সোফোক্লেস থেকে ব্রেশট ও আরো কিছু

-দেবশঙ্কর হালদার
অভিনেতা

শুধু একুশ শতকের একজন ব’লেই না, জন্মমুহূর্ত থেকেই কি আমরা কোনো না কোনো ভাবে বিজ্ঞানের কাছে ঋণী নই? আজকের দিনে বেশিরভাগ শিশুই জন্মায় সিজারিয়ান পদ্ধতিতে- তাও বিজ্ঞানের এক অসামান্য অবদান। যদিও, ব্যক্তিগতভাবে আমার বেলায় তা হয়নি- আমি স্বাভাবিক ভাবেই জন্মেছিলাম- হয়তো জন্মমুহূর্ত থেকেই প্রকৃতির সাথে বোঝাপড়া তৈরী হতে শুরু করেছিল আমার। তবুও একটা প্রশ্ন জাগে মনে- এই যে সিজারিয়ান তথা কৃত্রিম পদ্ধতি- এ কি বহন করে না প্রকৃতির বিরুদ্ধে যাওয়ার ইঙ্গিত? মানবসভ্যতা কি তার বিকাশের স্তরগুলিতে এভাবেই একটু একটু ক’রে সরে আসেনি প্রকৃতি থেকে- ফিরিয়ে নেয়নি কি মুখ? শিশুর কৃত্রিম পদ্ধতিতে জন্ম- এর মধ্যে দিয়ে কি তবে আমরা খুঁজে পাব কোনো রূপক?

মনে পড়ছে আড়াই হাজার বছর আগে লেখা একটি নাটকের কথা। হ্যাঁ, সোফোক্লেস-এর অয়দিপাউসের কথাই বলছি। বিশ্বখ্যাত এই নাটকের গল্প সকলেরই জানা। দৈববাণীতে বলা হয়েছিল- পিতাকে হত্যা করে অয়দিপাউস মাতাকে বিবাহ করবেন- যে আশঙ্কায় রাজ্য ছেড়ে অনেক দূরে চলে গেছিলেন অয়দিপাউস। তবু নিয়তিকে এড়াতে পারেননি- নিয়মবিরুদ্ধ কাজ করার শাস্তি হিসেবে তিনি নিজেই নিজের চোখ দুটি অন্ধ করে দেন। এই গল্পের মধ্যে কি আমরা পাই না এক আশ্চর্য ইঙ্গিত? -আচ্ছা, বিজ্ঞানও কি এক অর্থে নিয়মের বিরোধিতাই করে না? তার জন্যে প্রদত্ত শাস্তি- সে কি নিজেই নিজের জন্য ডেকে আনে না?

আসুন, আরো একটু সংকুচিত করে আনি আলোচনাটাকে। থিয়েটার আর বিজ্ঞান- কীভাবে মিলতে পারে এরা? আছে কি থিয়েটারের জন্মমুহূর্ত থেকেই- বিজ্ঞানের কাছে- কোনো ঋণ? নাকি, থিয়েটারেরও আছে কোনো বিজ্ঞান- যা জানতেই হয় থিয়েটার-করা মানুষদের? উত্তরটা আশ্চর্য হওয়ার মতোই। হ্যাঁ, আছে। সেই প্রাচীন অ্যাম্ফিথিয়েটারের সময় থেকেই বিজ্ঞানের কাছে হাত পেতেছিল থিয়েটার। মঞ্চসজ্জা, গ্যালারির আকার, শব্দব্যবহার, আলো- প্রতিটি বিষয়ই শিল্পীরা জেনেছিলেন বিজ্ঞানের সাহায্যে। আসলে বিজ্ঞান থিয়েটার-শিল্পীদের চিনিয়ে দেয় তাঁদের সীমাবদ্ধতাগুলি- এক অর্থে হাত পা বেঁধে দেয়- ফলে তাঁরা শ্রেষ্ঠ উপায়ে নিজেদের প্রকাশ করতে পারেন। তবে বহিরঙ্গই শুধু নয়- অন্তরঙ্গের ক্ষেত্রেও আছে বিজ্ঞানের ব্যাপক ভূমিকা। কেন, অভিনয়? থিয়েটারে অভিনয়ের একটি প্রধান ও প্রথম শর্তই তো মন ও মনন – তথা আবেগ ও যুক্তিকে বিচ্ছিন্ন করা। স্তানিশ্লাভস্কি তো লিখেই ফেলেছিলেন থিয়েটারের একটি বিজ্ঞানতত্ত্ব। পরে আবার ব্রেশট এর বিরোধিতা করবেন- আসবে এপিক থিয়েটারের ধারণা। কীভাবে? আমরা বরং একটু বিস্তৃত হই।

জীবনে যখন একটি ঘটনা ঘটে তখন সেটি সত্য- থিয়েটারে ঘটলে তা অবশ্যই মিথ্যে। স্তানিশ্লাভস্কি একটু এগিয়ে এসে বলছেনঃ মস্তিষ্ক বা স্মৃতি একটি আধার- যা সবকিছু ধরে রাখতে পারে। আবেগমূলক স্মৃতি বা ইমোশনাল মেমরি- অভিনয়ের সময়ে তার কাছে যাও।

বেরটোল্ট ব্রেশট

যেমন, দুঃখের দৃশ্যে অভিনয় করতে হলে অভিনেতাকে যেতে হবে প্রিয়জনকে হারানোর যে স্মৃতি- তার কাছে। পাশাপাশি নিজেকে সহজও থাকতে হবে- কাজ করাতে হবে যুক্তিবুদ্ধিকে- যাতে ঠিক অভিনয়টা ঠিক সময়ে বেরিয়ে আসতে পারে। ব্রেশট পরে এরই বিরোধিতা ক’রে বলবেন অ্যালিয়েনেশন তত্ত্বের কথা, যেখানে অভিনেতা বাস্তবেরই অনুকরণ না ক’রে নিজের অভিনয়কে একটু অপরিচিত করে তুলবেন- যাতে করে দর্শক বাস্তবের আরো নিকটে আসতে পারে। কী আশ্চর্য, ব্রেশটের বিখ্যাত নাটক- গালিলিও- তাও তো বিজ্ঞান সম্পর্কিত! চার্চের কাছে নতিস্বীকার করেন যে গালিলিও- তিনিই আবার শিষ্যকে দিয়ে যান বিজ্ঞানের নথি। এই দ্বন্দ্ব অসামান্যভাবে এসেছিল ব্রেশটের নাটকে। পরে এই ব্রেশটই লিখবেন ‘মাদার কারেজ’ নাটক- যেখানে তিনি আবারও উত্থাপন করবেন আদর্শের কথা- এ কথা জানিয়েই করবেন, সবার আগে বেঁচে থাকাটা জরুরি। পরবর্তী কালে নানাভাবে বিজ্ঞান বিষয়ে নাটক হয়েছে- কখনো বিজ্ঞানের ত্রুটিগুলো তুলে ধরে- আবার কখনো বিজ্ঞানের অগ্রগতিকে সমর্থন জানিয়ে। বলছি সে কথা।

ডারউইনের বিবর্তনবাদকে ব্যবহার করে লেখা হয়েছিল নাটক- পরে সেখান থেকে ‘ইনহেরিট দ্য উইন্ড’ নামে তৈরী হয়েছে সিনেমাও। ডারউইনের তত্ত্ব বলেছে মানুষ ঈশ্বরের সৃষ্টি নয়- সে একটি প্রাকৃতিক ঘটনার ফলে পৃথিবীতে এসেছে। এই তত্ত্বকে মেনে নিতে এখনও বহুজনের আপত্তি। এই নিয়ে তর্ক চলেছে আলোচ্য নাটকে। আবার, বিজ্ঞানী ম্যাক্সওয়েলের তড়িৎচৌম্বকত্ব নিয়ে যে সমীকরণ- তার ওপর ভিত্তি করেও লেখা হয়েছে ‘ম্যাক্সওয়েল ইকোয়েশনস’ নামে নাটক। লেখকের নাম আনাতোলি দানোপ্রভ। বিজ্ঞান শুধু সাধারণের মঙ্গলের জন্যেই না- স্বৈরাচারী শক্তির হাতে পড়ে কীভাবে অমঙ্গল হিসেবে কাজ করতে পারে- তারই ছবি এসেছে এই নাটকে। আমরা এটি বুঝতে একটু উদ্ধৃতির সাহায্য নেবঃ

‘-আপনি স্মৃতি বিষয়টাকে কীভাবে দেখেন?
‘-ধরুন আমরা যাকে স্মৃতি বলি তা তো স্নায়ুর উদ্দীপনা। ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ড-এর সাহায্যে স্মৃতিকে অকেজো করে ফেলা যায়। ফলে সহজেই আমরা আপনার জানা বিষয়গুলি ভুলিয়ে দিতে পারি। কিংবা আপনি যা জানতেন না সেগুলোও আমরা আপনার মাথায় ঢুকিয়ে দিতে পারি।’

নাটকটি ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে একটি উল্লেখযোগ্য প্রতিবাদ।

শিল্পের সাথে এভাবে বারবারই সাক্ষাৎ হয়েছে বিজ্ঞানের। সবসময় যে সাক্ষাৎটা খুব মধুর হয়েছে তাও না। দেবব্রত বিশ্বাসের কথাই ধরা যাক না। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগঃ তিনি বাঁধাধরা পথে রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিবেশন করেননি। এই অভিযোগের মধ্যেও কি বিজ্ঞান নির্ধারিত সেন্সরশিপেরই একটি রূপক আমরা দেখতে পাই না? দেবব্রত বিদেশি বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করেছিলেন- ফলে শান্তিনিকেতনপন্থীরা রেগে উঠেছিলেন তাঁর ওপর। বিপরীতে এই যুক্তিও উঠেছিলঃ শল্যচিকিৎসাও তো একই রকম ভাবে বিদেশি চিকিৎসা পদ্ধতি, তা বলে আমরা কি এটিকেও গ্রহণ করব না? (‘ব্রাত্যজনের রুদ্ধসংগীত’ নামে একটি নাটকও প্রযোজিত হয়েছে এই ঘটনাকে কেন্দ্রে রেখে।) এখান থেকে আমরা একটা সিদ্ধান্তে আসতেই পারি- প্রাথমিকভাবে শিল্প বিজ্ঞানকে ব্যবহার করতে পারে মই হিসেবে- তারপর সেই উচ্চতা থেকে শিল্পী একটা লাফ দিতে পারে- যা কিনা যুক্তিহীন একটি লাফ। বিজ্ঞান এই স্তরে শিল্পকে কোনো সাহায্যই আর প্রত্যক্ষ ভাবে করতে পারে না।

তবে বিজ্ঞানের কোন দিকটাকে আমরা কাম্য বলে জানব? কোন প্রণালীটি তবে হয়ে উঠবে আমাদের যাপনের সঙ্গী? -অবশ্যই এর নমনীয়তা। বিজ্ঞানই একমাত্র ক্ষেত্র, যা বলে- প্রতিমুহূর্তে তোমার জানার কিছু আছে এবং পরিবর্তন বলেও সাথে সাথে একটা জিনিস আছে যা তোমার আগের-জানাটাকে নস্যাৎ করে দিতে পারে। এভাবেই নিজেকে ভাঙতে ভাঙতে বিজ্ঞান এগিয়ে চলে।

আমি জানি না শেষ উত্তর কী হতে পারে। বিজ্ঞান শেষ সত্য একথা বলার মতো প্রত্যয় কি আমরা আর পাই? যে দেশে অধিকাংশ সাধারণ মানুষ বিজ্ঞান জানে না, জানার সুযোগ পায় না- বিজ্ঞানের প্রতি তাদের মনে কী জন্মাবে- অশ্রদ্ধা ছাড়া? যারা বলে, ‘আমরা বিজ্ঞানের চূড়ান্ত আরাম ক্রেতাদের দিতে চাই’- আজকের এই বিশ্বায়িত যুগে দাঁড়িয়ে তারাও কি মুনাফা তোলার কারবারই করে না? রাষ্ট্রনায়কদের হাতে একজন বিজ্ঞানী কী অসম্ভব অসহায়- তা তো বিগত দুটো বিশ্বযুদ্ধ আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে! বিজ্ঞান- একুশ শতকে সবচেয়ে বেশি ক’রে আমাদের যা দিয়েছে তার মধ্যে অন্যতম নিঃসন্দেহে দ্রুতি- এবং তার সাথেই এসেছে ‘দ্রুতি’র অহংকার। যে কাজ আমি এক ঘণ্টায় করতাম তা এখন করতে পারি এক মিনিটে- নিশ্চিত, এ বিজ্ঞানেরই অবদান। কিন্তু এই উনষাট মিনিট বাঁচিয়েই বা কী পেলাম আমি? সত্যি, এই মহাসময়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে এই সামান্য হিসেব করতে বসলে কী অসহায় লাগে আমাদের! বিজ্ঞান আমাদের এনে দিয়েছে যুক্তির বোধ- পাশাপাশি এনেছে বোধের ক্ষয়- ভেঙে দিয়েছে সরলতা, নষ্ট করেছে বিশ্বাসের জায়গাগুলি। কিন্তু কী করা যাবে- সভ্যতা তো এভাবেই এগোবে। জ্ঞান আমাদের মধ্যে এনেছে অসুখ- তবু সেই ভয়ে কি থেমে যেতে পারি আমরা? তাও না। তবে উপায় কী? কোন পথে?

না, আমি অবশ্যই পশ্চাদপসারণ করতে বলছি না। বিজ্ঞানমনস্কতা দরকার; কুসংস্কারের বিরুদ্ধে- অশিক্ষার বিরুদ্ধে- অ-সভ্যতার বিরুদ্ধে বিজ্ঞানই পথ, বিজ্ঞানই উপায়। কিন্তু যেভাবে তার প্রসারণ হওয়া উচিত ছিল সেভাবে হয়নি- মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের কাছে তা বন্দি হয়ে আছে। এজন্যে দরকার শিক্ষার বিকাশ- এবং জনকল্যাণমূলক নীতি। সেজন্যে আমাদের বুনিয়াদী স্তর থেকেই শুরু করতে হবে। এত যুক্তি ও প্রতিযুক্তির মাঝে, এও তো সত্যঃ বিজ্ঞানই আমাদের শিখিয়েছে, পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো সত্য যেমন মৃত্যু- তেমনই, একইসাথে, পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো সত্য পরিবর্তন।

অনুলিখনঃ আদিদেব মুখোপাধ্যায়

Add Comments