প্রাণের উৎস সম্পর্কে দূরদর্শী চিন্তন ছিল ডারউইনের

তথ্যসূত্রঃ স্প্যানিশ ফাউন্ডেশন ফর সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, স্পেন

দেড়শ বছর আগে যখন অরিজিন অফ স্পিসিস বইটি ডারউইন প্রকাশ করেন, ইচ্ছাকৃতই প্রাণের উৎপত্তির বিষয়টি তিনি এড়িয়ে যান। এছাড়াও, বইয়ের শেষ অনুচ্ছেদে ‘স্রষ্টা’ শব্দটি উল্লেখ করে তিনি আসলেই কোনওরকম বিতর্কিত মন্তব্যের ফাঁদে পড়তে চান নি। ভ্যালেন্সিয়ার ক্যাভানিলিস ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক জুলি পেরেতোর নেতৃত্বে একটি আন্তর্জাতিক গবেষক দল ধোঁয়াশা পরিষ্কার করে জানিয়েছেন, প্রকৃতপক্ষে ডারউইন তাঁর অন্যান্য লেখায় দেখিয়েছেন কিভাবে প্রথম প্রাণ পৃথিবীতে সৃষ্টি হয়।
“কোনো এক আদিতম গঠন থেকেই পৃথিবীর যাবতীয় জীবসম্ভার তৈরি হয়ে থাকতে পারে” – এমনই সম্ভবনার কথা ডারউইন ১৮৫৯ সালে তাঁর বই অরিজিন অফ স্পিসিসে উল্লেখ করেছিলেন।
জুলি পিরেতো জানিয়েছেন, ডারউইন তাঁর তত্ত্বের অসীম গুরুত্ব সম্পর্কে অবহিত ছিলেন এবং আধুনিক বস্তুবাদী দর্শন ও বিবর্তনকেন্দ্রিক মানসিকতাও তাঁর ছিল। জড় কোনো রাসায়নিক পদার্থ থেকেই জীবজগতের উদ্ভব, যদিও স্বতঃস্ফূর্ত প্রজন্মের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে লুই পাস্তুরের যে তত্ত্ব, তার ব্যাপারেও ডারউইন বেশ ওয়াকিবহাল ছিলেন।
অরিজিনস অফ লাইফ অ্যান্ড এভোলিউশন শীর্ষক পত্রিকায় প্রকাশিত এই গবেষণাপত্রে দেখানো হয়েছে, পৃথিবীর বুকে প্রথম প্রজাতি সম্পর্কে ডারউইনের ভবিষ্যৎদৃষ্টি অনেকটা এগিয়েই ছিল। তাঁকে নাড়া দিয়েছিল এই উৎসজ্ঞানের প্রশ্নটি। “কোনো রকম স্বর্গীয় প্রভাবের অস্তিত্ব তিনি খণ্ডন করেছিলেন, স্রেফ লোকদেখানোর জন্যই অরিজিন অফ স্পিসিস বইটিতে স্রষ্টা শব্দটি ব্যবহার করেও পরে তাঁর অনুতাপ এসেছিল”, নিশ্চিত করেই বলছেন প্রোফেসর পিরেতো।
গবেষকদের মতে, ব্যক্তিগত বাড়িতে একান্ত ব্যক্তিগত কিছু নথিপত্রেই সৃষ্টি সম্পর্কে ডারউইনের মনোভাবের হদিশ মিলতে পারে। একমাত্র ব্যতিক্রম হিসেবে বলা যায়, ১৮৬৩ সালে লন্ডন সোশ্যাল ক্লাব অ্যাথেনিয়ামে ‘ফোরামিনিফেরাস মাইক্রোঅরগ্যানিজম’-র উপর লেখা বইয়ের প্রতিক্রিয়ায় ডারউইন স্বতঃস্ফূর্ত প্রজন্মের ব্যাপারে তাঁর মতামত ব্যক্ত করেছিলেন।
স্পেন, অ্যামেরিকা এবং মেক্সিকোর বিজ্ঞানীদের নিয়ে তৈরি এই দল শুধুমাত্র চিঠিপত্রের নিখুঁত বিচারই করেন নি, অরিজিন অফ স্পিসিস নিয়ে ডারউইনের নিজের মতামতগুলিও সামগ্রিকভাবে চিন্তা করে দেখেছেন।

দ্য অরিজিন অফ লাইফ হাইপোথেসিসঃ
১৮৩৭ সালে নোটবুকে একটা মন্তব্য খুঁজে পাওয়া যায়, যেখানে ডারউইন বলছেন, স্বতঃস্ফূর্ত প্রজন্মের ধারণাটি বোধগম্য হওয়ার কারণ রসায়নের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলির সাথে নিয়মের নিবিড় যোগাযোগ – গবেষকরা পথে পেয়েছিলেন আলো।
ইংলন্ডের উদ্ভিদবিদ জোসেফ ডি হুকারকে লেখা ১৮৭১ সালের সেই বিখ্যাত চিঠিতে ডারউইন কল্পনার কথা বলছেন, ক্ষুদ্র উষ্ণ এক আধারে অজৈব রাসায়নিক পদার্থ নিজেকে বিবর্তনের এককরূপে সজ্জিত করে নিচ্ছে যেন, যজ্ঞে আরও কিছু রাসায়নিকের নেপথ্য উপস্থিতি এবং পর্যাপ্ত শক্তির যোগান।
অ্যালফ্রেড রাসেল অয়ালেশ অথবা এর্ন্সট হ্যাকেলের মতো বন্ধুবর্গকে পাঠানো চিঠিতে ডারউইন স্বীকার করে নিয়েছেন, তত্ত্বের সংগতির প্রশ্নে খুব প্রাসঙ্গিকভাবেই এসেছে স্বতঃস্ফূর্ত প্রাণসৃষ্টির বক্তব্যটি। পেরেতো বলছেন, ডারউইন কিন্তু শেষমেশ মেনে নিচ্ছেন যে মানুষের মেধার বা বিজ্ঞানের তদানীন্তন উৎকর্ষ, কোনোটাই এই প্রশ্নের সদুত্তর দিতে সক্ষম নয়।

Add Comments