কেন সমাজের কাছে বিজ্ঞানকে পৌঁছে দেওয়া আমাদের কর্তব্য

- পার্থপ্রতিম মজুমদার
বিজ্ঞানী

বিজ্ঞান গবেষণা’র সাথে আমি অনেকদিন  যুক্ত আছি | অনেকেই  এজন্য আমাকে বৈজ্ঞানিক বলে |   সে ঠিক আছে |  আমি যখন ছোট ছিলাম তখন আমি বইয়ের পাতায় বৈজ্ঞানিকদের ছবি দেখতাম |  বলা হতো, ওরে বাবা, ওনারা বৈজ্ঞানিক, ওনারা তো দেবতুল্য … ওনারা সাধারণ মানুষ নন … ওনারা আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে … ওনারা আমাদের ভাষায় কথা বলেন না …  ওনাদের বিরক্ত করা উচিত না,  ইত্যাদি |

এখন আবার উল্টোটা শুনি|  যে, আপনি বৈজ্ঞানিক | আপনারই তো দায়িত্ব সমাজের প্রতিটা মানুষকে আপনি কী গবেষণা করেন তা বোঝানো |  আপনার গবেষণা কীভাবে মানুষকে সাহায্য করছে বা করতে পারে আপনি কেন সবাইকে তা বোঝাবেন না ?   বৈজ্ঞানিকরা কেন সাধারণ মানুষের থেকে নিজেদের আলাদা রাখবেন?

ঠিকই তো|  আজ তো আর রাজা–রাজরা নেই |  আগেকার দিনে তারাই তো বৈজ্ঞানিকদের ভরণপোষণের দায়িত্ব নিতেন |  এখন বৈজ্ঞানিকরা সাধারণ মানুষের পয়সায় নিজেদের সংসার চালায় এবং নিজেদের গবেষণার খরচটুকু জোগাড় করে |  সুতরাং, বিজ্ঞান সম্বন্ধে সাধারণ মানুষকে বোঝানো বৈজ্ঞানিকদেরই দায়িত্ব |  এবং বোঝাতে হবে সাধারণ মানুষের ভাষায়,  বৈজ্ঞানিকদের নিজেদের পরিভাষায় নয়|

বিজ্ঞান আমাদের সংস্কৃতির সর্বশ্রেষ্ঠ অবদান | সুতরাং এটি সম্পর্কে জ্ঞান মানুষের প্রাপ্য। দ্বিতীয়ত, বিজ্ঞান সকলের জীবনকে প্রভাবিত করে, ফলে মানুষকে এটি সম্পর্কে জানতেই হয়। তৃতীয়ত, অনেক জনমুখী প্রকল্পের সিদ্ধান্ত বিজ্ঞান-এর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এবং যদি সেগুলি বিজ্ঞান-সচেতন জনসাধারণের বিতর্ক থেকে তৈরি হয় তবেই তারা প্রকৃত গণতান্ত্রিক প্রকল্প বা নীতি হয়ে উঠতে পারে| চতুর্থত,  বিজ্ঞান সার্বজনীনভাবে সমর্থিত,  এবং সাধারণ মানুষের থেকে সমর্থন আশা করার জন্য তাদের বিজ্ঞান-সচেতন করে তোলা বৈজ্ঞানিকদেরই দায়িত্ব।

সমাজকে বিজ্ঞান-মনস্ক এবং বিজ্ঞান-সচেতন করে তোলার দায়িত্ব যদি বৈজ্ঞানিকরা এড়িয়ে চলেন তাহলে তাঁরা নিজেরাই হেরে যাবেন |  জনসাধারণের বিজ্ঞান-সচেতনতা এবং বিজ্ঞান-অজ্ঞতা’র মধ্যে তফাৎ কী? আইজ্যাক অ্যাসিমভ বলেছেন “তফাৎটা হলো- একদিকে সন্মান এবং প্রশংসা এবং অন্যদিকে ঘৃণা এবং ভয় |”  বিজ্ঞানীরা যদি ধরে নেন যে তাঁরা কী করেন সেটা না বুঝেও জনসাধারণ দিনের পর দিন, বছরের পর বছর তাঁদের সমর্থন করে যাবেন,  তাহলে সেটা হবে বৈজ্ঞানিকদের মূর্খামির পরিচয় |

জনগণ যদি বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতা,  ফলাফল এবং পদ্ধতি বুঝতে পারতো তাহলে কি আমাদের সমাজ আরো উন্নত হতো ? আমি মনে করি,  অবশ্যই |  সার্বজনীন বিজ্ঞান-সচেতনতা বাড়লে জাতীয় সমৃদ্ধি অবশ্যই বাড়ে |  সমাজের প্রতিটি মানুষ সমৃদ্ধ হয়  |   প্রতিটি মানুষের মন প্রশস্ত হয়ে ওঠে |   কূপমণ্ডূকতা থেকে তারা বেরিয়ে আসতে পারে |  ভালো-মন্দের বিচারক্ষমতা বাড়ে |  সার্বজনীন বিজ্ঞান-সচেতনতা এবং বিজ্ঞান-মনস্কতা বাড়ানো এক অর্থে ভবিষ্যতের সম্পদবৃদ্ধি করা,  এই  কাজে সময় নিয়োগ করা মোটেই বিলাসিতা নয় |

সরকার এবং সিভিল সার্ভিস অফিসাররা বিজ্ঞান আরও ভালোভাবে বুঝলে জাতীয় বিজ্ঞাননীতি আরো ভালোভাবে প্রণয়ন করা যায়|  মৌলিক,  কৌশলগত এবং প্রয়োগযোগ্য গবেষণার মধ্যে যে আন্তঃসম্পর্ক সেগুলি সরকারের বোঝা দরকার |  এই তিনটি পর্যায়ের অনিশ্চয়তা ও আপেক্ষিক সময়সীমা এবং খরচ,  এগুলিও সরকারের  বোঝা উচিত- অবশ্যই বিজ্ঞানীদের সাথে আলোচনা করে  |  মৌলিক গবেষণার মান উন্নত না হ’লে,  প্রায়োগিক গবেষণা ভালো হতে পারে না |  এজন্য উচ্চশিক্ষা খাতে ব্যয়ের বরাদ্দ বাড়াতে হবে |

সবশেষে এটাই বলতে চাই, বিজ্ঞানীদের সময় নিয়োগ করতে হবে সাধারণ মানুষ এবং সরকার- উভয়কেই বিজ্ঞানের ধারা এবং উপকারিতা বোঝানোর জন্য|  এটা সময়ের অপব্যয় নয়,  নিজেদের ভবিষ্যতের জন্য আমাদের দায়িত্বশীল অবদান|

Add Comments