সত্যমেব জয়তে

-অনির্বাণ কুণ্ডু
অধ্যাপক, পদার্থবিদ্যা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়

শ্রীসত্যপাল সিংহ প্রতিদিনই আমাদের চমৎকৃত ক’রে চলেছেন। ইনি কখনো ডারউইনকে ধ’রে টানাটানি করেন, কখনো বা নিউটনকে। আইনস্টাইনকে বোধহয় বিশেষ বোঝেন না, তাই তিনি এখনো বেঁচে আছেন, তবে শেষের সে দিন মনে হচ্ছে সমাগতপ্রায়। মেঘনাদ সাহা সেই কবে ব’লে গিয়েছিলেন, সকলই ব্যাদে আছে, ইনি আদাজল ছোলাছাতু খেয়ে সে কথা প্রমাণ করতে প্রাণপাত করছেন। তবে এই পুণ্যকর্মে ইনি একা ব্যাপৃত আছেন, একথা ভাবলেও ভুল হবে। ইনি একটি বিশেষ প্রজাতির মুখপাত্র মাত্র।
সিংহমশাই ডারউইন সাহেবকে নস্যাৎ ক’রে ছেড়েছেন, বিবর্তনের তত্ত্ব সম্পূর্ণ ভুল ব’লে বাতিল করে দিয়েছেন। পৃথিবীতে এখনো অনেকেই বিবর্তন বিশ্বাস করেন না। যেমন আমেরিকার এক বিশাল-সংখ্যক খ্রিষ্টান, যাঁদের কাছে বাইবেলই চূড়ান্ত সত্য। এঁরা অশিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিত বলেই গণ্য, যদিও সংখ্যায় নেহাত কম নন। এঁদের পাণ্ডা’ই বর্তমানে শ্বেতপ্রাসাদ অধিকার ক’রে ব’সে আছেন। ভদ্রলোক মুখ খুললেই, কেন জানি না মনে হয়, এনার ক্ষেত্রে বিবর্তনটা পুরো হয়নি, হোমো ইরেক্টাসের স্তরে আটকে গেছেন।
সত্যপালবাবু’কে কিন্তু প্রথাগত অর্থে অশিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিত বলা যায় না। ইনি বিজ্ঞানে এম.এস.সি করেছেন, নামের আগে একটি ডক্টরেটও জুটিয়েছেন, যদিও সেটা অন্য জিনিসে। হিসেবমতো, বিজ্ঞান বস্তুটা খায় না মাথায় দেয়, তা নিয়ে সত্যপালবাবুর কিঞ্চিৎ ধারণা থাকার কথা, যদি না মুম্বাই-এর গুণ্ডারা মাথা থেকে সব বের ক’রে দিয়ে থাকে। ইনি একসময় মুম্বাই পুলিশের বড়কর্তা ছিলেন।
ডারউইনকে নিয়ে সিংহমশাইয়ের আপত্তির প্রধান কারণ হল, তিনি নিজে কখনো বানর থেকে মানুষ হচ্ছে, লেজ খ’সে প’ড়ে যাচ্ছে, এ’রকম দেখেননি। আমাদের মুনিঋষিদের লেখাতেও এ’রকম কিছু পড়েননি, আর তাঁরা জানতেন না- এমন কিছু থাকতেই পারে না। স্বয়ং রাম-সীতার বর পেয়েও হনুমান লেজ খসিয়ে মানুষ হতে পারেননি। যা কেউ কখনো দেখেনি, কোথাকার কে এক ডারউইন সাহেব ব’লে দিলেই সত্যপালবাবুর মতো বিজ্ঞানে ট্রেনিংপ্রাপ্ত এবং সনাতন ভারতীয় ন্যায়শাস্ত্রে দীক্ষিত একজন লোককে তা মেনে নিতে হবে? তা’ও এনার দয়ার শরীর ব’লে ইনি ‘অরিজিন অফ স্পিসিস’-এর সমস্ত কপি পোড়াচ্ছেন না। পাঁচশো বছর আগে জন্মালে ইউরোপে ডারউইন সাহেবকেই যে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারা হত, তার বেলা?
এই চমৎকার যুক্তি দেখে মনে হয়েছিল, সত্যপাল সিংহকে দেশের সমস্ত বিজ্ঞান অ্যাকাডেমির ফেলো ক’রে নেওয়া হোক (তারপর দেখেছি ইনি অ্যাকাডেমির কিছু অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়েছেন), আর আইন সংশোধন ক’রে সাম্মানিক ভাটনগর দেওয়া হোক। কিন্তু ব্যাপারটা ইয়ার্‌কি ফাজলামির সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

Man on truth of numbers win always
নিউটনের কপাল ডারউইনের চেয়ে একটু ভালো, ইনি ভুল নন, কিন্তু যা করেছেন তা নাকি অনেক আগেই এই পুণ্যভূমি জম্বুদ্বীপে মুনিঋষিরা ব’লে গেছেন। দুঃখের বিষয়, সাংখ্য না বৈশেষিক, কোন দর্শনে নিউটনের সূত্র তিনটি লেখা আছে, সেটা কেউ রেফারেন্স দিয়ে বলছেন না। দয়া ক’রে একটু জ্ঞানাঞ্জনের কাঠির খোঁচা দিয়ে অজ্ঞানতিমির দূর করুন। আর সেটা যদি না পারেন, তাহলে লোক-হাসানো বন্ধ করুন। পৃথিবীর কাছে নিজের দেশকে লাফিং-স্টকে পরিণত করবেন না।
পুরো দোষটাই কি সত্যপালবাবুর? সেটা বললে অন্যায় হবে। অবশ্যই নাগপুরের পাঠশালায় এনার মগজধোলাই হয়েছে, কিন্তু প্রথম জীবনে যে বিজ্ঞান শিখেছিলেন সেটাও ডিগ্রি হয়ে থেকে গেছে, মানসিকতায় ঢোকেনি। এইটাই সবচেয়ে বড়ো সমস্যা। আমরা যে বিজ্ঞান চর্চা করি, তার পুরোটাই পশ্চিম থেকে এনে বসানো। অনেকটা এক দেশের গাছকে শিকড়সুদ্ধু তুলে নিয়ে অন্য বিজাতীয় দেশে বসালে যা হয় আর কি। বিজ্ঞান আমাদের ডিগ্রি আর চাকরি পেতে কাজে লাগে, কিন্তু জীবনের অঙ্গ হয়ে ওঠে না। তার ফলে, আমরা বড়ো বড়ো ফরমুলা মুখস্থ করতে পারি, কিন্তু যুক্তি দিয়ে ভাবতে শিখি না। এই পরিবেশেও যে কিছু বিশ্বমানের বিজ্ঞানী এ’দেশ থেকে বেরিয়েছেন, সেটাই আশ্চর্যের।
কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান পশ্চিমের অবদান বললে দেশের গৌরব থাকে কোথায়? অতীতে আমাদের সব ছিল, মুসলমান আর ইংরেজ মিলে ধ্বংস করেছে, এটা অনেকদিন ধরেই কিছু হিন্দুর আফসোস, সম্প্রতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে এই যা। রবীন্দ্রনাথের ব্যঙ্গকৌতুক স্মরণ করুন – এক হিন্দু দুঃখ করছে, মুসলমান আক্রমণের ফলে প্রাচীন ভারতের ঋষিরা যে অক্সিজেন গ্যাস ও গ্যালভানিক ব্যাটারি আবিষ্কার করেছিলেন, সে তথ্য সম্পূর্ণ লোপ পেয়েছে। অথচ প্রাচীনকালেও ভারতের চেয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে চীন অনেক এগিয়ে ছিল। গ্রিস বা মধ্যপ্রাচ্যের কথা ছেড়েই দিলাম।
এটা পরাজিত জাতির দুর্ভাগ্য। বর্তমানে কিছু না থাকলে অতীতের গৌরব নিয়ে বাঁচতে হয়। সেখানেও কোনো প্রমাণ না থাকলে, কবির কল্পনাকে বাস্তব ব’লে চালাতে হয়, যেমন – পুষ্পকরথ। অথচ প্রাচীন ভারতেও অঙ্ক,জ্যোতির্বিদ্যা, রসায়ন আর চিকিৎসাশাস্ত্রে উল্লেখযোগ্য গবেষণা হয়েছিল, তার কথা আমরা অনেকেই জানি না। জানার চেষ্টাও করি না। ফলে রামায়ণ-মহাভারত-পুরাণকে বিজ্ঞান ব’লে চালিয়ে দেবার অপপ্রয়াস চলতেই থাকে, নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্যে নিউটন বা ডারউইনকে ধ’রে টানাটানি করতে হয়, শূন্যে ভেসে থাকতে পারে এমন বিমান বা ময়ূরের চোখ থেকে স্পার্ম বেরোয়, এমন তথ্য আবিষ্কার করতে হয়। আর বেদ-পুরাণের উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া (যদিও সে’যুগে ঋষিরা ঘোর মাংসাশী ছিলেন, এমনকি গরুও) হিন্দুধর্মই যে সবার সেরা, এই হেজিমনিও সরকারের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদতে চলতেই থাকে।

যাই হোক, শেষে আরেকবার ডারউইনের কথায় ফিরে আসি। বিবর্তন কেন বিশ্বাস করেন না সত্যপালবাবু? নিজের চোখে দেখেননি ব’লে তো? আপনার তো কেমিস্ট্রিতে ডিগ্রি, থার্মোডায়নামিক্স ব’লে একটা জিনিস পড়তে হয়েছিল নিশ্চয়ই, কোয়াসিস্ট্যাটিক প্রসেস কাকে বলে জানেন? কাজের চাপে হয়তো ভুলে গেছেন, তাই আর এসব ব’লে বিব্রত করবো না। আপনার বয়েস কয়েক কোটি বছর হলে বিবর্তনের অনেকগুলো ধাপই আপনি চোখের সামনে দেখতে পেতেন। বিজ্ঞানীরা অনেক প্রমাণ পেয়েছেন, তাঁদের নস্যাৎ করার আগে সেগুলো সম্বন্ধে একটু জানলে ভালো হয়, নইলে লোকে মূর্খ বলে।

আরেকটি সামান্য কথা, সত্যপালবাবু। আরেকরকম বিবর্তন তো চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি, আপনারাই ঘটাচ্ছেন। মানুষ কোত্থেকে এসেছে জানেন তো? কিলার এপ বা খুনে বাঁদর থেকে। তিরিশ বছর আগেও আমরা অনেক বেশি উদার ধর্মনিরপেক্ষ আর সহিষ্ণু ছিলাম। এই যে এখন, সে সব মুখোশ খ’সে গিয়ে নখ-দাঁত-লেজ-লোম সব বেরিয়ে পড়লো, কে কাকে বিয়ে করছে, কার ফ্রিজে কী মাংস আছে, কে গরু খেতে পারে, তাই নিয়েই আমরা একে অন্যকে পিটিয়ে পুড়িয়ে থেঁতলে মেরে ফেলতে কোনো অস্বস্তি বোধ করছি না, এটা কি উলটো বিবর্তন নয়? ডারউইন কখনো ভাবেননি বিবর্তন মানুষকে আবার বাঁদর ক’রে দিতে পারে, কিন্তু উত্তর ভারতের অসহিষ্ণু অশালীন উদ্ধত অর্ধসভ্য সংস্কৃতির ধাক্কায় সেটাও ঘটছে, এরপরেও আপনি বা আপনার ক্ল্যান বিবর্তনে বিশ্বাস করবেন না?
আপনি মানবসম্পদ উন্নয়ন দপ্তরের মন্ত্রী, এতে একজন শিক্ষক হিসেবে মাথাটা কতো নিচু হয়, তা আপনাকে কী’করে বোঝাই। পারলে আপনি একবার বাংলা শিখে রবি ঠাকুরের ‘কড়ি ও কোমল’-এ দুই হিন্দুপুঙ্গব দামু বোস আর চামু বোসের কীর্তিকলাপ পড়ে নিন। শেষ লাইনদুটো আপনার জন্যেই তুলে দিই।
‘পয়সা চাও তো পয়সা দেবো, থাকো সাধুপথে।
তাবচ্চ শোভতে কেউ কেউ, যাবৎ ন ভাষতে।’

Add Comments