এবারের পদার্থবিদ্যার নোবেল

অক্টোবর, ২০১৮
-অর্পণ পাল
বিজ্ঞান শিক্ষক ও লেখক

পদার্থবিদ্যায় এবার নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন তিনজন বিজ্ঞানী। তাঁদের নাম, তাঁদের কাজ নিয়ে ইতিমধ্যে বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমে খবর প্রচারিত হয়ে গিয়েছে, আগ্রহী পাঠক সে ব্যাপারে জেনেও গেছেন। ‘রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস্‌’ নামের সংস্থা প্রতিবছরের মতো এ-বছরও অক্টোবরের দু’তারিখে ঘোষণা করেছেন এই পুরস্কারের প্রাপক-তালিকা, অতি সূক্ষ্ম লেজাররশ্মির উপর গবেষণার জন্য তিনজন এই পুরস্কার পেয়েছেন। সংক্ষিপ্ত এই নিবন্ধে আমরা তাঁদের কাজ সম্বন্ধে একটু জানবার চেষ্টা করব। পুরস্কারের অর্ধেক অর্থ পাবেন অতি-বৃদ্ধ বিজ্ঞানী আর্থার অ্যাশকিন (Arthur Ashkin), যাঁর বয়স এখন ছিয়ানব্বই বছর, তিনিই এ-পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি বয়সী ব্যক্তি, যিনি নোবেল পেলেন। তাঁর দেশ আমেরিকা, কর্মক্ষেত্র সে দেশেরই ‘বেল ল্যাবরেটরি’। ১৯৪৭ সালে তিনি ব্যাচেলর ডিগ্রি লাভ করেন, আর পি.এইচ.ডি করেন ১৯৫২ সালে। এরপরেই তাঁর বেল ল্যাবে যোগদান, যেখানে তিনি কাটিয়েছেন জীবনের চল্লিশটা বছর। লেজার-সংক্রান্ত গবেষণায় তাঁকে একদম প্রথম সারিতে রাখেন সবাই। লেজার কী? এককথায় বললে অতি শক্তিশালী আলোকরশ্মি, যার শক্তি এতোটাই বেশী, যে তা দিয়ে কারও দেহে ক্ষত সৃষ্টি করা যায় যেমন, তেমনই এই রশ্মিকে পাঠানো যায় বহু কিলোমিটার দূর অবধি, একটুও দিক না-পালটে যেতে পারে সে। ‘লেজার’ শব্দের পুরো কথা হল ‘লাইট অ্যামপ্লিফিকেশন বাই স্টিমুলেটেড এমিশন অব রেডিয়েশন’। কথাটাকে সহজে ব্যাখ্যা করা এই লেখার পরিসরে মুশকিল। সহজ কথায়, আলোকে বারবার প্রতিফলিত ক’রে তার তরঙ্গের ঢেউকে বাড়িয়ে তোলা, বা তাকে অ্যামপ্লিফাই করা। লেজার আলো আসলে একবর্ণীয়, অর্থাৎ সাদা আলোর মতো এ-আলোর মধ্যে নানারকম তরঙ্গদৈর্ঘ্যের তরঙ্গ নেই, আছে একটাই তরঙ্গদৈর্ঘ্যবিশিষ্ট আলো। তাই এর কম্পাঙ্কও একটিই। এই আলোকে খুব ক্ষুদ্র ছিদ্রের মধ্যে দিয়ে যেমন পাঠানো সম্ভব, তেমনই বহুদূর অবধি পাঠানো সম্ভব। ষাটের দশকে এই রশ্মির প্রথম নির্মাণ। আজকাল হরেক জায়গায় এই আলোর ব্যবহার হচ্ছে। বারকোড স্ক্যানার, সিডি বা ডিভিডি প্লেয়ার, চোখের চিকিৎসা— ইত্যাদি কয়েকটা আপাতত বলা গেল। আর্থার অ্যাশকিনের মূল কীর্তি এই লেজারের সাহায্যেই ‘অপটিক্যাল ট্যুইজার’ নির্মাণ। ‘ট্যুইজার’ অর্থাৎ চিমটে কী, সেটা আমরা সকলেই জানি। একটা ছোটো জিনিসকে ধরতে গেলে, খালি হাতে যদি অসুবিধা হয়, তখন আমরা চিমটে ব্যবহার করি। কিন্তু সেই জিনিসটি আরও ছোটো হলে? ধরা যাক, আমরা একটা পরমাণুকে ধরতে চাই। সেটা নিশ্চয়ই আমাদের জানা কোনও চিমটে দিয়ে পেরে ওঠা যাবে না। তখন কাজে লাগবে এই অপটিক্যাল টুইজার। যার বাহুগুলো আসলে অতি-শক্তিশালী লেজার রশ্মি, আর তা দিয়ে ধরা যাবে ভাইরাস কিংবা পরমাণুর পাশাপাশি জীবন্ত প্রাণী-কোষকেও। লেজারের সাহায্যে কীভাবে বস্তুকে ধরা সম্ভব? সেটা একটু ব’লে নেওয়া যাক। লেজার আসলে আলোই। আলো বা ‘লাইট’ আসলে একধরণের তরঙ্গ বা বিকিরণ, যাকে বিজ্ঞানের পরিভাষায় ‘তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ’ নামে ডাকা হয়। এই আলোর মূল উপাদান ফোটন নামের এক ভরহীন কণা। পরমাণুর মধ্যে ইলেকট্রন যখন ওপরের কক্ষপথ থেকে নিচের কক্ষপথে ঝাঁপ দেয়, তখন সে কিছুটা শক্তি ছেড়ে দেয়, যেটা আলো বা বিকিরণ হিসেবে বাইরে বের হয়। কিন্তু আলো দিয়ে ধাক্কা মেরে কোনও জিনিসকে কীভাবে সরানো সম্ভব?

আলোকরশ্মির শক্তি ছাড়াও থাকে ভরবেগ (ভর আর বেগের সমন্বয়ে গঠিত এক ভৌতরাশি, ইংরেজিতে ‘মোমেন্টাম’)। শক্তি আর ভরবেগ সমানুপাতিক। এই ভরবেগকেই বলে বিকিরণ-চাপ, বা ‘রেডিয়েশন প্রেসার’। সাধারণ দৃশ্যমান আলো কোনও বস্তুর উপর ফেললে, এই বিকিরণজনিত চাপের কারণে সেই বস্তুটির ওপর সামান্য হলেও বলপ্রযুক্ত হয়, যেটা মাপাও সম্ভব। ঠিক একই কারণে কারও দেহে শক্তিশালী লেজার রশ্মি ফেললে তার দেহের সেই জায়গাটি গরম হওয়ার পাশাপাশি সেখানে কিছুটা বলপ্রযুক্ত হবে। তবে এই বলের সাহায্যে একটা বড়ো আকারের বস্তু, যেমন ধরা যাক, একটা পেয়ারা, তাকে সরানো অসম্ভব ব্যাপার। কিন্তু এমন ‘লেজার পয়েন্টার’ তৈরি করা সম্ভব, যার সাহায্যে একটি কোষের মতো ক্ষুদ্র জিনিসকে সরানো যায় এবং তা সাধ্যের মধ্যে। অতিক্ষুদ্র জিনিসকে লেজারের সাহায্যে ধরা এবং তাকে নিয়ে চর্চা, এই কাজে ১৯৭০ সাল থেকেই মেতে ছিলেন অ্যাশকিন। দীর্ঘ পনেরো বছরের চেষ্টায় তিনি কাজটা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। জীবন্ত একটি ব্যাকটেরিয়াকে তিনি কোনওরকম ক্ষতি না-ক’রেই একজায়গা থেকে অন্যজায়গায় সরাতে পেরেছিলেন তাঁর অপটিক্যাল ট্যুইজারের সাহায্যে। অপটিক্যাল ট্যুইজারের মূল কথা হল, লেজার আলোকে চিমটের বাহু হিসেবে ব্যবহার করা। অ্যাশকিন দেখিয়েছিলেন, যদি মাইক্রোস্কোপের সাহায্যে লেজার রশ্মিকে একত্রিত ক’রে কোনও ক্ষুদ্র বস্তুর ওপর ফেলা যায়, তবে উলটো ব্যাপার ঘটে। তখন লেজার সেই বস্তুটিকে না-ঠেলে দিয়ে তাকে আরও নিজের দিকে টেনে নেয়, আর বস্তুটি যেন আটকে যায় লেজার রশ্মিটির গায়ে। এবার লেজার রশ্মিটিকে যদি সরানো হয়, সেই বস্তুটিও ভদ্র বালকের মতো সেই রশ্মির সঙ্গে সঙ্গেই চলতে থাকে। লেজার আলোকে এইভাবে ব্যবহার করার মধ্যে যে নানাদিকেই যুগান্তকারী শুভ-সম্ভাবনার মুখ খুলে গেছে — এটাই নোবেল কমিটিকে মুগ্ধ করেছে এবং তাঁর পুরস্কার লাভের জন্য সেটাই মুখ্য ভূমিকা নিয়েছে। অথচ ভাগ্যের পরিহাস, তাঁর সেই সময়কার সহকর্মী স্টিভেন চৌ একই কাজে যুক্ত থাকার সুবাদে নোবেল পেয়েছিলেন আজ থেকে একুশ বছর আগে, কিন্তু বাদ রয়ে গিয়েছিলেন অ্যাশকিন। এতদিনে তাঁর প্রতি সুবিচার হল। তাই পুরস্কার লাভের খবরে অ্যাশকিন তেমন উচ্ছ্বাস দেখান নি। তিনি জানিয়েছেন, নতুন পেপার নিয়ে ব্যস্ত, তাই তিনি হয়তো সাক্ষাৎকার দিতে পারবেন না। একুশ বছরের ঔদাসিন্যের বেদনা কি কম? অপটিক্যাল ট্যুইজার-এর মূল ব্যবহার ঘটছে চিকিৎসাবিদ্যাতেই। ক্যান্সার-আক্রান্ত কোষগুলিকে সুস্থ কোষেদের থেকে সরিয়ে নেওয়া, ... এরকম নানা কাজে আজকাল ব্যবহৃত হচ্ছে অত্যন্ত সূক্ষ্ম যন্ত্র। ভবিষ্যতে এই ক্ষেত্রটিতে আরও উন্নতি হবে, আরও মানুষের উপকার হবে, এটাই নোবেল কমিটির আশা। ২/ আর দু’জন নোবেলজয়ী— ফ্রান্সের জেরার্ড মোরৌ (Gerard Mourou, জন্ম ১৯৪৪ সালে) আর কানাডার ডনা স্ট্রিকল্যাণ্ড (Donna Strickland, জন্ম ১৯৫৯ সালে)-এর মূল কৃতিত্ব অতি উচ্চশক্তিসম্পন্ন একমুখী লেজার রশ্মি তৈরি করতে পারা, যা আজকের দিনে বহুল পরিমাণে ব্যবহৃত হচ্ছে চোখের চিকিৎসায়। তাঁদের পেপারটি আজ থেকে তিরিশ বছরেরও আগে প্রকাশিত হয়েছিল। ডনা-র পি.এইচ.ডি থিসিসের উপদেষ্টা ছিলেন এই জেরার্ড সাহেবই। ডনা স্ট্রিকল্যাণ্ড পুরস্কার পাওয়ায় অনেকগুলি নতুন ব্যাপার ঘটেছে। প্রথমত ইনি মহিলা, আর সে কারণেই ইনি বিশ্বে তৃতীয় মহিলা, যিনি নোবেল পেলেন পদার্থবিদ্যায়। এর আগে পেয়েছিলেন মাদাম কুরি (১৯০৩ সালে) আর মারিয়া গোয়েপার্ট মায়ার (১৯৬৩ সালে)। সুতরাং গত পঞ্চান্ন বছরে তিনিই একমাত্র মহিলা, যিনি পদার্থবিদ্যায় নোবেল পেলেন। কানাডার ওয়াটারলু বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত আছেন ইনি। এই দু’জনের নোবেল প্রাপ্তির কারণ হিসেবে বলা হয়েছে — ‘শক্তিশালী, অতি-ক্ষুদ্র অপটিক্যাল পালস্‌ তৈরি করতে তাঁদের উদ্ভাবিত পদ্ধতির জন্য’। অপটিক্যাল পালস্‌ কী? এ হল অতি শক্তিশালী লেজার পালস্‌। পালস্‌ আসলে তরঙ্গই, কিন্তু এই তরঙ্গের বিস্তারকাল অতি অল্প। যন্ত্র থেকে লেজার রশ্মি নির্গত হল বটে, কিন্তু সেটা খুবই অল্প সময়ের জন্য। কিন্তু যেহেতু শক্তিশালী রশ্মি, তাই রশ্মিটি কোথাও গিয়ে পড়া মাত্র সেই জায়গাটির উষ্ণতা মুহূর্তের মধ্যে গেল বেড়ে। কারণ লেজার আলো যত শক্তিশালী হবে, তার উষ্ণতাও সেই অনুপাতে বাড়বে। এখন উচ্চশক্তিসম্পন্ন লেজার নির্মাণ করবার যে যন্ত্র, সেই যন্ত্রও তো পুড়ে যেতে পারে লেজার রশ্মি নির্গমনের সময়! সে যদি নিজেই পুড়ে যায় তা থেকে নির্গত লেজার রশ্মির কারণে, তবে তো খুবই সমস্যার ব্যাপার। এই দু’জন পেরেছিলেন সে সমস্যার সমাধান করতে। এই টেকনিকের নাম ‘চার্পড্‌ পালস্‌ অ্যামপ্লিফিকেশন’ (‘Chirp’-এর অর্থ পাখির খুব তীক্ষ্ণ কিন্তু সংক্ষিপ্ত ডাক, বাংলায় কূজন বলা চলে); এই বিশেষ লেজার রশ্মি তৈরি করা যায় সাধারণ লেজার নির্মাণকারী যন্ত্র থেকে নির্গত হওয়া লেজার রশ্মির সাহায্যেই। কম সময়কালব্যাপী, এবং অতি শক্তিশালী, তাই একে এই নাম দেওয়া হয়েছে। এই লেজার রশ্মি ব্যবহার করে প্রতিবছর কয়েক লক্ষ মানুষের চোখের সার্জারি করা সম্ভব হচ্ছে। সব মিলিয়ে, এই সময়টি যে লেজার আলো নিয়ে চর্চা করবার, তাকে আরও একটু চিনে নেওয়ার সময়, এতে কোনও সন্দেহ নেই।

Add Comments