ্রমাণ দিয়ে দেখিয়েছেন মানুষ কীভাবে এক বিশেষ ধরণের বানরজাতীয় প্রাণী থেকে বিবর্তিত হয়েছে। ডারউইনের ব্যাখ্যায় প্রত্যেক প্রাণী অস্তিত্বের লড়াই করে এবং শেষ পর্যন্ত যোগ্যতমের উদবর্তন ঘটে। একভাবে দেখলে মনে হবে প্রত্যেক প্রাণী সংঘর্ষশীল। খাদ্যের জন্য লড়াই, খাদকদের হাত থেকে নিজেকে বাঁচানোর লড়াই এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে টিকিয়ে রাখা – এই তিনটি তার আবশ্যিক কর্ম। কিন্তু গান্ধী বলবেন এই সংগ্রাম শুধু শারীরিক শক্তির উপর নির্ভরশীল নয়। মহিষ বা ভল্লুক মানুষের তুলনায় শারীরিকভাবে বলবান হলেও বুদ্ধিমত্তায় মানুষ তাঁদের উপরে। অন্যদিকে পরিবেশের সাথে সম্পর্কিত থাকাও যোগ্যতা নিরূপণ করে। গান্ধী এইখানে নৈতিকতার প্রশ্ন এনেছেন। গান্ধীর মতে, ডারউইন নীতিবেত্তা দার্শনিক না হলেও তাঁর ভাবনায় রয়েছে পরিবেশ ও নৈতিকতার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। পরিবেশের বিপর্যয় যে প্রজাতির বিলুপ্তি আনতে পারে, এ তো প্রমাণিত। পরিবেশ সংরক্ষণও গান্ধীর কাছে নৈতিকতা থেকেই উদ্ভূত। ডারউইনের সার্ভাইভাল অফ্‌ দ্য ফিটেস্ট তত্ত্বের এক অতি সরলীকৃত ব্যাখ্যা শুধুমাত্র ব্যক্তির টিকে থাকার কথা বলে। সেই ব্যক্তি, যে শুধু নিজের কথা ভেবে নির্বিচারে পরিবেশ লুন্ঠন করে, সম্পদের উপর মালিকানা কায়েম করে এবং অন্যের প্রতি অপরিমিত হিংসা শুরু করে। এখানে নীতির কোনো স্থান নেই।
আজকের পৃথিবীতে এই অতি এককেন্দ্রিকতা জন্ম দিয়েছে স্বৈরাচারের, যা বৈচিত্র্যকে স্বীকার করে না এবং যা কিছু সার্বজনীন তাকে তুচ্ছ করে। গান্ধী এর সম্পূর্ণ বিপরীতে চিরকাল ছিলেন, আছেন। তিনি দেখছেন মানুষের আদি ইতিহাসে নীতিহীন জাতিগুলিই অবলুপ্ত হয়ে গেছে। প্রাচীন গ্রীক জাতি বর্তমান ইউরোপীয়দের চেয়ে বেশি বুদ্ধি ধরলেও নীতিহীনতার কারণে তারা টিকতে পারেনি। নীতিহীনতার পথ বেয়ে আসে হিংসা। ডারউইনের ব্যাখ্যার সরলীকরণে নায়ক হলেন সেই ব্যক্তি যিনি শক্তিমান কিন্তু তার শক্তি ধ্বংসের শক্তি। ইতিহাস বিজেতাদের নায়ক বানায়, নেপোলিয়ানের মতো নায়ক যিনি অভাবনীয় হিংসার জন্ম দিতে পারেন। গান্ধী বলেছেন – আপাতভাবে হিংসার পথ ধরে উপরে ওঠা যায় তাড়াতাড়ি, কিন্তু একটু ভাবলে দেখা যাবে যে হিংসার তরবারী যখন নামে, তখন তা নিজেদের ঘাড়েও কোপ দিতে পারে। হিংসা মানবজাতির টিকে যাওয়ার উপায় হতে পারে না। শুধু মানুষের প্রতি হিংসা নয়, গোটা পরিবেশের প্রতি হিংসা যে মানুষকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাচ্ছে এ নিয়ে আজ আর কোনো সন্দেহ নেই। ভূমন্ডলের উষ্ণায়ন ইতিমধ্যেই সেই অশনি-সংকেত এনে দিয়েছে।
এর মূলে আছে লোভ। আজ পরিবেশ আন্দোলনের দিকে দিকে গান্ধীর সেই বাণীটি ধ্বনিত – “পৃথিবী সকলের প্রয়োজন পূরণ করতে পারে এমন সাধ্য তার আছে কিন্তু একক ব্যক্তির লোভ পূরণের সাধ্য তাঁর নেই।” এটি তবু আপ্তবাক্য নয়। গান্ধী তাঁর কাজের মধ্যে দিয়ে বার বার এই প্রশ্নগুলি তুলেছেন। ‘আমার জীবনই আমার বাণী’ – এর সার্থক প্রয়োগ ঘটেছে তাঁর জীবনে।
টিকে থাকার যে লড়াই, গান্ধী তা শুরু করেছেন দক্ষিণ আফ্রিকায়। সেখানে লড়াই ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের বর্ণভেদ নীতির বিরুদ্ধে যা জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের উপর ভিত্তি করে তৈরী। এই লড়াই-এ গান্ধী এক অনন্য পন্থা নিলেন – যার নাম সত্যাগ্রহ। সফল হলেন। সারা জীবন এইটিই তার পথ, যে পথ ধরে আজ হাঁটছেন দুনিয়া জুড়ে প্রতিবাদীজন। মানুষের সমাজে যারা শোষিত, যারা প্রান্তিক, তাদের টিঁকে থাকার সংগ্রাম কিন্তু মানুষের বিরুদ্ধেই। এইখানে প্রয়োজন ন্যায় ও সাম্যের প্রতিষ্ঠা। এইখানে মানবাধিকারের সূচনা। মানবাধিকারকে ডারউইনের ভাবনার পরিপন্থী হিসাবে ধরলে আবার সেই এক বনাম বহুর টিকে থাকার কথা এসে যায়। ডারউইন সমগ্র প্রজাতির টিকে থাকার কথাই বলেছেন। তাই ডারউইনও দেখিয়েছেন পারস্পরিক সহযোগিতা।
সেই ছোট ছোট পাখীরাও নিজেদের সর্বস্ব দিয়ে শাবকদের প্রতিপালন করে। গান্ধীর মতে, মানুষ অন্যান্য প্রানীর চেয়ে আরও বেশি স্বার্থহীন। তবু নিজের বা নিজের পরিবার নয়, নিজের গ্রাম, জাতি, দেশ ছাড়িয়ে সমগ্র মানবজাতির জন্য সে সাহায্যের হাত বাড়ায়। গান্ধীর মূল কথা এটাই যে, জাতিগুলি সম্পদের জোরে নয়, সৎ নীতির দ্বারাই টিকে থাকে।
দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ফিরে গান্ধীর প্রথম সফল আন্দোলন বিহারের চম্পারনে। এই আন্দোলন নীলকরের বিরুদ্ধে কৃষকের আন্দোলন, তার নিজের জমির উপর অধিকারের আন্দোলন। স্থানীয় সম্পদের উপর সেখানকার মানুষের অধিকার নিয়ে যে লড়াই সেখানে সমান্তরাল সীমা ও সাম্যের জন্য অভিযান চালিয়েছেন গান্ধী। মেয়েদের মুক্তি ও সব কাজে যোগদানের সূচনা হয় এখানে। অবশ্যই অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে তাঁর অভিযান চলে, যার ফলে তৎকালীন উচ্চবর্ণীয় নেতৃত্ব বাধ্য হয়েছিলেন জাতিভেদ মুক্ত হতে। এই সমস্তই সকলের জন্য কল্যাণের প্রচেষ্টা।
গান্ধীর লবণ সত্যাগ্রহ এমনই এক আন্দোলন। লবণ প্রাকৃতিক সম্পদ। গান্ধী ইংরেজ সরকারকে জানালেন – এ আমাদের ভূমি। এখানে সমুদ্রের জল থেকে নিজেদের প্রয়োজনের লবণ নিজেরাই তৈরি করব। এর জন্য তোমাকে টাকা কেন দেব ? বিষয়টি আদতে তুচ্ছ। তাই সরকার উপেক্ষার নীতি নিলেন। পাঁচজনকে নিয়ে হাঁটতে শুরু করলেন গান্ধী। ২৫০ মাইল চলে তিন সপ্তাহ পরে যখন তিনি সমুদ্র তটে লবণ আইন ভাঙছেন, লবণ তৈরি করছেন ততক্ষণে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত কাঁপছে। গান্ধীর সাথে অগণিত মানুষ – গোটা ভারত জুড়ে চলছে লবণ তৈরী। সাংবাদিক ভিন্স ওয়াকার বলেছেন – “Whatever moral ascendance the west held was lost today.” পশ্চিমের নৈতিক উচ্চতা হারিয়ে গেছে।
আবার সেই নীতির কথা। এই নীতির উদ্দেশ্য সর্বোদয়। সকলের উদয় ঘটবে যেখানে। এখানে যোগ্যতম সেই জাতি যা সমতা ও ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত। এই সমগ্রতার মধ্যে বৈচিত্র্য থাকবেই। গান্ধী এই বৈচিত্র্যের প্রবক্তা ও সংরক্ষক। আজ যারা ডারউইনকে বাতিল করতে চান, তাদের পথে সবচেয়ে বড় কাঁটা গান্ধী। গান্ধী ধর্মের কথা বলেন কিন্তু তিনি সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে। তাঁর জীবন দিয়ে তিনি তা প্রমাণ করেছেন। গান্ধীর নৈতিকতা প্রয়োজনে ঐতিহ্যবিরোধী। মেয়েদের মুক্তি এবং অস্পৃশ্যতা-বিরোধী তাঁর যে ভাবনা, তা পরম্পরার বিরুদ্ধে। তাঁর কাছে মানব সভ্যতার টিকে থাকার মূল সহযোগিতা, সহিষ্ণুতা ও বৈচিত্র্য।
তাই গান্ধী ডারউইনকে দেখেছেন নীতির আলোয়।
গান্ধীর তিনটি বাঁদর ভাগ্যিস বিবর্তিত হয়ে মানুষে পরিনত হয়নি। ডারউইন ও গান্ধী দুজনকেই হয়ত বাতিল হতে হত।
সূত্রঃ www.mkgandhi.org/ethical/religiousmorality.htm

Add Comments