ডারউইনের তত্ত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্যানসারচর্চা

-স্থবির দাশগুপ্ত
বিশিষ্ট চিকিৎসক এবং প্রাবন্ধিক

(২০০৯ সালে, ডারউইন-এর জন্মের ২০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আমার দু’টি লেখা প্রকাশিত হয়েছিল, – একটি ‘বারোমাস’ ও অপরটি ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায়। এই দু’টি লেখাকে সংযুক্ত ও পরিমার্জিত করে বর্তমান লেখাটি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে আমার ‘জীবন যাপন ও ক্যানসার’ গ্রন্থে। এটি প্রকাশিত হয়েছিল ২০১৬ সালে। প্রকাশক ‘ধানসিড়ি’।)

চার্লস ডারউইনকে জীব-বিবর্তনবাদের প্রবাদপুরুষ বলে গণ্য করা হয়। একথা ঠিকই যে ‘অন দি অরিজিন অফ স্পিসিস বাই মিনস অফ ন্যাচারাল সিলেকশন’ (১৮৫৯) বইটি প্রকাশিত হয়েছিল চার্লস ডারউইন-এর নামেই। কিন্তু একথাও আমাদের মনে রাখা উচিত যে, জীবের বিবর্তনের ধারণাটি ইংল্যান্ডের রয়াল সোসাইটিতে তিনি একাই পরিবেশন করেননি; তাঁর সহযোগী ছিলেন রাসেল ওয়ালেস (১৮৩২-১৯১৩)।

অবশ্য শুধু ডারউইন বা ওয়ালেসই না, প্রজাতির সৃষ্টি আর বিবর্তন নিয়ে তাঁদের আগেও অনেকেই মাথা ঘামিয়েছিলেন। বাইবেল-বর্ণিত সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে ইউরোপের পণ্ডিতসমাজ খুব নিশ্চিন্ত থাকতে পারেননি। ভূস্তর আর শিলীভূত জীবাশ্ম (‘ফসিল’) নিয়ে নানান্‌ পর্যবেক্ষণ চালিয়ে তাঁরা বর্তমান প্রজাতির আদি রূপের কথা ভাবতে চাইছিলেন। জন রে (১৬২৭-১৭০৫), ক্যারোলাস লিনেয়াস (১৭০৭-৭৮), জি এল বুফোঁ (১৭০৭-৮৮) আর এরাস্‌মাস ডারউইন (১৭৩১-১৮০২)-এর মতো অনেকেই ভাবছিলেন, জীবের উৎপত্তি ও বিকাশ আসলে প্রাকৃতিক ঘটনাই এবং তা ক্রমশ পরিবর্তনশীল। তাই নানান্‌ দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁরা প্রকৃতিকে দেখার চেষ্টা করেছেন , জীবের স্বরূপ বোঝার চেষ্টা করেছে্ন।

সেই ইউরোপীয় আলোকপ্রাপ্তির আর এক ফসল ছিলেন লামার্ক (১৭৪৪-১৮২৯)। জীববিদ্যা (‘বায়োলজি’) শব্দটি তিনিই প্রথম ব্যবহার করেছিলেন। তিনি বললেন, প্রাকৃতিক নিয়মে জন্ম নিয়ে প্রাকৃতিক প্রয়োজনেই জীব তার জন্মদাতা/দাত্রীদের থেকে একটু ভিন্ন হয়ে যায়। এইভাবে হাজার হাজার বছর পরে সে যেন এক নতুন প্রজাতিতে রূপান্তরিত হয়ে যায়। তাঁর এই বক্তব্য পরবর্তীকালে ডারউইনকেও পথ দেখিয়েছে। অথচ জীববিজ্ঞানীদের রাজসভায় লামার্ক-এর কপালে তাচ্ছিল্য ছাড়া বিশেষ কিছু জোটেনি। এবং অত্যন্ত করুণ অবস্থায় জীবনের সমাপ্তি ঘটেছিল ফরাসী বিপ্লবের এই সমর্থকের। সে ছিল ১৮২৯ সাল। তার দু’বছর পরে ডারউইন চড়ে বসবেন ‘এইচ এম এস বিগ্‌ল’ জাহাজে, পাড়ি দেবেন গবেষণার অজানা রাজ্যে (১৮৩১-৩৬)। তারপর তিনি নিয়ে আসবেন প্রজাতির বিবর্তনের নবতর ধারণা।

সেই ধারণা, সেই ব্যাখ্যান বিজ্ঞানী সমাজে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। প্রতিষ্ঠা কালক্রমে প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়েছে। আর সেই প্রতিষ্ঠানগত অভিমান নিয়ে আমরা, এই ‘হোমো স্যাপিয়েন্স’ ভেবে নিয়েছি যে, অন্য যাবতীয় প্রাণীর তুলনায় আমরাই যোগ্যতর, উন্নত, বিচক্ষণ এবং প্রাজ্ঞ। বিবর্তনের ফলেই আমরা এই প্রাজ্ঞতা অর্জন করেছি। কিন্তু বিবর্তন আসলে কী ?

প্রকৃতির পরিবর্তন হয়, জীবেরও। কিন্তু ডারউইন আমাদের দেখালেন, বিবর্তন মানে শুধু পরিবর্তন না; এ হল পরিবর্তনের এমন এক ধারা যা অতীতের হাত ধরে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চলে। এই পরিবর্তনকে বলা যায় অতি সরল থেকে সরল, সরল থেকে জটিলতর; বা অন্যভাবে বলতে গেলে অনুন্নত থেকে উন্নত বা উন্নততর। এর পিছনে কোনো ঐশী শক্তি থাকে না, থাকে বরং প্রকৃতির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। জীবকে তার পরিবেশের সঙ্গে যুঝতে হয় আবার খাপ খাওয়াতেও হয়। এই কাজগুলো করতে করতে সে এলোপাথাড়িভাবে (‘র‍্যান্ডম’) নানান্‌ বৈচিত্র্য অর্জন করে। প্রকৃতি সেই বৈচিত্র্যগুলো থেকে যা যা লাভজনক আর সুবিধাজনক তা নির্বাচন করে দেয় ।

অর্থাৎ সহজভাবে বললে, জীবজগতে বেঁচে থাকার জন্য একটা সংগ্রাম চলে, সেই সংগ্রামে জয়ী হয়ে কেবল তারাই বেঁচে থাকে যারা যোগ্যতম; আর এগুলোর সঙ্গে থাকে ‘প্রাকৃতিক নির্বাচন’-র একটি ছক। এই ছক ধরেই নতুন এবং উন্নততর প্রজাতির সৃষ্টি হতে থাকে। কিন্তু এই ব্যাপারগুলো ঘটবে কী করে, কী তার পদ্ধতি ? এখানেই থেকে গেল একটি গুরুতর ফাঁক। কী করে এই ফাঁক ভরাট করা যায় তা ডারউইনের জানা ছিল না। সেই রাস্তা বেরল অল্প কিছুদিন পরেই। গ্রেগর মেন্ডেল (১৮২২-৮৪) আর ওয়াইজম্যান (১৮৩৪-১৯১৪) রচনা করলেন বংশগতির তত্ত্ব। তাঁরা বলেছিলেন বংশগতির এক সূত্রের কথা, পরবর্তীকালে যার নাম হয় ‘জিন’।

তারপর ডাচ উদ্ভিদবিদ হুগো দ্য ভ্রেজের (১৮৪৮-১৯৩৫) হাতে জিনতত্ত্ব আরো বিকশিত হয়েছে, এসেছে ‘মিউটেশন’-এর ধারণা, মানে জিনের চরিত্র বদল। জিনতত্ত্বের হাত ধরে ডারউইনের তত্ত্ব আরো পরিমার্জিত হল। বলা হল, জৈববিবর্তন মানে, আসলে তার জিনগত পরিবর্তন। তা আংশিক হতে পারে অথবা পূর্ণ। পরিবেশের প্রভাবে জিন-এর মধ্যে এলোপাথাড়ি পরিবর্তন (‘র‍্যান্ডম মিউটেশন’) হতে থাকে। তারপরে আসে প্রাকৃতিক নির্বাচনের খেলা, – দরকারি মিউটেশনগুলোকে সে নির্বাচন করে দেয়। যেমন, শীতের হাত থেকে বাঁচার জন্য একটি প্রাণীর যদি পুরু লোমের দরকার হয় তাহলে তার জিন-এর মধ্যে ঘটতে থাকবে এলোপাথাড়ি পরিবর্তন। তার ফলে পরবর্তীকালে যে সব প্রাণীর গায়ে পুরু লোম জন্মাবে তারাই বেঁচে থাকবে এবং বংশ বৃদ্ধি করতে পারবে।

তেমনি, কোনো প্রাণী যদি উঁচু গাছের পাতার নাগাল না-পায় তো সে কী করবে? সে কি তার কণ্ঠদেশ লম্বা করে ফেলবে? নাকি প্রকৃতি তার চারধারে ছোটো ছোটো গাছ তৈরি করে দেবে? কোনোটাই না; বরং তার জিনের মধ্যে ঘটতে থাকবে এলোপাথাড়ি পরিবর্তন। তার ফলে পরবর্তীকালে যেসব প্রাণীর কণ্ঠদেশ হবে লম্বা তারাই বেঁচে থাকবে এবং বংশবৃদ্ধি করতে পারবে। আমরা তাদেরকে জিরাফ নামে ডাকব। তাহলে বিবর্তন = এলোপাথাড়ি বৈচিত্র্য + প্রাকৃতিক নির্বাচন; তারা উভয়ে উভয়ের সৌজন্যে বিরাজ করে। কিন্তু প্রশ্ন হল, বিবর্তনের ইতিহাস তো বিশাল, ব্যাপক; এইভাবে কি সেই ইতিহাসকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব?

ডারউইনবাদ সৃষ্টিতত্ত্বের কাঁধ থেকে ঈশ্বরের হাতটা সরিয়ে দিয়েছিল ঠিকই; জীববিজ্ঞানের ইতিহাসে সে এক অসামান্য অবদান। কিন্তু এই তত্ত্ব মেনে নিয়ে, প্রথম জীবটি যে কীভাবে এল তা বোঝা যায় না। বিবর্তন তো পরের কথা; তার আগে তো প্রজাতির সৃষ্টি হয়েছে; সেটা হল কীভাবে? আদিমতম জীবটি কি কোনো মিউটেশন-এর ফল? কোন মিউটেশন? এই মহাবিশ্বে তাহলে অসংখ্য প্রজাতি সৃষ্টির জন্যে অসংখ্য মিউটেশনের দরকার পড়েছে। কিন্তু মিউটেশন তো অমন ভুরি ভুরি ঘটে না। উচ্চতর জীবের বেলায় বেশির ভাগ মিউটেশনের পুনরাবৃত্তির হার হল, একটি প্রজন্মের একটি জিনপিছু দশ হাজার থেকে এক লক্ষের মধ্যে এক বার। তা এলোপাথাড়ি ঠিকই; কিন্তু তাকে তো আবার ‘উপযুক্ত’ বা দরকারিও হতে হবে; অথচ মিউটেশন হয় খুব সামান্যই। নিম্নতর জীবের বেলাতেও একই কথা খাটে। তাহলে মিউটেশন দিয়ে বিবর্তনের ব্যাখ্যা কীভাবে হবে?

তাই কীভাবে ঘোড়া, বাঘ,জিরাফ,বেড়াল বা মানুষের মতো বিচিত্র জীবের উদ্ভব হল সেকথা এই তত্ত্ব থেকে বোঝা যাচ্ছে না। আর প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাহাত্ম্য যে কী তাও স্পষ্ট হচ্ছে না। শুধু এইটুকু বোঝা যায় যে প্রাকৃতিক নির্বাচন অযোগ্যকে সরিয়ে দিয়ে একটা নঞর্থক ভূমিকা নেয়। তাহলে আর ঐশীবাদীরাই বা কী দোষ করল? প্রকৃতি (ঈশ্বর) যে অযোগ্য বা ক্ষতিকর যা কিছু তা বিনষ্ট করে দেন তা তো তারা অনেক আগেই বলে রেখেছে। অবশ্য এর বেশি কিছু তারা বলেনি। উল্টোদিকে, ডারউইনবাদীরা তো জিরাফের লম্বা গলা আর হিপোপটেমাসের ছোটো গলা ইত্যাদি কত কিছু বললেন,অথচ এই কথাটা বললেন না যে জীব খাপ খাওয়ায় (‘অ্যাডাপ্টেশন’) কীভাবে? আর বৈচিত্র্যই বা কী?

বৈচিত্র্য মানে তো জিনেরই অভিব্যক্তি। যেমন,জিনগত ভাবে দুনিয়ার সব মানুষই এক; কিন্তু কেউ ট্যারা, কারুর চুলের রং সাদা, কেউ বেঁটে ইত্যাদি। জীবের মধ্যে যে জিনসজ্জা থাকে তার নানান রকম বিন্যাসের ফলেই এই বৈচিত্র্য। সুতরাং বৈচিত্র্য সর্বদা জিনসজ্জার সীমানার মধ্যেই ঘটে থাকে। কিন্তু বৈচিত্র্য কখনো বিবর্তনের প্রমাণ বহন করে না। জিনগত বৈচিত্রের ফলে কোনো সরীসৃপ কখনো পাখি হয়ে যায় না। ডারউইন ভেবেছিলেন বৈচিত্র্যের কোনো সীমা নেই। তাঁর যুক্তি ছিল, বিভিন্ন ধরনের ছাগলের মধ্যে যৌনমিলন ঘটিয়ে যদি বেশি দুধেল ছাগল তৈরি করা যায় তাহলে কালক্রমে এ থেকে নতুন প্রজাতিও তৈরি হবে। কিন্তু এটা হয় না; বরং ওরকম যৌনমিলন ঘটাতে গিয়ে দেখা যায় যে জীবের গঠনগত বৈচিত্র্য তৈরি হচ্ছে বটে; কিন্তু তা হতে হতে প্রজাতি আবার তার পূর্বাবস্থায় ফিরে যায়। অর্থাৎ বৈচিত্র্য অসীম না,সসীম।

তাহলে বিবর্তনের এই ব্যাখ্যা প্রতিষ্ঠা পেল কী করে? এ আসলে এক দৃষ্টিভঙ্গির প্রশ্ন। ধ্রুপদী পদার্থবিদ্যা আমাদের শিখিয়েছে যে সত্যের রহস্য ভেদ করার প্রধানতম হাতিয়ার হল এককটিকে (‘ইউনিট’) খুঁজে বার করা। এই শিক্ষা অনুযায়ী জীব, জীবসত্তা, জীবন এবং তার সঙ্গে জড়িত সবকিছুই খণ্ডনযোগ্য (‘রিডিউসিব্‌ল’)। তাই জিনকেই জীবের একক হিসেবে ধরতে হবে। জিনসজ্জাই (‘জিনোম’) জীবের নির্ধারক শক্তি, যেখানে লেখা হয়ে আছে আমাদের ‘স্ক্রিপট অফ লাইফ’ বা জীবনের চিত্রনাট্য। এই দৃষ্টিভঙ্গির হাত ধরে কালক্রমে বিকশিত হয় ‘নব-ডারউইনবাদ’। এই মতের পৃষ্ঠপোষকতা করেন আর্নস্ট মেয়র (১৯০৪-২০০৫), জুলিয়ান হাক্সলি (১৮৮৭-১৯৭৫) এবং ডবঝানস্কির (১৯০০-৭৫) মতো দিকপাল মানুষজন। আবার এই সূত্র ধরেই রচিত হয় ‘সামাজিক ডারউইনবাদ’।

কিন্তু ডারউইন-তত্ত্বের সূত্রগুলো নিয়ে নানান্‌ দিক থেকে নানান্‌ প্রশ্ন উঠেছে। না-হয় শুধু যোগ্যতমই টিকে থাকল; কিন্তু যোগ্যতম কে? তার যোগ্যতা কীসে? শক্তিতে নাকি জ্ঞানে নাকি চাতুর্যে? প্রকৃতি কীভাবে সেই যোগ্যতা স্থির করবে? আর্থার কেষ্টলার (১৯০৫-৮৩) বলেছিলেন, এ আসলে এক গোলাকার যুক্তি। যোগ্যতম কে? যে বেঁচে থাকে সেই। বেঁচে থাকবে কে? যে যোগ্যতম সেই! যুক্তির এই গোলকধাঁধা আমাদের কোনো নতুন দিশা দেয় না। কেন একটি জীব যোগ্যতম? কেননা সে উৎপাদনশীল। আরো যোগ্য হতে গেলে তাকে আরো বেশি বেশি করে উৎপাদনশীল হতে হবে। কী করে তা হবে? তা হবে সংগ্রাম করে। জীবজগতের নির্দিষ্ট সীমানা আছে,তার সম্ভারেরও সীমাবদ্ধতা আছে। তাই নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখবার জন্য তাকে অবশ্যম্ভাবী, নিষ্ঠুর, নিরঙ্কুশ প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হবে। যুক্তিবিজ্ঞানের অবরোহী (‘ডিডাকটিভ’) পদ্ধতি আমাদের এই ধারণায় পৌঁছে দেয়।

ম্যালথুস এই পদ্ধতিই ব্যবহার করেছিলেন। জীবজগতে বংশবৃদ্ধি ঘটে জ্যামিতিক নিয়মে, অথচ বাসস্থান ও আহার্যের পরিমাণ বাড়ে পাটিগণিতের নিয়মে। এর ফলে অনিবার্যভাবে তৈরি হবে সংকট। এই সংকট থেকে পরিত্রাণের একটি পদ্ধতি হল জীবের বংশবৃদ্ধির হারকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা। এই ম্যালথুসীয় তত্ত্ব অন্য অনেকের মতো ডারউইনের কাছেও আকর্ষণীয় ছিল। সত্যিই তো, জীবজগতে একটা নিয়ন্ত্রণ থাকা তো জরুরিই। যেমন ধরা যাক চড়ুই পাখি। জ্যামিতিক নিয়মে এক জোড়া চড়ুই পাখির থেকে দশ বছরে আমরা পাব ২৮০০ কোটি পাখি। বিষম সংকট তাহলে! অথচ বাস্তবে দেখা যায় ওরকম ব্যাপক হারে সংখ্যাবৃদ্ধি ঘটে না; বরং সুদীর্ঘকাল ধরে প্রজাতির সংখ্যা মোটামুটি একই রকম থেকে যায়। কীভাবে, তা বলতে গিয়ে ডারউইন তাকালেন হার্বার্ট স্পেন্সার-এর (১৮২০-১৯০৩) দিকে। ১৮৬৪ সালে তাঁর ‘প্রিন্সিপিলস অফ বায়োলজি’ গ্রন্থে হার্বার্ট স্পেনসার ‘যোগ্যতমের বেঁচে থাকার’ ধারণাটি ব্যবহার করেছিলেন। ডারউইনও তা ব্যবহার করলেন। সকলে বাঁচে না। কেউ কেউ বাঁচে। কে বাঁচে? যে যোগ্যতম সে।

Progress theory of cancer

তাই বিবর্তনের ডারউইনীয় ধারনাটির মূল সুর হল প্রতিযোগিতা; ক্রমশ তীব্রতর প্রতিযোগিতা। প্রতিটি প্রজাতির প্রতিটি সদস্যকে লড়ে যেতে হবে প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে, আর সেই লড়াই চলবে নিজেদের মধ্যেও। এর ফলে তারা পাবে বিচিত্র গুণ। এই বৈচিত্র্য (‘ভ্যারিয়েশন’) জমতে থাকবে হাজার হাজার বছর ধরে, পরিবাহিত হবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। অসংখ্য শাখা-প্রশাখায় পল্লবিত হয়ে উঠবে জীব। তাদের গঠনগত পরিবর্তন ঘটবে আর সেই সঙ্গে পাল্টে যাবে স্বভাব, বৈশিষ্ট্য। নানান্‌ প্রজাতির মধ্যে যারা প্রাকৃতিক নির্বাচনের সুবিধেটুকু পেয়ে যায় তারাই বেঁচে থাকে, আর তারাই পারে পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নতুন ধরনের জীবের সৃষ্টি করতে। তাই মোদ্দা কথায়, খাপ খাওয়াতে (‘অ্যাডাপটেশন’) পারলে থাক, না-পারলে যাও জাহান্নমে। ‘অযোগ্য’ মানুষ যে ক্রমাগত জাহান্নমে যাবে, এমনই এক বর্বর সমাজের ছবিই তো এঁকেছিলেন ম্যালথুস।

আসলে এই ছবিটি ঊনবিংশ শতকের ইউরোপীয় সমাজের ছবি। একেই নানাভাবে অলংকৃত করেছিলেন টমাস হাক্সলি (১৮২৫-৯৫) বা অনেকের মতে, ফ্রয়েডও (১৮৫৬-১৯৩৯)। কিন্তু জীবজগত কি সত্যিই কুরুক্ষেত্র? উৎপাদনশীলতাই কি যোগ্যতার মাপকাঠি? আমাদের এই মনুষ্যপ্রজাতিতে, উৎপাদনশীলতার নিরিখে মহিলাদের বেঁচে থাকবার অধিকার তো পঞ্চাশ বছর বয়সেই ফুরিয়ে যাবার কথা। অথচ তা তো হয় না; বরং উল্টো; পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের গড় আয়ুষ্কাল বরং বেশি। এসব কথা ওঠেই; অথচ সদুত্তর নেই। বরং ম্যালথুস বা হাক্সলি বা ডারউইনের কাছ থেকে আমরা পেলাম একটি আদ্যোপান্ত প্রতিযোগী, মুনাফালোভী, যৌনাকাঙ্ক্ষায় কাতর সমাজের ছবি। এরই উপর দাঁড়িয়ে আছে সামাজিক ডারউইনবাদের তত্ত্ব।

শুধু মানুষ কেন, কোনো প্রাণীরই অমন জঙ্গিবাদী, শাশ্বত চরিত্র থাকে না। যেমন, প্রাণীদের মধ্যে অমন নৃশংস প্রতিযোগিতার বদলে পিটার ক্রোপোটকিন (১৮৪২-১৯২১) দেখেছিলেন অপরূপ সহযোগিতার অসংখ্য দৃষ্টান্ত। প্রাণীবিদ ওয়াইন এডওয়ার্ড (১৯০৬-৯৭) দেখিয়েছেন, জীব নিজের স্বার্থেই অদ্ভুত উপায়ে কীভাবে নিজের জনসংখ্যার ভারসাম্য বজায় রাখে; কোনো দুর্ভিক্ষ বা মন্বন্তর সৃষ্টি করে দুর্বলকে বিলুপ্ত করে নয়, বরং নিজের বংশবৃদ্ধিকে নিয়ন্ত্রণ করে। একই কথা শুনিয়েছেন উদ্ভিদবিদ ব্র্যাডশ (১৯২৬-২০০৮)। এমনকী, জীবাণুও সহ-নাগরিকের স্বার্থে আত্মবলি দেয়। তাছাড়া, টিকে থাকার লড়াই থেকে প্রজাতির উত্তরণ হবে কীভাবে? বাঘের হাত থেকে কেবলমাত্র ক্ষিপ্রতম, দৌড়বীর হরিণই না-হয় বাঁচবে; কিন্তু হরিণ তো কখনো পাখি হতে পারবে না। খাপ খাওয়াতে পারলেও তো নতুন প্রজাতি তৈরি হছে না।

এই যে আরশোলার মতো খুব ক্ষুদ্র বা নিরীহ প্রাণী একই অবয়বে টিকে থাকছে সুদীর্ঘকাল, তা নিশ্চয়ই প্রাকৃতিক নির্বাচনের ফলে; আরশোলা খাপ খাইয়ে নিতে পেরেছে বলে। আবার এই যে ডাইনোসরের মতো দশাসই জীব ধরাধাম থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল, সেও তো প্রাকৃতিক নির্বাচনের ফলেই; ডাইনোসর খাপ খাওয়াতে পারেনি বলে। তাহলে কি যারা খাপ খাওয়াতে পারে না তাদের বিলুপ্তির পথ রচনা করে ‘প্রাকৃতিক নির্বাচন’ জীবজগতে কেবল ঋণাত্মক অবদানই রেখে গেল? কেননা, সে তো কোনো প্রজাতির মধ্যে কোনো নতুন জৈবিক গুণ সরবরাহ করতে পারল না, নতুন অঙ্গও তৈরি করতে পারল না। তাহলে বৈচিত্র্য যে কীভাবে তৈরি হবে তার উত্তর কি জিন-বিশ্লেষণ করে পাওয়া যাবে?

তাও পাওয়া সম্ভব না। বিবর্তনকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ডারউইন একটি প্রাণবৃক্ষের কল্পনা করেছিলেন (‘ট্রি অফ লাইফ’)। তার মূল একটাই, আর অসংখ্য শাখা-প্রশাখা। জিনের মিউটেশনের ফলে তৈরি হয়েছে ওই শাখা-প্রশাখাগুলো; এইভাবে কালক্রমে, বৈচিত্র্য সঞ্চারিত হয়ে গেছে জীবের প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। আধুনিক জিন গবেষণা কিন্তু দেখিয়ে দিয়েছে যে জিন শুধু অমন একমুখীভাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সঞ্চারিত হয় না; সে আশ-পাশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে, যাকে বলে জিনের সমান্তরাল স্থানান্তরণ (‘হরাইজন্টাল জিন ট্রান্সফার’)। অর্থাৎ জিন একটি প্রজাতি থেকে অন্য প্রজাতিতে বদলি হয়ে যায়। তার মানে, একটি মাত্র সরল, আদিম কোষ থেকেই ক্রমশ জটিলতর জীবের সৃষ্টি হয়েছে তা না; বরং কোষের একটি সম্প্রদায়কেই জীবের আদিমতম উৎস বলে ভাবতে হয়। তার মানে, প্রাণবৃক্ষের মূলটি নিজেই আসলে মাকড়সার জালের মতো, যাকে বলে প্রাণ-জালিকা (‘ওয়েব অফ লাইফ’)।

জীবসৃষ্টির মৌলিক প্রশ্নে তাই ডারউইনবাদ আমাদের নিরাশ করে। জীবের বিবর্তন তো পরে, তার আগেই ঘটে গেছে রাসায়নিক বিবর্তন। আর তারও আগে ঘটে গেছে মৌলিক উপাদানগুলোর বিবর্তন। রাসায়নিক বিবর্তনের প্রায় শেষ পর্যায়ে শুরু হয় জৈব বিবর্তন। একেই কেউ কেউ বলেছেন ‘আর এন এ জগৎ’। বিবর্তন তাহলে এক বিশ্বজনীন প্রক্রিয়া; শুধু জীবজগৎ নয়, বস্তুজগৎও ক্রমাগত বিবর্তিত হয়ে চলেছে। এই ইতিহাস কোনো সুনির্দিষ্ট ধারা বেয়েও প্রবাহিত হয় না। কী-করে কোনো কোনো প্রজাতি প্রকৃতির স্নেহধন্য হয়ে যায়, তা আজও জানা নেই। নেই বলেই অনুমানের সুযোগ এখানে অফুরন্ত। তাই হনুমানও মানুষের পূর্বপুরুষ হিসেবে একটি অনুমান। যাবতীয় সৃষ্টির প্রাচীনতম রূপ হিসেবে মৎস্য অবতারও ছিল অনুমান। তাই বির্তকটা আছে। মুশকিল হল এই বির্তকে যতটা ঝাল থাকে ততটা আলো থাকে না। তাহলে আলোর পথযাত্রী হোমো স্যাপিয়েন্স কী করবে ? সে কি ডারউইনীয় বিবর্তনবাদকেই নত মস্তকে মেনে নেবে?

অত নত হলেও তো বিপদ। কারণ, বিবর্তনের জল যে বড় গভীর আর উত্তাল। এত গভীর যে এখন আমরা জানতে পারছি, জিন-এর সঙ্গে (‘জিনোটাইপ’) জীবের বৈশিষ্ট্যের (‘ফিনোটাইপ’) বিষয়টি একরৈখিক না। বরং কোষের মধ্যে, জিনের মধ্যে এবং জিনের অভিব্যক্তির মধ্যে বহু বহু জটিলতা ও গতিময়তা (‘ডাইনামিজম’) কাজ করে। সেই গতিময়তাকে ধরতে না-পারলে প্রাণ সৃষ্টির প্রাক্‌পর্বটি ব্যাখ্যা করা যায় না। অনেকে ভেবেছিলেন, ভূত্বকের আধুনিক স্তর থেকে প্রাচীনতম স্তরে জীবাশ্ম খুঁজলেই বিবর্তনের হদিশ পাওয়া যাবে। তা যায়নি। বরং দেখা গেল, হঠাৎ হঠাৎ করে নতুন নতুন জীবের জীবাশ্ম পাওয়া যাচ্ছে; অথচ মাঝখানের জীবগুলোর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।

এই তথ্য থেকে তৈরি হল যতিচিহ্ন-যুক্ত সাম্যাবস্থার (‘পাংচুয়েটেড ইকুইলিব্রিয়াম’) তত্ত্ব। সৌজন্যে স্টিফেন জে গৌলড (১৯৪১-২০০২)। জীবকূলে দেখা গেল হাজার হাজার বছরের স্থিতাবস্থা (‘স্টেসিস’) আর তারপর নাটকীয় পরিবর্তন। এই তত্ত্ব বিবর্তনকে অন্যভাবে বর্ণনা করার চেষ্টা করে। তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে নানান্‌ তর্ক-বিতর্কও হয়েছে, আজও হচ্ছে। কিন্তু এখানে একটা জরুরি কথা এই যে জীবাশ্ম মানে তো পাথরের গায়ে বিলুপ্ত প্রজাতির ছাপ। ছাপ থেকে সেই প্রজাতির অস্তিত্বের প্রমাণ না-হয় মিলল; কিন্তু তা থেকে কি সেই প্রজাতির প্রাণের স্পন্দনের বা অন্তর্গত কর্মকাণ্ডের সন্ধান পাওয়া যায়? মনে হয়, এ এক অসম্ভব প্রস্তাব।

সমস্যা আরো আছে। অনেকে ভেবেছিলেন, প্রাণের তো মোটে পাঁচটি সাম্রাজ্য (‘কিংডম অফ লাইফ’); তা দিয়ে নিশ্চয়ই আদিম থেকে আধুনিক জীবের বিবর্তন বর্ণনা করা যাবে। তা যায়নি। বরং কেউ কেউ বলেছেন, প্রাণের মোটে পাঁচটি কেন, তিরিশটি সাম্রাজ্যও থাকতে পারে! বাস্তবকে খণ্ড খণ্ড করে দেখতে গেলে, জীববিদ্যায় এইভাবে কুহেলিকাই ক্রমশ আমাদের গ্রাস করে। এমনকী, জিন গবেষণাও যত সমৃদ্ধ হয়েছে রহস্য ততই ঘনীভূত হয়েছে। আমি যে কেন আমি, কেমন করে আমি ‘আমি’ হয়ে উঠলাম তার কোনো স্পষ্ট জবাব মেলে না। আমাদের হাতদুটি যে কীভাবে এত কুশল আর মুদ্রার ভঙ্গিতে এত বাঙ্ময় হয়ে উঠল, চোখের মতো এত অদ্ভুত জটিল এক যন্ত্রের উদ্ভব কীভাবে ঘটল, ডারউইনীয় বিবর্তনবাদের কাছে তা ব্যাখ্যাতীত। শুধু জিনসংকেত দিয়েই এই অপরূপ লালিত্যময় মানবদেহের সৃষ্টি সম্ভব হয়ে গেল, তা ভাবা মুশকিল।

এটাই ডারউইনীয় বিবর্তনবাদের সীমাবদ্ধতা, যা আসলে খণ্ডতাবাদেরই (‘রিডাকশনিজম’) সীমাবদ্ধতা। কেননা এই দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের একরৈখিক (‘লিনিয়ার’) সমীকরণের প্রতি আকৃষ্ট করে। আমরা ভাবতে থাকি, জীব তো সরল থেকেই জটিল হবে। অথচ তা কি সত্যি? ক্ষুদ্রতম জীবণুকোষের ওজন তো মাত্র ০.০০০০০০০০০০০১ গ্রাম; মানে তুচ্ছই, কিন্তু তা কি সরল? তার ভিতরে তো থাকে দশ লক্ষ পরমাণু! একটা জাইগোট তো সুচের অগ্রভাগের মতো। কিন্তু এতে যা বার্তা (‘ইনফর্মেশন’) রাখা থাকে তা ৬০ লক্ষ রাসায়নিক অক্ষরের (‘কেমিকাল লেটার’) সমান। তার মানে তা দিয়ে ৫০০ পাতার এক হাজারটা বই ছাপানো যায় যার প্রতিটি অক্ষর পড়তে লাগবে অণুবীক্ষণ যন্ত্র। তাহলে সারল্য কোথায়; বরং এ এক অভাবনীয় জটিলতা! একেই অনেকে বলেছেন অহ্রসনীয় জটিলতা (‘ইরিডিউসিবল কমপ্লেক্সিটি’)।

তাহলে আমরা করবটা কী? অনেকে ভাবেন, প্রকৃতিকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে যাতে কোনো ফাঁক-ফোকর দিয়ে ঈশ্বর না ঢুকে পড়েন। ঈশ্বরবাদী ব্যাখ্যা বা ঐশীবাদ আমাদের নিশ্চেষ্ট করে রাখে; আমরা আমাদের কর্মকাণ্ডের যুক্তি সাজাতে পারি না। তাছাড়া, সৃষ্টিতত্ত্ব (‘ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন’) শুধু ঘোষণা দেয়, কোনো ব্যাখ্যা দেয় না। অন্যদিকে, ভুল হোক ঠিক হোক, ডারউইন তো তবু একটা ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করেন, একটা কর্মকাণ্ডের কথা বলেন, একটা ‘অ্যাকটিভিটি’। অগ্রগতির বাজারটা যে নৃশংস প্রতিযোগিতার বাজার তা তো বাস্তব। এটা মেনে নিতে পারলে আমরা ঈশ্বরের নাগাল থেকে বেরিয়ে এসে স্বাধীন নাগরিক হতে পারি। তাই ডারউইনকে মানতে হয়।

কিন্তু মেনে নিয়ে, আধুনিক ক্যানসার চর্চায় আমাদের কী উপকার হল তা এবারে দেখা যাক।

কেন আমাদের এত রোগ হয়? কেন আমাদের অ্যাপেন্ডিক্সের ব্যথা ওঠে, কেন আমাদের বাতের ব্যথা হয়? আমরা তো ‘প্রাকৃতিক নির্বাচন’-এর ফলেই যোগ্যতম হয়েছি। তাহলে আমাদের শরীরটা এমন ব্যাধিমন্দির হয়ে উঠল কেন? ডারউইনবাদীরা বলেন, তাই তো হবার কথা। আমাদের শরীরটা তো আসলে পুরনো কোনো শরীরেরই বিবর্তনলব্ধ রূপ; ফলে পুরনো খুঁতগুলোর কিছু অবশিষ্ট থাকবেই, আর তার জন্য আমাদের দুর্ভোগও লেগেই থাকবে। তবে আশার কথাও আছে। যেমন, আমাদের টিকে থাকতে হয় লড়াই করে। জীবাণু, কীট-পতঙ্গ, পশু বা এমনকী, অন্যান্য মানুষও আছে যারা আমাদের ক্ষতি করে দিতে পারে। সেই ক্ষতি থেকে বাঁচবার জন্য আমাদের শরীরে আছে প্রকৃতিদত্ত রক্ষাকবচ, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। যাদের শরীরে এই ব্যবস্থাগুলো মজবুত থাকে, প্রাকৃতিক ভাবে তারা যোগ্যতর। তাদের দুর্ভোগ কম।

বেশ! কিন্তু তাহলে তো আমাদের আর তেমন কিছু করার থাকল না! যা আছে তা নিয়েই থাকতে হলে তো এক হিসেবে তা নিয়তিবাদ! আবার অন্যদিকে, ওই একই ব্যাখ্যা থেকে আসে সৌজাত্যবাদের (‘ইউজেনিক্স’) তত্ত্ব। সে বলে, জিনগতভাবে (মানে, প্রাকৃতিকভাবে) যারা যোগ্যতর, বেঁচে থাকার অধিকার প্রধানত তাদেরই। যারা যোগ্য না তাদেরকে হয় মরতে হবে নয়তো যোগ্যদের মতো নিখুঁত শরীর আমরা গড়ে নিতে হবে। তা আমরা পারি, কেবল যদি বির্বতনের দিক-নির্দেশ আমরা নিজেরা রচনা করে নিতে পারি। সে-কাজ আমাদের করতেই হবে কেননা বর্তমান সভ্যতা নেহাত বোকার মতো অযোগ্য মানুষকে বাঁচিয়ে রেখে প্রাকৃতিক নির্বাচনটাকে বিকৃত করে ফেলছে। কথাগুলো নাৎসিবাদের তাত্ত্বিক ভিত্তিকে মনে করিয়ে দেয়। এখান থেকেই আসে আরো নিখুঁত, আরো সুন্দর, আরো বিজ্ঞানসম্মত মানুষ সৃষ্টির পরিকল্পনা। এ-ব্যাপারে চিকিৎসাবিজ্ঞান সম্ভবত সবচেয়ে বেশি সাহায্য পেয়েছে চার্লস ড্যাভেনপোর্ট-এর কাছে (‘হেরিডিটি ইন রিলেশন টু ইউজেনিক্স’, ১৯১০)।

সৌজাত্যবাদ কিন্তু হিটলারের নাৎসিবাহিনীর অবদান না। নাৎসিবাদের উত্থানের আগেই, ১৮৮৩ সালে খোদ ইংল্যান্ডে এর জন্ম; আর জন্মদাতা হলেন স্যার ফ্রান্সিস গ্যালটন (১৮২২-১৯১১), যিনি আবার সম্পর্কে ছিলেন ডারউইনের ভাই। অবশ্য সৌজাত্যবিদ্যা তার বাস্তব রূপ পরিগ্রহ করেছিল আমেরিকাতেই। ডারউইন ও হার্বার্ট স্পেনসারের (১৮২০-১৯০৩) তত্ত্বের ভিত্তিতে, মার্কিনি সংবাদমাধ্যমের আন্তরিক সহযোগিতায় এবং রকফেলার ও কার্নেগির মতো ধনকুবেরদের অর্থসাহায্যে তৈরি হয়েছিল সামাজিক ডারউইনবাদ। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে, জিনসর্বস্ব ধারণার পিছনেও আছে সামাজিক ডারউইনবাদের অবদান।

সামাজিক ডারউইনবাদ মনে করে, জিন-এর চরিত্র দিয়েই আমাদের যাবতীয়, বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি রোগ-বিরোগের ব্যাখ্যা দেওয়া যায়। এই বিজ্ঞতা সম্বল করে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা ভাবেন, ডায়াবিটিসের জিনটা খারাপ, হৃদরোগের জিন খারাপ, আর ক্যানসারের জিন তো অতি জঘন্য। তাঁরা রোগের কারণ খুঁজতে থাকেন জিন-এর নষ্ট-চরিত্রের মধ্যে। রোগ থেকে রেহাই পেতে গেলে নাকি নষ্ট জিনকেই নিকেশ করতে হবে। জীবনটা যেন এক যুদ্ধের পটভূমি। অথচ শুধু দীর্ঘমেয়াদি রোগই না, স্বল্পমেয়াদি রোগগুলোকেও ওভাবে দেখা যায় না। এমনকী, আমাদের শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থার (‘ইমিউনিটি’) চর্চা অনেক পথ পরিক্রমা করেও আর কোনো দিশা খুঁজে পাচ্ছে না। আসলে এই দৃষ্টিভঙ্গি রোগের সঙ্গে ব্যক্তি মানুষের বহুমাত্রিক (‘নন-লিনিয়র’) সম্পর্কটা মুখে মানে, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে মানতে চায় না।

তাই কৌতুকময় মনুষ্যদেহের আশ্চর্য বর্ণময়তায় আলোকিত হবার বদলে আমরা ভেবে নিলাম, এই মানবদেহ যেন এক অনন্তর গোয়েন্দাগিরির ময়দান। গোয়েন্দার মতো আনাচ-কানাচে লুকিয়ে থাকা নষ্ট জিনটাকে খুঁজে বার করে আনতে হবে। আমরা বুঝতে পারি না যে শুধু জিন না, আমাদের শরীরে আরো অনেক রহস্য আছে যা আরো অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। জিনের বাইরে এমন কিছু সংকেতবাণী ঘুরে বেড়ায় যারা জিনকে সাময়িকভাবে নিষ্ক্রিয় বা নিশ্চুপ করে দিতে পারে। এদেরকেই জিনোর্ধ্ব (‘এপিজিনেটিক’) সংকেত বলে বর্ণনা করা হয়। সেখানে গোয়েন্দাগিরি চালাতে গেলে তার কোনো শেষ থাকবে না। তার চেয়ে বরং সেই আশ্চর্য গতিময়তা, সেই বিপন্ন বিস্ময়ের চর্চাই আমাদের আরো অনেক বেশি আলোকিত করে তুলতে পারে। তা না-করে আমরা যে সরল অঙ্কের ধাঁচ মেনে নিয়েছি, বিপদ সেখানেই।

বিপদ এই ভাবনায় যে গোয়েন্দাগিরিতে আমরা যত ধুরন্ধর হয়ে উঠব ততই আমাদের আধুনিকতা প্রমাণ হবে। আমরা ভাবিনি যে কখনো-সখনো গোয়েন্দাগিরির দরকার আছে বটে; কিন্তু তা সময়ে-সময়ে ক্লান্তিকর। তখন মনে হয়, রণক্লান্ত বিদ্রোহীর মতো আমরা যেন সমস্যার পরিধি ধরেই ঘুরে বেড়াচ্ছি; অন্তর্বস্তু যেন ছলনাময়ী। আধুনিক চিকিৎসকদের মনোজগতে অচিরে তাই হতাশা দানা বাঁধে। একটি কৌতূহলজনক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৮৬ সালে পুরুষ চিকিৎসকদের প্রায় ৬০% চিকিৎসা পেশায় যুক্ত থাকার জন্য অনুতপ্ত থাকতেন। এই হার এখন নিশ্চয়ই আরো বেড়েছে। অথচ ১৯৮১ সালে তা ছিল ৪৫%, ১৯৭৬ সালে ছিল প্রায় ২৫%, আর ১৯৬৬ সালে ছিল মাত্র ১০%! এই ঊর্দ্ধমুখী হতাশা কি আর আধুনিকতা প্রমাণ করে?

কেবল চিকিৎসকই না, আধুনিক চিকিৎসার ধরন আর ধাঁচ মানুষকেও যতটা আপাত সুখের সন্ধান দিয়েছে ততটা স্বস্তি দেয়নি। যেমন, ১৯৬৮ আর ১৯৯৬ সালের তুলনা করে আরেকটি পরিসংখ্যান দেখায়, সাধারণ মানুষজন তাঁদের শরীরটাকে নিয়ে কী ভাবেন! যাঁরা ভাবেন, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অবদানে শরীর ক্রমশ উন্নত হচ্ছে তেমন মানুষের সংখ্যা ৭০% থেকে কমে হয়েছে ৩৫%। যাঁরা ভাবেন, শরীর উত্তরোত্তর খারাপ হচ্ছে তাঁদের সংখ্যা ১৫% থেকে বেড়ে হয়েছে ৫০%। তার মানে, আমরা ভাল থাকছি নাকি থাকছি না তা নিয়েই সংশয়। আমাদের স্বস্তি নেই। অথচ চিকিৎসাবিজ্ঞান তো আমাদের স্বস্তির সন্ধান দেবে বলেই কথা দিয়েছিল।

কথা তো সে রাখল না। কেন রাখল না? অথচ একটু চোখ মেলে তাকালেই তো আমরা দেখি, মানুষের জীবনযাত্রা আরো সুগম করতে গিয়ে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান কী না করেছে। পেনিসিলিন আবিষ্কার থেকে রেডিওথেরাপি, বাই-পাস, অঙ্গ প্রতিস্থাপন, ডায়ালিসিস, স্ক্যান, নলজাতক, এবং ভায়াগ্রা। সবই তো এই চিকিৎসাবিজ্ঞানের দান। তাহলে? আসলে একটু মনোযোগ দিলেই আমরা দেখব, চিকিৎসাবিজ্ঞানের চমকপ্রদ অবদানগুলো ক্রমশ তার ধার হারাচ্ছে, সে যেন একই চক্রপথে ঘুরতে–ঘুরতে কেবল কালের সাক্ষী হয়ে পড়ল। অন্তর্বস্তুর কাছে তার যাওয়াই হল না। সেখানে না-গেলে স্বস্তি মিলবে কী করে?

Darwin’s sea-seal and cancer

প্রাতিষ্ঠানিক ক্যানসারচর্চাতেও সেই ডারউইনেরই ছায়া। ডারউইনের তত্ত্ব অনুযায়ী, এক বা একাধিক কোষের এক বা একাধিক জিন-এর মধ্যে সুযোগমতো (‘চান্স’), এলোপাথাড়িভাবে মিউটেশন ঘটে যায়। তাতে কোষের স্বভাব বদলে যায়। এই কোষ স্বাভাবিক কোষের তুলনায় বলশালী, কিন্তু নষ্ট চরিত্রের। সেই নষ্ট কোষও প্রাকৃতিকভাবে ‘নির্বাচিত’ হয়ে যায়; তাই সে টিকে থাকতে পারে, বংশবৃদ্ধি করতে পারে, ছড়িয়েও পড়তে পারে। এই হল ক্যানসার। তার সঙ্গে স্বাভাবিক কোষের একটা যুদ্ধ চলতে থাকে; আর সেই যুদ্ধে ক্যানসার কোষই জেতে। তারপর আরো মিউটেশন হয়, ক্যানসার কোষ আরো বিবর্তিত হয়, আরো বিধ্বংসী হয়; সেও প্রাকৃতিক নির্বাচনের ফলে। কেন যে প্রকৃতি অমন নিষ্ঠুর আচরণ করে তা কিন্তু কেউ জানে না। এর নির্গলিতার্থ হল,আমাদের জিন-সংগঠন এমনই পলকা যে তা যখন-তখন ভেঙে পড়তে পারে। তাই কিছু মানুষ থাকবেন যারা ঠিক টিকে থাকার যোগ্য না; তাদেরকে ক্যানসারের ভার বইতে বইতে যথাশীঘ্র বিদায় নিতে হবে। অতএব, কী আর করা!

কিন্তু সামাজিক ডারউইনবাদ এখানে থেমে থাকে না। সে বলে, করার অনেক কিছু আছে। যেমন, ক্রিয়াশীল মানুষ হিসেবে আমরা ওই প্রাকৃতিকভাবে নির্বাচিত ক্যানসার কোষগুলোকে ধ্বংস করে দিতে পারি। অর্থাৎ ‘ক্যানসারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’। সেই যুদ্ধ আমরা বেশ কিছুকাল ধরে চালাচ্ছি। কিন্তু সেখানেও ধন্দ; কেননা যুদ্ধ চালাতে গিয়ে দেখছি, এই যুদ্ধ তো শুধু নষ্ট কোষের বিরুদ্ধে না; বরং যেকোনো কোষের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ। কারণ, ক্যানসার আমাদের কোষীয় বিবর্তনের পরিণতি হিসেবে, অন্যান্য কোষের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িত, অবিচ্ছেদ্য। চরিত্র আলাদা হলেও জিনগতভাবে ক্যানসার কোষের সঙ্গে অন্যান্য কোষের কোনো বুনিয়াদি তফাৎ নেই। তাই যুদ্ধ চালাতে গিয়ে উঠে আসছে বিচিত্র সমস্যা।

কেমন সে সমস্যা? যেমন, সন্ত্রাসবাদ নির্মূল করতে গিয়ে রাষ্ট্র যা করে প্রায় তেমনই! গত শতকের চল্লিশের দশকে আমরা শুনতাম, একটা সুস্থ, সভ্য সমাজে হিংস, দুর্বৃত্তরা যেমন আচরণ করে, মানবদেহে ক্যানসার কোষের আচরণও ঠিক সেই রকম। দুর্বৃত্তদের জন্ম হয় কোনো না কোনো অস্বাভাবিক পরিবেশে, সে মানবসমাজই হোক বা কোষের সমাজ। দুর্বৃত্তরা আসলে একই রকম। তাই তাদেরকে ধ্বংস করাই আমাদের পবিত্র কাজ। সেই কাজে শুধু বিজ্ঞানীরা না, জনসাধারণকেও সক্রিয় হতে হবে। এই ধারণা নিয়েই তো আমরা পুরোদমে যুদ্ধে নেমেছিলাম। অথচ তাতে ক্যানসারের হার কমেনি। আর ক্যানসার-জনিত মৃত্যুর হার কমেছে বলে যা বলা হয় তা নিয়েও অনেক সংশয়।

অন্তত ষাট বছর ধরে এতসব সংশয় আর সমস্যা ঘাড়ে করে অবশেষে নতুন শতকে এসে আবার শুনছি, নতুন-নতুন ওষুধের বিরুদ্ধে ক্যানসার কোষগুলো যে ক্রমান্বয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলছে, এটাই নাকি ক্যানসার শাস্ত্রে এখন বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনকী, ‘লক্ষ্যভেদী’ ওষুধগুলোও (‘টার্গেট থেরাপি’) লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে পড়ছে। তার মানে, গত শতকে যা ছিল উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা, নতুন শতকে তা পরিতাপে পরিণত হয়েছে। মানবসমাজই হোক বা কোষের সমাজ, কোথাও আমরা বর্বর দুর্বৃত্তদের সভ্যতা শেখাতে পারিনি। না মানবসমাজ, না কোষের সমাজ কোথাও কোনো নিরাপত্তার আশ্বাসও রাখতে পারিনি। এই পরিণতি দেখে চিত্ত মোটেই প্রফুল্ল হয় না। বরং ক্যানসার-চর্চা নিয়েই আমাদের উদ্বেগ বাড়ে, সংশয়ও বাড়ে; কোনোটাই কমে না।

সংশয় এই কারণে যে এই যুদ্ধের ফল তো শুধু শূন্য হয় না, হয় বিয়োগান্ত। অতএব এখন বোঝা যাচ্ছে, ২০২৫ সাল নাগাদ আমাদের অসুখ-বিসুখের শতকরা আশি ভাগই হবে আধুনিক চিকিৎসার অবদান (‘আয়াট্রোজেনিক’)। তার মানে, মননের দিক থেকে ক্যানসার প্রতিষ্ঠানগুলো আজও মধ্যযুগেই পড়ে আছে। তারা ভাবে, প্রকৃতিকে শত্রু আর মিত্র এই দু’ভাগে ভাগ করে ফেলা যায়। তেমনি, আমাদের দেহপ্রকৃতি, আমাদের জৈবিকতার মধ্যেও শত্রু-মিত্র প্রভেদ খুঁজে বার করতে হবে। তাই ক্যানসার একটা পরজীবী, আমাদের শত্রু। যুদ্ধ করেই তাকে পরাস্ত করতে হবে। আধুনিক জীবন আর আধুনিক বিজ্ঞানের করুণায় আপাতত এমন একটা সরল, যান্ত্রিক ফরমুলায় আমরা বিশ্বাস করতে শিখেছি।

এই বিশ্বাস ক্রমশ এমন প্রস্তরীভূত হয়েছে যে আমরা ভুলে গেলাম, প্রকৃতি আসলে একটি অতি জটিল ‘ফেনোমেনন’, সে এক বিচিত্র জালবিন্যাস। এও ভুলে গেলাম যে এই জালবিন্যাস, এই মহাজালিকা নিজেই একটা জীবন্ত সত্তা, একটা ‘সিস্টেম’। এই জালবিন্যাসের এক অতিক্ষুদ্র অতি সামান্য উপাদান হল মানুষ, আমাদের মানবজগৎ। তাই ক্যানসারকে একটা বাইরে থেকে আমদানি করা, পরিবেশের সমস্যা হিসেবে দেখলে সেটা যান্ত্রিকতা ছাড়া আর কী? পরিবেশ কি দেহের বাইরেই থাকে? দেহের বাইরে যা থাকে সে তো আমাদের প্রতিবেশ। আমরা তাকেই পরিবেশ ভেবে নিয়ে আমাদের দেহের মধ্যে, প্রতিটি কোষের মধ্যে যে অনন্য পরিবেশ রচিত হয়ে আছে তার কথা ভুলে যাই। সেই পরিবেশই তো আমাদের জৈবিকতার চাবিকাঠি।

আমরা জীবাণুর জগতকে ভাবি, আমাদের শত্রু; অথচ সেই প্রাচীনতম জগতে অর্বাচীনের মতো প্রবেশ করে আমরাই যে তাকে আক্রমণ করে বসে আছি সেকথা ভুলে যাই। এই যান্ত্রিক ধারণা নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক ক্যানসারবিদ্যা আমাদের কোনো নতুন দিশা দেখাতে পারছে না। ইঁদুরকে ‘ক্ষুদ্র মানুষ’ বলে ধরে নিয়ে গবেষণাগারে আমরা ক্রমান্বয়ে ক্যানসার সারিয়ে দিচ্ছি, অথচ গবেষণাগারের বাইরে মুক্ত আকাশের নীচে আমরা যেন কিংকর্তব্যবিমূঢ়। একটা সঙ্কটের জালে জড়িয়ে আমরা এখন হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে আছি। তাহলে এখন কী করা ?

মনে হয়, ক্যানসারকে পরজীবী বলে দেখাটা চূড়ান্ত মূর্খামি। জীবের শরীরে ক্যানসার একটি স্বতঃস্ফূর্ত সৃজন। এই সৃজনে, জিন-এর সঙ্গে জিন-এর এবং জিনের বাইরের বিচিত্র উপাদানের মধ্যে গতিময় প্রক্রিয়া থাকে। সেই জটিল গতিময়তাই ক্যানসারকে তার মৌলিক চরিত্র দান করে। মিউটেশন দিয়ে এই জটিল গতিময়তাকে বোঝা যায় না। তাকে বুঝতে গেলে দরকার একটি সার্বিক দৃষ্টিভঙ্গি। ধরিত্রী নিজেই একটি জীবের মতো স্বয়ংসম্পূর্ণ, সু-সংগঠিত এবং স্ব-নিয়ন্ত্রিত। এই নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় জীব তার প্রতিবেশী সমেত একই সঙ্গে বিবর্তিত হয়। এমন নয় যে এক দিকে জড় ধরিত্রী আর অন্য দিকে জীব; দ্বিতীয়টি প্রথমটির সঙ্গে ক্রমাগত খাপ খাইয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি প্রজাতির জীবসত্তা নিজের বৈশিষ্ট্যের স্বতন্ত্র এবং পূর্ণ। সেই জীবসত্তার মধ্যেই ক্যানসার আর একটি স্বতন্ত্র ও পূর্ণ জীবসত্তা হিসেবে প্রকাশিত হয়, বিবর্তিত হয়। ক্যানসার এক অন্য প্রজাতি-চরিত্র (‘স্পিসিস ক্যারেকটর’)।

আনুষ্ঠানিক ক্যানসার বিজ্ঞান এই যুগ্ম-বিবর্তনকে (‘কো-এভোলিউশন’) বুঝতে চায় না। কারণ, পূর্ণতার ব্যাখ্যা, প্রজাতি সৃষ্টির ব্যাখ্যা, আর স্ব-সৃজনের ব্যাখ্যা ডারউইনীয় মডেলের হাতে নেই। ক্যানসার বিজ্ঞানে জিনের যে-মডেলটিকে নিয়ে আমাদের চর্চা তা দিয়ে শুধু হিমশৈলের ভাসমান চূড়াটুকুই দেখা যায়, এর বেশি কিছু না। চূড়াটা মিথ্যে না, কিন্তু তাকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করতে পারলেই হিমশৈলটাকে বুঝে ফেলবো এই ভাবনাতেই আমাদের যত বিপত্তি। খণ্ডতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের এই বিপত্তির মধ্যে ফেলে দেয়। যে-মিউটেশন নিয়ে আমাদের এত পরিতাপ, ক্যানসার সৃষ্টিতে তার অবদান যে সত্যিই কতটুকু তা নিয়েই এখন বিজ্ঞানীদের একাংশের সংশয়। মিউটেশনকে নাকি ক্যানসারের ‘কারণ’ না-বলে তার ‘পরিণতি’ হিসেবেও দেখা যায়।

আসলে সৃষ্টির ‘কারণ’ আর ‘ব্যাকরণ’ আমরা গুলিয়ে ফেলেছি। এও মনে রাখিনি যে ‘আদিম ঝোল’ (‘প্রাইমর্ডিয়াল সুপ’) ছিল মূলত ক্যানসার-ধর্মী, অমরত্বের প্রতিভূ। তা ছিল ‘প্রাণের পূর্বাবস্থা’; তা থেকেই প্রাণের সৃষ্টি, আর সেই সৃষ্টির সর্বোত্তম আবিষ্কার হল মৃত্যু। তাহলে ক্যানসার থেকেই আমাদের জন্ম, হয়তো ক্যানসারেই আমরা বিলীন হয়ে যাব। তার মানে, জীববিজ্ঞানের খণ্ডতাবাদী চর্চা আমাদের সমৃদ্ধ করেছে, বিদ্বান করেছে, কিন্তু প্রাজ্ঞ করতে পারেনি।

তাই মনে হয়, জীববিজ্ঞানের সূচিমুখ পাল্টাবে। জীববিজ্ঞানের ডারউইনীয় চর্চা জীবকে দেখেছে একটা মেশিনের মতো; কিন্তু মেশিন নিজেকে নতুন করে সৃষ্টি করতে পারে না, জীব তা পারে। জীব তাহলে কী? কীভাবে তাকে বুঝতে হবে? ধরা যাক, একটি শিশু একটা কাঠি দিয়ে পুকুরের জল নিয়ে খেলছে। জল বার বার সরে যাচ্ছে, বার বার এসে জমছে। জীব হচ্ছে তাই, – উত্তাল প্রবাহের মধ্যে এক স্থিতিস্থাপক বিন্যাস। এই জটিল এবং গতিময় বিন্যাসকে বুঝতে পারলে আমরা এও বুঝব যে ক্যানসার সৃষ্টির যেমন একটা অবশ্যম্ভাবিতা আছে তেমনই আছে এক সম্ভাব্যতা। জীববিজ্ঞানের এই অমোঘ বাস্তবতাকে আমরা এড়িয়ে থাকতে পারব না।

ডারউইন (১৮০৯-৮২)। এই একটিমাত্র শব্দবন্ধ দিয়ে আমরা, এই আধুনিক মনুষ্য-প্রজাতি আমাদের শিরস্ত্রাণ রচনা করেছি, তার ওপর লাগিয়েছি আরো পালকগুচ্ছ, তারপর বিজয়ীর পদচিহ্ন এঁকে চলেছি ধরিত্রীর বুকে। ওই শব্দবন্ধের মধ্যেই নিহিত হয়ে আছে সেই যুক্তির সজ্জা যার জোরে আমরা আদিম মানুষকে বলতে পারি বর্বর, সাদার মোড়ক দিয়ে শাসন করতে পারি কালো চামড়াকে। ডারউইনই আমাদের শিখিয়ে দেন ঘুণপোকা কেন নিকৃষ্ট জীব, বটবৃক্ষ কেন উৎকৃষ্ট। ডারউইন আমাদের নিয়ে আসেন বিজ্ঞানের ইতিহাসের সেই যুগসন্ধিতে যখন খণ্ডতাবাদ নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করছে, আর তার ঝোড়ো হাওয়ায় কুঁকড়ে পিছিয়ে গেছে পূর্ণতাবাদের তত্ত্ব।

কিন্তু আজ মনে হয়, পূর্ণতাবাদ নতুন সাজে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে; সৃষ্টি, প্রাণ আর ক্যানসার নিয়ে সে আরো প্রাঞ্জল আরো যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা দিতে পারবে। প্রশ্নপ্রবণ মানুষের অপার বিস্ময়কে আরো উসকে দিয়ে সে কোনো না কোনোভাবে স্বস্তির সন্ধান দিতে পারবে। কেননা জীববিজ্ঞানের পুরনো প্রতিনিধি হাঁপিয়ে উঠেছে, আর নতুন প্রতিনিধির হয়তো এত কিছু দেবার আছে যা পুরনোপন্থীরা ভাবতেও পারে না।

ৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃ

প্রসঙ্গত –
• A Commentary On Homage To Darwin Debate. With an Afterword by Professor Denis Noble. James D. MacAllister. PART 1. http://musicoflife.co.uk/pdfs/HOMAGE_COMMENTARY_Music%20of%20Life.pdf
• A Critique of Darwin’s Theory of Evolution. (Part 1). Alex Paterson. http://www.vision.net.au/
• A New Biology for a New Century. Carl R. Woese. Microbiology and Molecular Biology Reviews; Vol. 68, No. 2. p. 173-186. June 2004.
• Are Increasing 5-Year Survival Rates Evidence of Success Against Cancer? H. Gilbert Welch; Lisa M. Schwartz; Steven Woloshin. JAMA (Journal of American Medical association). 283:2975-2978. June 14, 2000.
• A Review of Darwin’s Black Box: The Biochemical Challenge to Evolution, Michael J. Behe. Robert L. Dorit. http://www.americanscientist.org/
• An Overview of Cancer Multidrug Resistance: A still unsolved problem. Lage. H. Cellular and Molecular Life Science. 65(20):3145 – 67. Oct 2008.
• Beyond Genetic Determinism: Toward a New Paradigm for Life. Richard Strohman. http://www.mindfully.org/
• Biology as Ideology: The Doctrine of DNA. Richard C Lewontin. Harper Perennial; Reprint edition. 1991.
• Cancer and the Human Genome: No Quick Fix. Pete Moore. The Lancet. Vol 357, Number 9255. Feb 17, 2001.
• Cancers Beget Mutations Versus Mutations Beget Cancers. Richmond T. Prehn. Cancer Research; 54, 5296-5300. 1994.
• Cancer Causation: The Darwinian Downside of Past Success? Mel Greaves. The Lancet Oncology. Vol 3, Number 4. April 1, 2002.
• Cancer Clusters: Statistically Inevitable? Elizabeth M. Whelan. Environment News. November 1999.
• Cancer: Complexity, Causation, and Systems Biology. James A. Marcum. Medicina & Storia – Seminar on Causality Models in Medicine, 2008.
• Carl Woese’s Vision of Cellular Evolution and the Domains of Life. Eugene V Koonin. RNA Biology 11:3, 197–204; March 2014.
• Causality and Medicine. Joseph Agassi. The Journal of Medicine and Philosophy; Vol. I, no. 4. 1976.
• Chaos. Making a New Science. James Gleick. Penguin USA; August 2008.
• Complexity and Life. Fritjof Capra. Emergence, 4(1/2), 15–33. 2002.
• Darwin’s Blind Spot: The Role of Living Interactions in Evolution. Frank Ryan. First published by Thomson/Texere 2003. http://www.fprbooks.com/Preview.pdf
• Darwin on Trial by Phillip E. Johnson, Book Review: Henry H. Bauer, Journal of Scientific Exploration 6(2), p. 181. 1992.
• DNA Is Not Destiny The new science of epigenetics rewrites the rules of disease, heredity, and identity. Ethan Watters. Discover Magazine, Vol. 27 No. 11. November 2006.
• Don’t stop for repairs in a war zone: Darwinian evolution unites genes and environment in cancer development: Jarle Breivik. Proc. Natl. Acad. Sci. 2001. May 8. 98(10): 5379-5381…
• Evolution Theory from a New Perspective. G. Zajicek. The Cancer Journal – Vol 6, No 4. July-Aug 1993.
• Faith-Based Medicine. John A Lee. The Lancet Oncology; Vol 3, Number 7. July 2002.
• From Gaia to Selfish Genes: Selected Writings in the Life Sciences. Barlow, Connie. Cambridge, Mass.: MIT Press, 1991.
• Genetic Determinism as a Failing Paradigm in Biology and Medicine: Implications for Health and Wellness. Richard C Strohman. Spring/Summer JSWE. Vol 39, No 2. http://www. cswe.org/ publications/ jswe/03-2strohman.htm. 2003.
• Geneticism. Medawar PB. In: The Harper Dictionary of Modern Thought, NY; Harper and Row. 1977.
• Human Genome Project in Crisis: Where is the program for life?: Richard Strohman. California monthly. April 01.
• Humble pie. John A Lee. The last word. The Lancet Oncology. Volume 2, Number 5. May 1, 2001.
• Interpreting Cancer Survival Rates. Enstrom J E, Austin D F. Science; 195: 847-851. 1977.
• Is Biology Reducible to the Laws of Physics? John Dupré. American Scientist. May-June 2007.
• Is Our Fate In Our Genes?. Barbara Payne. http://www.prostateaction.org/research/ is our_fate.html. 2001.
• Lynn Margulis Says She’s Not Controversial, She’s Right. Discover Interview. APRIL 2011.
• Neo-Dawinism, the Modern Synthesis, and Selfish Genes: Are they of use in physiology? Noble D. (2011a). Journal of Physiology 589, 1007-1015.
• No Easy Answers in Cancer Debate. Gina Kolata. The New York Times. December 26, 2002.
• Nonlinearity in the Epidemiology of Complex Health and Disease Processes. Philippe P, Mansi O. Theoretical Medicine and Bioethics; 19:591-607 (Abstract). 1998.
• On the Origin of Species. Charles Darwin. (Paperback), Editor –William Bynum,‎ Penguin Classics. Ed I. 2009
• Punctuated Equilibria: The Tempo and Mode of Evolution Reconsidered. Gould S.J., and N. Eldredge. Paleobiology, 3, pp. 115-151. 1977.
• The Biology of Cancer : A New Approach. P. R. J. Burch. Letters to the Editor. British Journal of Cancer; 35, 388; 1977. brjcancer00300-0127.pdf
• The Cytoplasmic Basis of Cellular Differentiation…. Kothari ML, Mehta LA. Journal of Postgraduate Medicine; 30:199-206. 1984.
• The Descent of Man (Paperback). Charles Darwin. Quill Pen Classics. 2008
• The Fifth Miracle: The Search for the Origin of Life. Davies P. London: Penguin Books; 1998.
• The Illusion of Certainty. Erik Rifken, PhD, and Edward Bouwer, PhD. New York: Springer Science+Business Media, 2007.
• The Music of Life: . Biology Beyond the Genes. Noble, Denis. OUP, UK. 2006.
• The Nazi War on Cancer. Robert N Proctor. Princeton University Press, 1999.
• The Problems of Cancer Biology. RR Spencer. Journal of American Medical Association. 127(9):509-514. 1945. http://jama.jamanetwork.com/article.aspx?articleid=273135
• The Rise and Fall of the Third Chimpanzee: How Our Animal Heritage Affects the Way We Live. Jared Diamond. Vintage Books; New Ed. Paperback – July 1, 2003. (First Pub by Radius, 1991)
• The Rise and Fall of Modern Medicine. James Le Fanu. Diane Publishing Company. 2001.
• The Role of Mutation in the New Cancer Paradigm. Richmond T Prehn. Cancer Cell International; 5:9; 2005.
• The Unravelling of Our Genetic Structure: What Makes us Human?. Terry Philpot. Manchester Guardian. Sept 2, 2000.
• Untangling the Roots of Cancer. W. Wayt. Scientific American. June 09, 2003.
• When Theories Collide: Experts develop different models for carcinogenesis. Webb T. Journal of National Cancer Institute (JNCI);93: 92-94. 2001.
• Where is the Wisdom…? The poverty of medical evidence. Editorial. British Medical Journal; 303: 198-99. October 5, 1991.
• Why Us: How Science Rediscovered the Mystery of Ourselves. James Le Fanu. Vintage Books. 2010.
• Wildlife And Plants. Vol 12;; Ed III; Publisher: Marshall Cavendish, 2007.

Add Comments