রসায়নে এবারের নোবেল

অক্টোবর, ২০১৮
-প্রসেনজিৎ মজুমদার
অণুজীববিদ্যার তৃতীয় বর্ষের ছাত্র

রবীন্দ্রনাথ শেষের কবিতায় বলেছেন, ‘পৃথিবীর পরম নম্র জিনিসগুলোই পরম আশ্চর্যের, সহজে চোখে প’ড়ে না।’ অন্তত জীবরসায়ন এবং আনবিক জীববিদ্যার পরতে পরতে মিশে আছে এমন অসংখ্য উদাহরণ। এরিক ল্যান্ডার এম.আই.টি-র একটি ওপেনকোর্স লেকচারে মজা ক’রে বলেছিলেন, আনবিক জীববিদদের কাজ অণুজীবরাই তো অর্ধেক কমিয়ে দিয়েছে, কারণ অণুজীব নিজেদের রক্ষার্থে যে পন্থা ব্যবহার করে, তা কিছু ক্ষেত্রে প্রায় ধার ক’রেই গ’ড়ে উঠেছে আজকের বহু গবেষণাপত্র এবং তা থেকে তৈরি হয়েছে কিছু শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার।

এ বছর রসায়নে যারা নোবেল পেলেন - ফ্রান্সিস এইচ. আর্নল্ড, জর্জ পি. স্মিথ এবং স্যর গ্রেগরি পি. উইন্টার, তাঁদের কাজটাও কিছুটা এরকমই। ফ্রান্সিস আর্নল্ড নোবেল পেয়েছেন তাঁর ‘ডিরেক্টেড ইভোলিউশন’ শীর্ষক কাজের জন্য। তাঁর নিজের কথায়, এ যেন প্রকৃতির একটা পদ্ধতিকে নকল করা। ব্যাপারটা আদতে কেমন? অত্যন্ত শীতল জলে মাছেরা দিব্যি থাকতে পারে তাদের অ্যান্টিফ্রিজ প্রোটিনের জন্য বা সমুদ্রের নীচের কিছু জীব পাথরে আটকে থাকতে পারে তাদের শরীরে উপস্থিত একধরণের বিশেষ আঠার জন্য। অর্থাৎ ‘তোমার পতাকা যারে দাও তারে বহিবারে দাও শকতি’ - প্রকৃতি প্রতিকূল স্থানে বেঁচে থাকার উপযুক্ত বন্দোবস্ত ক’রে রেখেছে কিছু জীবের শরীরে। ফ্রান্সিস বলছেন, ধরুন যদি মানুষ নিজের প্রয়োজনমতো কিছু প্রোটিন বানাতে পারে যা শরীরের বিভিন্ন কাজ আরও নিখুঁতভাবে করতে পারে? খোদার ওপর খোদ্দারি - প্রকৃতির চোখে চোখ রেখে বিজ্ঞানের কলার তোলা রোয়াব – এভাবেই বিজ্ঞানীরা এই আইডিয়াকে গ্রহণ করেছিলেন তখন। অনেকেই বিশ্বাস করেননি এমনটা সম্ভব। ফ্রান্সিস প্রথমে ‘সাবটিলিসিন’ নামে এক উৎসেচক নিয়ে কাজ শুরু করেন, যা দুধের কেসিন প্রোটিনকে ভাঙতে সাহায্য করে। সাবটিলিসিন জল জাতীয় দ্রবনেই মূলত বিক্রিয়া করে। পরে এই প্রোটিনের জন্য দায়ী জিনে কিছু মিউটেশন ক’রে দেন এই লক্ষ্যে, যদি জলের বদলে জৈব দ্রবন-ডি.এম.এফ (ডাইমিথাইল ফর্ম্যামাইড)-এ কেসিনের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করা যায়। এই মিউটেশনের ফলে কিছু ক্ষেত্রে কেসিন ডি.এম.এফে কিছুটা কার্যক্ষমতা দেখায় এবং তৃতীয় জেনারেশনের পর কেসিন আগের চেয়ে দু’শো ছাপ্পান্নগুণ বেশী কার্যক্ষম হয়, এই বৃদ্ধিকারী মিউটেশনের সাহায্যে ক্রমশ কেসিনকে ডি.এম.এফে কার্যকরী করা যায়। এভাবে মিউটেশনের মাধ্যমে পথ দেখিয়ে কার্যক্ষমতা বৃদ্ধির পদ্ধতিই ‘ডিরেক্টেড ইভোলিউশন’। এর ফলে শুধু বিভিন্ন উৎসেচকের দক্ষতা বৃদ্ধিই নয়, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে আস্ত একটা উৎসেচকই হয়তো তৈরি করা যেতে পারে একদিন!

অন্যদিকে স্মিথের কাজ ব্যাকটেরিওফাজ নিয়ে। ‘ব্যাকটেরিওফাজ’ একধরণের ভাইরাস যারা ব্যাকটেরিয়াকে আক্রমণ ক’রে তার শরীরে নিজের জনন ঘটায়। ব্যাকটেরিয়ার শরীরে তারা নিজেদের জেনেটিক বস্তুর প্রতিলিপিকরণ করে। ১৯৯০-তে যখন ক্লোনিং সদ্য খ্যাতি পাচ্ছে এবং জিন ও প্রোটিনের সম্পর্ক প্রায় অনাবিষ্কৃত, তখন স্মিথ ক্লোনিং-এর মাধ্যমে ফাজের জেনেটিক বস্তুতে নির্দিষ্ট কিছু জিন ঢুকিয়ে তাদেরকে ব্যাকটেরিয়ার শরীরে প্রতিলিপিকরণ করার সুযোগ দেন। ফলে ব্যাকটেরিয়ার শরীরে ফাজের জেনেটিক বস্তুর প্রতিলিপিকৃত হওয়ার সময় ক্লোনড জিনটিরও প্রতিলিপিকরণ ঘটে এবং জিনটি যে পেপটাইডের জন্য দায়ী তা ক্যাপসুলের গায়ে দেখতে পাওয়া যায়। পরে অ্যান্টিবডির দ্বারা এই পেপটাইডগুলো চিহ্নিত করেন তিনি। এইভাবে পেপটাইডটির জন্য দায় জিনটিকে শনাক্ত করার পদ্ধতি আবিষ্কার করেন স্মিথ। এর নাম ‘ফাজ ডিসপ্লে’।

স্যর গ্রেগরি উইন্টার আবার কাজ করেছেন সুদক্ষ অ্যান্টিবডি বানানোর পদ্ধতি নিয়ে। ১৯৮০ সাল নাগাদ বিভিন্ন অ্যান্টিবডি পরীক্ষার জন্য ইঁদুরের শরীরে কিছু অ্যান্টিজেন ইনজেক্ট ক’রে নির্দিষ্ট অ্যান্টিবডি শনাক্ত করার কাজ করা হত। কিন্তু এই কাজের একমাত্র বাধা ছিল, অনেকক্ষেত্রেই অ্যান্টিজেনগুলোর ক্ষতিকারক প্রভাবের ফলে ইঁদুরগুলো মারা যেত। স্যর গ্রেগরি প্রথম ইঁদুরের বদলে নিলেন ব্যাকটেরিওফাজ। ফাজ ডিসপ্লের মাধ্যমে তিনি নির্দিষ্ট অ্যান্টিবডি শনাক্ত ক’রে দেখালেন। পরবর্তীকালে তিনি ‘ডিরেক্টেড ইভোলিউশন’ পদ্ধতি এবং ‘ফাজ ডিসপ্লে’ একইসঙ্গে দু’টো ব্যবহার ক’রে আরো নিখুঁত অ্যান্টিবডি বানিয়ে দেখান।

Add Comments