সাপ-অদ্ভুত সমাহার

- সৈকত সরকার
অধ্যাপক, প্রাণীবিদ্যা ঝাড়গ্রাম রাজ কলেজ

সাপ হল সরীসৃপদের মধ্যে এক ধাঁধা লাগানো শ্রেণি যাদের মধ্যে ৩৫০৯টি জীবিত ও ২৭৪টি লুপ্ত প্রজাতি আছে, যাদের আবার ৫৩৯টি জীবিত ও ১২টিকে লুপ্ত গণ-এ ভাগ করা যায়। (ভ্যান ওয়ালচ, কেনেথ এল. উইলিয়ামস, জেফ বাউন্ডি, ২০১৪)। গিরগিটিদের মতো আন্টার্কটিকা বাদে এদেরও উপস্থিতি আর সব মহাদেশে। এদের গিরগিটিদের থেকেও বেশি কার্যকরী সামুদ্রিক বিকিরণ ছিল, যদিও তা সেসব গিরগিটিদের থেকে কম শক্তিশালী যারা পৃথিবীর সামুদ্রিক দ্বীপগুলির কাছে ছড়িয়ে আছে। এদের সবার শরীরের গঠন লম্বাটে বা সম্প্রসারিত, “অঙ্গহীন”, কিন্তু এই শারীরিক গঠন অন্যান্য আঁশযুক্ত গিরগিটিদের মধ্যেও পাওয়া যায় (যেমন, পাইগোপোডিডে, ডাইপ্লোগ্লোসিডে, অ্যাঙ্গুইডে, ও করডাইলিডে)। যদিও সাপেরা শুধু ‘নলের মধ্যে নল’ বিশিষ্ট প্রাণী নয় বরং এদের আকৃতি, আকার ও গঠনবিন্যাসে বৈচিত্র দেখা যায়। অঙ্গসংস্থানের এই বৈচিত্র এদের আচরণ, বাস্তুসংস্থান এবং শারীরিক অভিযোজনে বিভিন্নতার মধ্যে দিয়ে প্রকাশ পায়। সব রকম সাপের প্রজাতি মাংসাশী হিসাবে নানা রকমের প্রজাতির শিকার ধরে খায়, কিন্তু বিভিন্ন প্রজাতির খাদ্যতালিকা বিশেষরূপে নির্দিষ্ট।
এদের শরীর এপিডার্মাল (বহিশ্চর্মাগত) আঁশে ঢাকা, যাদের সংখ্যা, আকার, আকৃতি এবং বিন্যাস বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রজাতি অনুযায়ী পৃথক। বেশিরভাগ সাপেদের অঙ্কদেশে (নীচের দিকে) বড়ো আকারের আড়াআড়িভাবে বিন্যস্ত আয়তক্ষেত্রাকার আঁশ-এর ক্রমান্বয়ে বিন্যাস দেখা যায়, যা গলা থেকে লেজ অবধি বিস্তৃত। অনেক সাপেদের ক্ষেত্রে বৃহৎ অঙ্কদেশীয় আঁশের সংখ্যা ভার্টিব্রা-এর সংখ্যার সমান।
হাত-পা ছাড়া সাপেরা শিকার ধরা, পরিচালনা করা ও খাওয়ার জন্যে শুধুমাত্র নিজেদের দেহ ও মুখ ব্যবহার করে। কিছু জন কেবল মুখ দিয়ে শিকার ধরে আর গিলে ফেলে, কিছু তাদের শিকারকে শরীর ও মুখের অংশ দিয়ে ধরে রাখে, কিছু তাদের শিকারকে চেপে ধরে আবার কিছুরা কড়া বিষ শিকারের শরীরে ঢেলে দিয়ে তাদের অসাড় করে দেয় বা মেরে ফেলে। করোটির গঠনের মূল পরিবর্তিত আকার শিকার আয়ত্তে আনতে ও গিলতে সাহায্য করে। এই রকম পরিবর্তনের কিছু কিছু বিশেষ সাপেদের ক্ষেত্রে বিশেষ হয়, যেমন (১) ফোরামেন ম্যাগনামের কিনারা থেকে এক্সঅক্সিপিটাল দ্বারা সুপ্রাঅক্সিপিটাল-এর বর্জন এবং (২) ডেন্টারিস-এর মাঝে একটা পরিবর্তনশীল লিগামেন্টাস সিমফাইসিস। অন্যান্য অনন্য বৈশিষ্ট্যেগুলিতে খাদ্যগ্রহণের সঙ্গে বিশেষ কোনো যোগ খুঁজে পাওয়া যায় না,

চিত্রঃ অ্যাট্রাক্‌টাস পায়রনি

যেমন, (১) চোখে সিলিয়ারি-বডি পেশীর অনুপস্থিতি এবং (২) ট্র্যাকিয়াল ফুসফুসের উপস্থিতি। আমরা সাধারণত যেসব বৈশিষ্ট্য সাপেদের সঙ্গে মেলাই তাদের মধ্যে কিছু অঙ্গ হ্রাস-হওয়া গিরগিটিদের মধ্যে এক বা একাধিক ট্যাক্সা-তেও পাওয়া যায়; এসব বৈশিষ্ট্যের মধ্যে কিছু হল—(১) স্কোয়ামোসাল-এর অনুপস্থিতি, (২) এপিটারিগইড-এর অনুপস্থিতি, (৩) চোখে কোনো স্ক্লেরোটিক অসিকলস-এর অনুপস্থিতি (প্রতিটা চোখ একটা স্বচ্ছ আবরণ দ্বারা ঢাকা থাকে যাকে একটা স্পেকটাকল বলে) এবং (৪) টিম্পানাম ও ইউস্টাশিয়ান নলের অনুপস্থিতি, (৫) বাম ফুসফস অনুপস্থিত বা ভীষণভাবে হ্রাসপ্রাপ্ত এবং ডান ফুসফুস প্রমুখ।
সংরক্ষণ পরিস্থিতি:
আই ইউ সি এন (IUCN)-এর বিপন্ন প্রজাতির লাল তালিকা-য় ৮৭৯টি সাপের প্রজাতি আছে যাদের ১১টি বিপজ্জনকভাবে বিপন্ন, ৪৫টিকে বিপন্ন এবং ৪২টিকে অসুরক্ষিত ধরা হয়। সাম্প্রতিককালে দু-টি অবলুপ্ত হয়েছে। ক্রমান্বয়ে সবথেকে বেশি আশঙ্কার কারণগুলি হল, (১) কৃষি এবং জলজ জীবন, (২) বায়োলজিকাল উৎসের ব্যবহার, (৩) বাসস্থান ও বাণিজ্যিক নির্মাণ এবং (৪) প্রাকৃতিক অবস্থার পরিবর্তন।
বর্তমানে আনুমানিক ৩৫০৯ সাপের প্রজাতিকে ২৩টি বর্গে ভাগ করা হয়েছে। ভারত ১৪টি বর্গের সাপের উপস্থিতির আওতায় পড়ে। সাপের এই বর্গগুলি হল—(১) জেনোপেল্টিডে (মালাগাসি অন্ধ সাপ), (২) টাইফ্লোপিডে (বহুজাতিক অন্ধ সাপ), (৩) জেরহোপিলিডে (অন্ধ সাপ), (৪) লেপ্টোটাইফ্লোপিডে (লিকলিকে অন্ধ সাপ, সুতো সাপ?), (৫) অ্যানোমালেপিডিডে (ভোরের অন্ধ সাপ?), (৬)অ্যানিলিডে (ভুয়ো প্রবাল সাপ, দক্ষিণ আমেরিকার নল সাপ), (৭) ট্রপিডোফিডে (খর্ব বোড়াসাপ), (৮) লক্সোসিমিডে (মেসোমেরিকান ময়াল), (৯) পাইথোনিডে (ময়াল), (১০) জেনোপেল্টিডে (সূর্যমুখী সাপ), (১১) ইউরোপেল্টিডে (ঢাল-লেজ সাপ, নল সাপ এবং খর্ব নল সাপ), (১২) বইডে (ময়াল), (১৩) কালাবারিডে (কালাবার মেঠো/ভূমি বোড়া?), (১৪) বলিয়েরিডে (ভাঙা-চোয়াল বোড়া), (১৫) জেনোফিডে (মেরুদণ্ড চোয়াল সাপ), (১৬) অ্যাক্রোকোরডিডে (ওয়ার্ট সাপ বা ফাইল সাপ), (১৭) জেনোডারমাটিডে (চলতি নাম?), (১৮) প্যারিয়াটিডে (শামুক খেকো), (১৯) ভাইপারিডে (বিষথলিহীন ও বিষথলিওয়ালা বিষধর সাপ), (২০) হোমালোপসিডে (চলতি নাম?), (২১) ল্যামপ্রোফিডে (স্টিলেটো, ইঁদুর খেকো বিষধর ও ছককাটা সাপ), (২২) ইলাপিডে (গোখরো, কারেত, সামুদ্রিক সা ও অ্যালিস), (২৩) কলুব্রিডে (সাধারণ সাপ)। এই ৩৫০৯ প্রজাতির মধ্যে ভারতে তার সীমানার মধ্যে ২৭০টি প্রজাতি আছে।
সাপেদের খুঁটিনাটি
১. পৃথিবীর বৃহত্তম সাপ হল দক্ষিণ আমেরিকার সবুজ অ্যানাকোন্ডা (ইউনেক্টেস মিউরিনাস)। এটা ৯ মিটারের বেশি (২৯ ফুট ৬ ইঞ্চি) লম্বা হতে পারে এবং প্রায় এক টনের এক চতুর্থাংশ এর ওজন হতে পারে। দক্ষিণ-পূর্ব আমেরিকার রেটিকুলেটেড পাইথন (পাইথন রেটিকুলাটাস) আরও একটু বড়ো হয়, ১০ মিটার মতো (৩২ ফুট ১০ ইঞ্চি), কিন্তু তত মোটা নয় এবং ওজনও বেশ কম হয়।
২. পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম সাপ হল বারবাডোস (ক্যারিবিয়ান দ্বীপ)-এ প্রাপ্ত বারবাডোস সুতো সাপ (লেপ্টোটাইফ্লপস কারলে); স্নাউট-ভেন্ট দৈর্ঘ্য (SVL) সর্বাধিক ১০৪ মিমি।
৩. পৃথিবীর সর্বাধিক বিষধর সাপ হল শঙ্খচূড় (অফিওফ্যাগাশানাহ)। এই সাপের আরেকটা পরিচিতি হল যে এরা এদের ডিমের জন্যে বাসা বানায়।
৪. অস্ট্রেলিয়াতে পৃথিবীর সর্বাধিক বিষধর সাপেদের দশটি পাওয়া যায়। সবার মধ্যে সর্বাধিক বিষধর হল ফিয়ার্স সাপ বা আভ্যন্তরীণ টাইপান (অক্সিরেনাস মাইক্রোলেপিডোটাস)। এর বিষ ভারতীয় গোখরো (নাজা নাজা), যা প্রাণঘাতী বিষধর, তার থেকেও ৫০ গুণ বেশি শক্তিশালী।
৫. ইলাপিড হয়েও নীল প্রবাল সাপ (ক্যালিওফিসবিভিরগ্যাটাস), যার কোনো নিউরোটক্সিন দেখা যায় না, উলটে কার্যকরী সাইটোটক্সিন তৈরি করে।
৬. ট্র্যানস্ক্রিপ্টোমিক সমীক্ষায় দুই ধরণের বিষধর সাপ—বুশমাস্টার (ল্যাচেসিসমুটা) এবং মরুভূমির মাসাসগা ঠকঠকি সাপ (সিস্ট্রুরাস ক্যাটেনাস এডওয়ার্ডসি)-এ তিন-আঙুল-বিষ (ইলাপিড-দের পরিচায়ক বিষ) পাওয়া গেছে।
৭. অস্ট্রেলিয়াই একমাত্র মহাদেশ যেখানে বিষহীনদের থেকে বিষধর সাপ বেশি।
৮. সাধারণ ইউরোপিয়ান অ্যাডার (ভিপারাবেরাস) একমাত্র সাপ যাদের আর্কটিক অঞ্চলে পাওয়া যায়।
৯. পৃথিবীর যেকোনো দেশের থেকে ভারতে সাপের কামড়ে মৃত্যুর সংখ্যা সবথেকে বেশি, প্রতি বছর ৩৫০০০-৫০০০০-এর কাছাকাছি।
১০. ভারত ASV বা অ্যান্টি স্নেক ভেনম উৎপাদনে পৃথিবীতে প্রথম স্থান অধিকার করে। এই দেশে দশ লাখেরও বেশি ভায়াল ASV এক বছরে তৈরি হয়।
১১. দক্ষিণ জাপানের রাইউকুয়োচেইন-এর কিছু বিশেষ দ্বীপে পৃথিবীর অন্যান্য জায়গার থেকে বেশি সংখ্যায় মানুষ সাপের কামড়ে আক্রান্ত হয়। এই দ্বীপগুলিতে গড়ে প্রতি বছর ৫০০ জনের মধ্যে একজন সাপের কামড় খায়। এই দ্বীপে যাঁরা বসবাস করেন তাঁরা জীবনে সাত বার সাপ দ্বারা আক্রান্ত হলে তার মধ্যে অন্তত একবার সাপের কামড় খেয়েছেন।
১২. আফ্রিকার কালো মম্বা (ডেনড্রোয়াসপিস পলিলেপিস) পৃথিবীর দ্রুততম সাপ। এই প্রাণঘাতী বিষাক্ত সাপের ১৯ কিমি প্রতি ঘন্টা (১২ মেইল প্রতি ঘন্টা) গতিতে, ছোটো ছোটো লাফ দিয়ে চলার রেকর্ড আছে, যা একজন মানুষের হাঁটার গতির তিন গুন। আমাদের জানা পৃথিবীর সবচেয়ে ভীতু প্রকৃতির সাপেদের মধ্যে এরা অন্যতম, কারণ এরা এদের শিকারকে একাধিকবার কামড়ায় বা অনেক শিকারকে একসঙ্গে আক্রমণ করে।
১৩. আফ্রিকার বিষুবাঞ্চলের গাবুন ভাইপার (বিটিসগাবোনিকা) পৃথিবীর অন্য যেকোনো সাপের থেকে বেশি বিষ উৎপাদন করে। পৃথিবীর দ্বিতীয় সর্বাধিক বিষাক্ত সাপ, এটি প্রতি কামড়ে গড়ে ৪৭৫ মি. গ্রা. বিষ ঢালে। গাবুন ভাইপার-এর যেকোনো সাপের থেকে বেশি লম্বা বিষদাঁত আছে, যা গোড়া থেকে আগা অবধি ৫ সেমি (২ ইঞ্চি) ভেদ করতে পারে।
১৪. ময়াল, বোড়া ও পিট ভাইপার (ঠকঠকি শুদ্ধু), সবার বিষ অঙ্গ আছে যা অন্যান্য পশুদের থেকে নির্গত তাপ নির্ণয় করতে পারে। বিষ অঙ্গ এইসব সাপদের শিকারের তাপ প্রান্তরেখা সাফল্যের সঙ্গে দেখতে সাহায্য করে যাতে এরা রাতে নিজেরা অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়েও শিকার ধরতে পারে।
১৫. একটি ঠকঠকি সাপের ঝুমঝুমি তৈরি হয় আলগাভাবে পস্পর আবদ্ধ কুঠরির সারি দিয়ে। এটি নাড়া খেলে বিশেষ সতর্কীকরণ আওয়াজ তৈরি করতে কুঠরিগুলি কাঁপতে থাকে। একমাত্র ঝুমঝুমির নীচের কুঠরিটি লেজের সঙ্গে শক্তভাবে আটকে থাকে।
১৬. কিছু অন্য সরীসৃপদের তুলনায় সাপেরা ক্ষণজন্মা। রেকর্ড অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি বয়সের সাপ হল ফিলাডেলফিয়া চিড়িয়াখানায় আটক একটা পপাই নামের বোয়া কনস্ট্রিক্টর (বোয়া কনস্ট্রিক্টর), যে ৪০ বছর ৩ মাস এবং ১৪ দিন বয়সে মারা যায়। এর উলটো দিকে টঙ্গা-এর রাজাকে ক্যাপটেন জেমস কুক যে মাদাগাস্কান রেডিয়েটেড কচ্ছপ, তু’ইমালিলা, উপহার দিয়েছিলেন, সে ১৮৮ বছর বয়স অবধি বেঁচে শেষে ১৯৬৫-তে মারা যায়।
১৭. সাপেরা জীবনযুদ্ধে অবিশ্বাস্য লড়াকু এবং খাবার ছাড়া দীর্ঘ সময় পার করতে পারে। বেশিরভাগই স্বাভাবিকভাবে কিছু সপ্তাহ অন্তর খাদ্য গ্রহণ করে কিন্তু প্রয়োজনে একবারে মাসের পর মাস এরা উপবাসে কাটাতে পারে। সাপেদের মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘ উপবাস, যা নথিবদ্ধ আছে তা ছিল তিন বছর ও তিন মাস, যা সম্পন্ন করেছিল একটি অকিনাওয়া হাবু (ট্রিমেরেসরাস ফ্ল্যাভোভাইরিডিস), এক প্রকারের এশিয়ান থলিযুক্ত বিষধর। উপবাসটি জাপানে সংগঠিত বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার জন্যে করানো হয়েছিল। পরীক্ষার শেষে সাপটির দেহের ওজনের ৬০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছিল, কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে বাস্তবে এর দৈর্ঘ্য বেড়েছিল। যখন মাপজোক শেষ হয় একে খাওয়ানো হয় এবং ধীরে ধীরে পূর্ণ স্বাস্থ্য ফেরত পায়।
১৮. সামুদ্রিক সাপেরা প্রয়োজনে জলের তলায় এক নিশ্বাসে তিন ঘন্টার বেশি থাকতে পারে।
১৯. বিজ্ঞানের মতে ব্রাহমিনি ওয়ার্ম সাপ (র‍্যামফোটাইফ্লপস ব্রামিনাস) একমাত্র সাপ প্রজাতি যারা অঙ্গজ জননের মাধ্যমে (শুধুমাত্র স্ত্রী) বংশবিস্তার করে।
২০. লেপ্টোটাইফ্লপিড-রা সাপেদের একমাত্র বর্গ যাদের শুধু নীচের চোয়ালে দাঁত আছে বলে জানা যায়।
২১. টাইফ্লোপিড-রা সাপেদের একমাত্র বর্গ যাদের শুধু উপরের চোয়ালে দাঁত আছে।
২২. কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া ক্রোটালাইনরা (থলিযুক্ত বিষধররা) ওভোভিভিপারাস বলে জানা যায়, অর্থ্যাৎ স্ত্রীরা শাবকের জন্ম দেয়। এরকম ওভিপেরাসপিট ভাইপার হল ল্যাচেসিস, ক্যালোসেলাসমা, ট্রিমেরেসুরাস ও ওভোফিস।
২৩. বেশিরভাগ স্থলজ ইলাপিডরা ডিম পাড়ে কিন্তু হেমাচাটু ও বেশিরভাগ সামুদ্রিক সাপেদের প্রজাতির জরায়ুজ জনন হয়।
২৪. বেশিরভাগ প্রাণঘাতী বিষধর সাপেরা ভাইপেরিডে, ইলাপিডে ও হাইড্রোফিডে বর্গের হলেও অন্তত কিছু বিষাক্ত সাপ অন্যান্য বর্গেও দেখা যায়; যেমন, এরপ্রটন টেন্টাকুলাটাম (বর্গ হোমালপসিডে), অ্যাট্রাক্টাসপিসাটেরিমা (বর্গ ল্যামপ্রোফিডে), থেলোটরনিস ক্যাপেনসিস এবং ডিস্পফোলিডাস টাইপাস (বর্গ কলাব্রিডে) এবং র‍্যাবডোফিস্টিগ্রিনাস (বর্গ ন্যাট্রিসিডে)।
২৫. সামুদ্রিক সাপের বেশিরভাগ বর্গ তাদের ত্বকের উপরিভাগ দিয়ে শ্বাসকার্যে সক্ষম। এটা সরীসৃপদের মধ্যে স্বাভাবিক নয়, কারণ তাদের ত্বক পুরু ও আঁশে ঢাকা, কিন্তু হলুদ-ও-কালো সামুদ্রিক সাপ, পেলামিস প্লাটুরাস (একটি পেলাজিক প্রজাতি) নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষাতে দেখা গেছে, এই প্রজাতি এর প্রয়োজনের অক্সিজেনের ২৫% এই প্রক্রিয়ায় পূরণ করতে পারে, যাতে অনেকখন ডুব দিয়ে থাকা যায়।
২৬. বেশিরভাগ ইলাপিড সাপেদের থেকে আলাদা হল অস্ট্রেলিয়ান ডেথ অ্যাডারস (অ্যাকানথফিস এসপিপি)-এর ম্যাক্সিলা ভীষণভাবে গতিশীল, যার সঙ্গে বড়ো বিষদাঁত সংযুক্ত, যাদের অপ্রয়োজনে গুটিয়ে রাখে। এদের শারীরিক গঠনও বিষধরদের মতো যা তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী ও সঙ্গে উল্লম্ব মণি থাকে। এদের অধিকাংশ বিষধরদের মতো চোরা শিকারি ও শিকার ধরার সময়ে ওৎ-পেতে শিকার ধরার কৌশল অবলম্বন করে।
২৭. যদিও সাপেরা গতিশীল সবকিছুই খায়, তবুও কিছু খাদ্যবিলাসীদের বিশেষ পছন্দের খাদ্যতালিকা রয়েছে, যেমন—
(i)ট্যানটিলা কেন্নো খায়, (ii) অ্যাট্রাকাস খায় কেঁচো, (iii) লেপ্টোটাইফ্লপস এবং টাইফ্লপস মূলত আমাদের চারপাশের কীটপতঙ্গের লার্ভা ও পিউপা খায়, (iv) শামুক-ভুক সাপেরা (ডিপসাস ইন্ডিকা) শুধু শামুক ও গুগলি? খায়, (v) ভারতের জেরারদা প্রিভস্টিয়ানা সদ্য খোলস-ছাড়া কাঁকড়া খাওয়ায় বিশেষজ্ঞ, (vi) কাঁকড়া-ভুক জলের সাপ (ফোরডনিয়া লিউকোবেলিয়া) কাঁকড়া খায়। এই সাপের খাওয়ার এক বিশেষ প্রণালী আছে। এরা প্রথমে মুখ বন্ধ করে আঘাত করে ও কামড়ানোর আগে কাঁকড়াদের থুতনি ও নীচের অংশ গিঁথে নেয়। আবার বড়ো কাঁকড়া গিলে ফেলার আগে এরা তাদের পা আলাদা করে নেয়, (vii) প্রসিমনা (ল্যামপ্রোফিডে বর্গ) গণের সাপরা সাপ ও গিরগিটিদের ডিম বিশেষজ্ঞ, (viii) থেলোটরনিস ছোটো পাখিদের খায়, (ix) এমিডোসেফালাস অ্যানুলেটাস কেবলমাত্র মাছের ডিম খায় এবং ড্যামসেল, ব্লেনিস ও গবিস প্রজাতির মাছেদের ডিম, তাও যেসব ডিম প্রবাল বা পাথরের গায়ে আটকে থাকা বাসায় পাড়া, সেগুলো এরা পছন্দ করে। এদের উপরের ঠোঁটের দু-দিকে যে বড়ো আঁশ আছে তা দিয়ে চেঁছে তুলে এরা এটা করতে পারে। আশ্চর্যজনকভাবে এমিডোসেফালাস একমাত্র সাপ যাদের প্যালাটাল দাঁত নেই। এমিডোসেফালাস-দের মধ্যে শুধু প্রতি ম্যাক্সিলায় একটি বড়ো আকারের প্রটেরোগ্লাইফস বিষদাঁত ছাড়া পিটেরিগইড হাড়ে কিছু দাঁত থাকে। অন্যান্য সাপেদের থেকে পৃথক খাদ্যাভাসের কচ্ছপ-মাথার সাপ, আকারে বড়ো ও কিছু সময় পরে পরে শিকার ধরার পরিবর্তে বারে বারে অল্প করে খাবার খেতে পছন্দ করে। এই ক্ষেত্রে, এমিডোসেফালাস সাপের তুলনায় চারণ পশুদের মতো খায়। এই বিরল খাদ্যাভ্যাস সাপেদের বিশেষ অভিযোজিত বিকিরণের প্রমাণ।
২৮. এরপেটন টেন্টাকুলাটাম একমাত্র সাপ যার তুণ্ডে শুঁড় আছে।
২৯. সামুদ্রিক করেত সাপরাই, লাটিকডা, যাদের পাঁচটি প্রজাতি আছে, সাপের একমাত্র গণ যাদের অঙ্কদেশীয় বড়ো আঁশ টিকে রয়েছে। যেহেতু এরা এখনও এদের বেশিরভাগ সময়টা মাটিতে কাটায়, যেখানে এদের অঙ্কদেশীয় আঁশগুলি আটকে থাকার প্রয়োজনীয় ক্ষমতা দেয়, তাই এদের বেশি আদিম ধরা হয়। লাটিকডা প্রজাতিরা আবার একমাত্র সামুদ্রিক সাপ যাদের নাকের ভেতরে আঁশ আছে, অর্থ্যাৎ, এদের নাকের ফুটো পিঠের দিকে অবস্থিত। এরা আবার একমাত্র অভিপেরাস (অণ্ডজ) সামুদ্রিক সাপের গণ।
৩০. আইপিসুরাস লেভিস-দের লেজের ত্বকে ফোটোরিসেপটর দেখা যায়, যার ফলে এরা আলো নির্ণয় করতে পারে, যাতে এরা নিশ্চিতরূপে, বিশেষত দিনে প্রবালের ফাঁকে এদের লেজ সুদ্ধ সম্পূর্ণ লুকিয়ে থাকতে পারে। যখন অন্যান্য প্রজাতিদের এর পরীক্ষাই করা হয়নি, এ. লেভিস হয়তো এই ব্যপারে অন্য সামুদ্রিক সাপেদের মধ্যে অনন্য নয়।
৩১. স্টোক’স সামুদ্রিক সাপ, অ্যাস্ট্রোশিয়া স্টকেসি ক্রান্তীয় ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরে সামুদ্রিক সাপের একটা বড়ো প্রজাতি। স্টোক’স সামুদ্রিক সাপ সব সামুদ্রিক সাপেদের থেকে বেশি ওজনের ও শক্তিশালী (এটা সবথেকে ভারী সামুদ্রিক সাপের প্রজাতি যাদের ওজন ২ কেজির বেশি হয়। কারপেন্টারিয়া গালফ-এ ৫. ১৪৪ কেজি ওজনের একটি পাওয়ার রেকর্ড আছে ( ৮ নভেম্বর, ২০০৫-এ কারপেন্টারিয়া গালফ-এ ধরা পড়েছিল) (এম. হোয়াইট পার্স. কম. ২০০৯)), যার যেকোনো সামুদ্রিক সাপের থেকে বড়ো বিষথলি ছিল। মালায়সিয়ার উপকূলে মালাক্কা প্রণালীতে এরা কখনো কখনো হাজার জনের পরিযায়ী দল গঠন করে (সম্ভবত প্রজননের প্রয়োজনে) এক মিটার লম্বা সাঁতারে পাড়ি দেয়।?
৩২. হাইড্রোফিস সেমপেরি, (বা ফিলিপাইন মিষ্টিজলের সামুদ্রিক সাপ, জার্মান’স সামুদ্রিক সাপ বা লেক সাপ) একটা বিরল প্রজাতির বিষধর সামুদ্রিক সাপ, যাকে পাওয়া যায় ফিলিপাইনের লুজন দ্বীপের একটিমাত্র পুকুরে। বিশেষত মিষ্টিজলে পাওয়া যায় এমন পরিচিত সামুদ্রিক সাপের দু-টি প্রজাতির মধ্যে একটি (এবং নিজের বর্গে একমাত্র একটি) বলে এটি গুরুত্বপূর্ণ। অপর মিষ্টিজলের সাপের প্রজাতি হল লাটিকডা ক্রকেরি।
তথ্যসূত্র:
1. Alirol E., Sharma S. K., Bawaskar H. S., Kuch U., Chappuis F. (2010). Snake Bitein South Asia: A Review. PLoSNegl Trop Dis 4(1): e603. doi:10.1371/ journal.pntd.0000603
2. Fry, B. G. (2015). Venomous reptiles and their toxins: evolution, pathophysiology and biodiscovery. Oxford University Press.
3. Fry, B. G. and W. Wuster. (2004). Assembling an arsenal: origin and evolution of the snake venom proteome inferred from phylogenetic analysis of toxin sequences. Mol. Biol. Evol. 21(5):870-883.
4. Gawade, S. P. (2004). Snake venom neurotoxins: pharmacological classification. J. Toxicol. Toxin Rev. 23 (1):37-96.
5. Kardong, K. V. 1982. The evolution of the venom apparatus in snakes from colubrids to viperids & elapids. Mem. Inst. Butantan. 46:105-118.
6. Kardong, K. V. 2002. Colubrid snakes and Duvernoy’s “venom” glands. J. Toxicol. Toxin Rev. 21(1&2):1-19.
7. Kumar, V., R. Maheshwari and H. K. Verma. 2006. Toxicity and symptomatic identification of species involved in snake bites in the Indian subcontinent. J. Venom. Anim. Toxins incl. Trop. Dis. 12(1):3-18.
8. Lillywhite, H. B. (2014). How Snakes Work: Structure, Function, and Behavior ofthe World’s Snakes. Oxford University Press.
9. Mackessy, S. P. (2010). Handbook of venoms and toxins of reptiles. CRC Press.
10. Mackessy, S. P. 2002. Biochemistry and pharmacology of colubrid snake venoms. J. Toxicol. Toxin Rev. 21(1&2):43-83.
11. Valenta, J. (2010) Venomous snakes: Envenoming, therapy. Nova Science Publishers, Inc.
12. Vidal, N. 2002. Colubroid systematics: evidence for an early appearance of the venom apparatus followed by extensive evolutionary tinkering. J. Toxicol. Toxin Rev. 21(1&2):21-41.
13. Vitt, L. J., & Caldwell, J. P. (2014). Herpetology: an introductory biology of amphibians and reptiles. Academic Press.
14. Wallach, V., Williams, K. L., &Boundy, J. (2014). Snakes of the World: A catalogue of living and extinct species. CRC Press.

Add Comments