ও-আর-এস-এর প্রায়োগিক সাফল্যের কাহিনি

- দিলীপ মহলানবীশ
চিকিৎসক ও বিজ্ঞানী

১৯৭১ সালের মে মাসের শেষাশেষি সময়ের কথা। সে সময়ের পূর্ব-পাকিস্তান যা এখনকার বাংলাদেশ, তখন মহাপ্রলয়ের মাঝে। রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের মাঝখানে ঘটিবাটি ছেড়ে, সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে উদ্বাস্তু হয়েছেন প্রায় ষাট লক্ষ মানুষ । একদিকে খিদে, তাছাড়া আশ্রয় আর সুরক্ষার একান্তই অভাব । অন্যদিকে পথচলার ক্লান্তিতে প্রায় নুইয়ে পড়া একঝাঁক মানুষ আশ্রয় নিয়েছে সীমানায় তৈরি হওয়া নানান উদ্বাস্তু শিবিরে । মে-জুন মাসের গ্রীষ্ম-বর্ষার মাঝামাঝি, কলেরা আর আন্ত্রিক রোগেরও আক্রমণ হতে শুরু করল এই উদ্বাস্তু শিবিরগুলিতে । ঝাঁকে ঝাঁকে মানুষ একদিকে খাবারের জন্য ছুটছে, অন্যদিকে খিদেয় কাতর মানুষগুলো কলেরার মুখে পড়ে নতুন বিপদে । জলে কুমীর-ডাঙায় বাঘ উপমার সার্থক রূপ দেখেছে মানুষগুলো ।
কলেরা-চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় উদ্বাস্তু শিবিরগুলোও তখন দাঁতে দাঁত চেপে লড়ছে । তবুও খামতি থেকেই যাচ্ছে । প্রায় তিরিশ শতাংশ কলেরা আক্রান্ত মানুষ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে আমাদের সব পরিশ্রম সত্ত্বেও । মানবতার সে নিদারুণ ঝঞ্ঝার সময় । চিকিৎসক হিসেবে, বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে আমরাও পথ হাতড়াচ্ছি- কী করে মানুষগুলোকে বাঁচানো যায় । সমস্যা সে মুহূর্তে অনেক । একদিকে শিরা দিয়ে ( ইন্ট্রাভেনাস) ব্যবহার করার জন্য যে স্যালাইন, তার বিপুল প্রয়োজনীয়তা তখন । কারণ এটাই সে সময় একমাত্র চিকিৎসা । এই উদ্বাস্তু শিবিরগুলোতে এত বিপুল সংখ্যার স্যালাইনের বোতল নিয়ে যাবার গাড়ির অভাব – আরেকটা দুশ্চিন্তার বিষয় । তার সাথে ইন্ট্রাভেনাস ফ্লুইড দেবার জন্য প্রশিক্ষিত ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীর অপ্রতুলতা আর এক সমস্যা। আমরাও নতুন ভাবনার শরিক তখন । গবেষণাগারে আর তারপর মানুষের উপর গ্লুকোজ মিশ্রিত নুনজলের পানীয় খাইয়ে যে ভালো ফল পাওয়া যায় – তার প্রাথমিক খবর পৌঁছেছে আমাদের সবার কাছে । এপর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী এটাই জানা গেছে যে, এতে করে স্যালাইন দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা প্রায় নির্মূল করা যায় । এমনকি এই পদ্ধতি গ্রহণ করলে আন্ত্রিক রোগে পেট থেকে জল বেরোনোর ফলে যে শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তনগুলো ঘটে এবং শেষমেশ মৃত্যু ডেকে আনে – সেগুলিও পাল্টে দেওয়া যায় । আমরা উদ্দীপ্ত হয়ে ঠিক করলাম ব্যাপকভাবে উদ্বাস্তু শিবিরগুলোতে এই চিনি নুনের শরবৎ খাওয়াবো আন্ত্রিক আক্রান্ত মানুষদের । গুরুত্বপূর্ণ এটাই ছিল যে, পাতলা পায়খানা হচ্ছে- বুঝবার প্রায় সাথেসাথেই এই চিনি নুনের শরবৎ মানুষগুলিকে খাওয়াতে হবে । কারণ যত প্রাথমিক অবস্থায় তা ধরা হবে – তত দ্রুত এবং দৃঢ়তার সাথে শরীর সুস্থ হবে ।

নুনচিনির জল ( ওরাল রিহাইড্রেশান সল্ট ) এর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি

এটাও বেশ মজার গল্প । সুস্থ মানুষের শরীরে, গ্লুকোজ, অন্ত্রের প্রথমদিকের যে অংশ- ডিওডেনাম এবং জেজুনাম – সেখান থেকেই খাদ্যবাহী নালীর থেকে দ্রুত রক্তে পৌঁছায় । এই কাজটা সম্পূর্ণ শক্তিনির্ভর । আর তা করে ক্ষুদ্রান্ত্রের কোষগুলি । মজার ব্যাপার হল গ্লুকোজ- যা চিনির বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞা – তা রক্তে টেনে নেওয়ার সময় ক্ষুদ্রান্ত্রের কোষগুলি সহযাত্রী হিসাবে নিয়ে নেয় সোডিয়াম অণুকে আর তার সাথেসাথে নেয় প্রচুর জল । ল্যাবরেটরির ঘরগুলোতে পরীক্ষা ক’রে এই তথ্য প্রথম জানা গেলেও পরে তা মানুষের ক্ষুদ্রান্ত্রেও প্রমাণিত হয় । ফলে যে বুদ্ধির উদয় হল – তা হল, গ্লুকোজের সাথে সোডিয়ামের সমন্বয় ঘটাতে পারলে তা শরীরে সোডিয়াম আর জল সংরক্ষণে সহায়তা করবে । এরই সাথে সাথে এও দেখা গেল যে, কলেরাতে ক্ষুদ্রান্ত্র থেকে নিতান্তই জীবনদায়ী সোডিয়াম এবং অন্যান্য অণু কোষের ক্ষমতা কমে গেলেও, গ্লুকোজের সাথে সহযাত্রী হয়ে তা তখনও রক্তে পৌঁছতে পারে । অতএব কলেরা আক্রান্তদের গ্লুকোজ আর সোডিয়াম সংযুক্ত পানীয় দিতে পারলে তা শরীর থেকে বেরিয়ে যাওয়া অণুগুলির অভাবই শুধু দূর করবে না – শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কাজকর্মও স্বাভাবিক রাখবে । এই ভাবনা ও বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের প্রয়োগও হয়ে গেল নিবিড়তর গবেষণায় । তাতেও দেখা গেল যে কলেরা এবং অন্যান্য ডায়রিয়াতে শরীরে যে জলশূন্যতা হয় তার ক্ষতিকারক প্রভাব শুধু গ্লুকোজ-সোডিয়াম মেশানো জল খাইয়ে এড়ানো যায় । আমরা ব্যাপকভাবে এই কাজে নামার আগে অন্যান্য গবেষণায় দেখতে পেয়েছিলাম যে প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী আর পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকলে নুনচিনির জল খাইয়ে কলেরার হাত থেকে রেহাই দেওয়া যায় মানুষকে ।
আমাদের সামনে প্রশ্নটা কিন্তু একটু অন্যরকমের ছিল সেই মুহূর্তে । একই পদ্ধতিতে চিকিৎসা কি- যেখানে প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর অভাব, যেখানে স্যালাইনের জোগান নেই- যেখানে চিকিৎসার প্রায় কোনো অবস্থাই নেই- সেই রকম পরিস্থিতিতে করা সম্ভব? মনে রাখা দরকার আমরা যুদ্ধবিধ্বস্ত জনসমষ্টি নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম- সবাই যেখানে ক্ষুধা, অপুষ্টি, চরম সুরক্ষার অভাব, বাসস্থানের ঠিকানার সমস্যায় আচ্ছন্ন । ১৯৭১ সালের গ্রীষ্মে যখন উদবাস্তু শিবিরে কলেরা এল রইরই করে তখন দেশের সরকার, রাজ্য সরকার আর স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলির চিন্তার ভাষা এক । প্রয়োজন তখন যেমনভাবে পারা যায় জীবন বাঁচানোর আর বোঝা গেল একমাত্র ওরাল রিহাইড্রেশান সল্ট এর ব্যাপক প্রয়োগ আর ব্যবহার করেই তা করা যাবে । আমরা চিকিৎসা দেওয়ার জন্য দুটি দলের ব্যবস্থা করলাম । এদেরই কলেরার চিকিৎসা এবং ওরাল রিহাইড্রেশান সল্ট মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হল । মানবিক কারণে আলোড়িত হওয়া ছাড়াও আমরা এটাও বুঝতে চাইছিলাম যে প্রতিকূল পরিমন্ডলে এবং স্থানীয়ভাবে পাওয়া যায় এরকম জিনিসপত্তর দিয়েই কাজটা ভালভাবে করা যায় কিনা । কলকাতা এবং পৃথিবীর অন্যান্য জায়গায় কাজ করছেন এমন বিজ্ঞানীদের সাথে আলোচনা ক’রেই আমরা বাস্তবসম্মত পদ্ধতি তৈরি করছিলাম ।

কীভাবে এবং কোথায় এই উদ্যোগ আর গবেষণা

কলেরার প্রাদুর্ভাব তখন চরমে – এপিডেমিকের রূপ ধারণ করেছে শরণার্থীদের মধ্যে। এই চরম অবস্থার মধ্যেই আমাদের দুটি দলই এক হল বনগাঁ শহরে। শহরটি ভারত ও পূর্ব-পাকিস্তান (অধুনা বাংলাদেশ) সীমান্তে। ঝাঁকে ঝাঁকে উদ্বাস্তু তখন প্রতিদিন সীমান্ত পেরোচ্ছেন। বনগাঁর মহকুমা হাসপাতালে তৈরী হল মূল চিকিৎসা শিবির। দুটি ঘরে সংক্রামক ব্যাধির জন্য নির্ধারিত ১৬টি বিছানা-যুক্ত ওয়ার্ডে হল কলেরা চিকিৎসার ব্যবস্থা। আমরা পৌছালাম ১৯৭১ সালের ২৪শে জুলাই। সেই মুহুর্তে বনগাঁ শহরের আশেপাশে আছেন সাড়ে তিন লক্ষ উদ্বাস্তু। আর প্রতিদিন সীমান্ত পেরিয়ে এদেশে ঢুকছেন আরও ছ’হাজার মানুষ। ছোটখাটো প্রান্তিক শহরের জীবনযাত্রা তখন এই বিপুল শরণার্থীর চাপে প্রায় থমকে দাঁড়িয়েছে।
আমাদের প্রথম চিন্তা হল ইন্ট্রাভেনাস ফ্লুইড যা এতদিন ডায়রিয়া চিকিৎসার একমাত্র অস্ত্র ছিল – তা কীভাবে বনগাঁয় আনা যায় কোলকাতা থেকে। কোলকাতা থেকে বনগাঁর দূরত্ব প্রায় পঞ্চাশ মাইল। আনতে হবে স্যালাইন, ওষুধ, মানুষ আর খাবারও। প্রথমে ব্যবস্থা হল যানবাহনের যাতে ক’রে প্রায় নিয়মিতভাবে এই নিতান্ত প্রয়োজনীয় জিনিসগুলি চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়া যায়। ইন্ট্রাভেনাস ফ্লুইড তখন আরও অনেকে আমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন ব্যবহারের জন্য। তা নানা রকমের। এত নানারকমের ফ্লুইড আদতে প্রয়োজনীয় না। কিন্তু ডাক্তাররা যা পাচ্ছিলেন দিচ্ছিলেন আমাদের। আর আমাদের সামনেও বেশী পথ খোলা ছিল না। কিন্তু সমস্যা হল এই স্যালাইনের সরবরাহ ছিল প্রয়োজনের তুলনায় নিতান্তই কম এবং অনিয়মিত। জীবন তো আর অপেক্ষা করে না। আমরাও হাত কামড়াচ্ছিলাম। এতদিনে পৃথিবীর অন্যান্য জায়গায় – মূলতঃ বাংলাদেশে – নুন চিনির দ্রবনের সহায়ক এবং জীবনদায়ী ভূমিকা আছে – তার ফলপ্রয়োগের খবর আমাদের কাছেও ছিল। কাজেই আমরাও ঠিক করলাম – এটাই আমাদের এই অবস্থার থেকে বার করার পথ হতে পারে। অতএব শুরু হল নতুন পথের পথ চলা।
চিনি–নুনের যে দ্রবণ আমরা ব্যবহার করব বলে ঠিক করেছিলাম তার উৎপাদন গুলি ঠিক এরকমঃ-
প্রতি লিটার জলেঃ-

১) ২২গ্রাম গ্লুকোজ (খাবারে যা পাওয়া যায়)
২) ৩৫গ্রাম সোডিয়াম ক্লোরাইড (খাবার নুন)
৩) ২১গ্রাম সোডিয়াম বাই-কার্বনেট (খাবার সোডা নামে পরিচিত)
এটাকে মেশালে এর মধ্যে যে ইলেক্ট্রোলাইটস থাকে তা এরকমঃ- প্রতি লিটারে
• সোডিয়াম – ৯০মি. ইকুইভ্যালেন্ট
• ক্লোরাইড – ৬০মি. ইকুইভ্যালেন্ট
• বাইকার্বনেট – ৩০মি. ইকুইভ্যালেন্ট
• গ্লুকোজ – ১২১মি. মোল।

এটাই হচ্ছে সব থেকে সহজ-সরল ফর্মুলা, যা আগে ব্যবহার করে সুফল পাওয়া গেছে। পটাশিয়াম-জাত অংশগুলি অত সহজে পাওয়া যাচ্ছিল না। কাজেই আমরা ব্যবহার করিনি।
চিনি নুনের প্যাকেট তৈরী হত কোলকাতায়। সেখানে জনস্‌ হপকিন্‌স রিসার্চ ল্যাবরেটরির মূল কেন্দ্র ছিল। দ্রবণের অংশগুলি অজন করার ক্ষেত্রে টেকনিশিয়ানরা খুব সতর্ক দায়িত্ব পালন করতেন। এক একজন তিনটি অংশের এক একটি ওজন ক’রে অপরজনের হাতে তুলে দিতেন। পালা ক’রে ক’রে এভাবেই এগোতো ওজন আর মিশ্রনের কাজ। এগুলি রাখা হতো একটি দই পলিথিনের ঠোঙায়। আর একজন টেকনিশিয়ানের কাজ ছিল ঠোঙাটির গায়ে লেবেল লাগানো – যাতে লেখা থাকতো কীভাবে ব্যবহার করতে হবে, কতটা জলে গুলতে হবে ইত্যাদি। আর তারপর একজন ঠোঙাটির একটা প্রান্ত গরম ইস্ত্রি দিয়ে গলিয়ে মুখ বন্ধ করতেন। দু’রকম সাইজের জ্যাকেট বানানো হয়েছিল। এরকম সাইজের ছোট – তা গুলতে চার লিটার জল লাগে। অন্য সাইজটা বড় তা গোলার জন্য ১৬ লিটার জল লাগে। আর এই গোলার কাজটা করা হত চিকিৎসা ক্ষেত্রে- মানে বনগাঁয়। শুকনো পাউডার পরিশ্রুত খাবার জলে গুলে রাখা হত পেল্লাই সাইজের ড্রামে। আর রোগীদের তা তুলে দেওয়া হত তাদের বাটি করে।
এখানে জানানো দরকার যে আমরা হিসাব করে দেখলাম যে প্রতি লিটার নুন চিনির জল বানাতে খরচ হচ্ছিল সে সময় এগারো পয়সা। আর আমাদের নুন চিনির যে মিশ্রনের জল কোলকাতায় কাজ করছিল – তারা আমাদের দিয়েছিল প্রায় ৫০০০০ লিটার ব্যবহার করার মতো জিনিস।

কীভাবে চিকিৎসা করা হল

আমাদের লক্ষ্য ছিল সব থেকে সহজ-সরল পদ্ধতিতে আমাদের সীমাবদ্ধ যোগানের মধ্যে যত বেশী সংসার কলেরা মানুষের কাছে পৌঁছানো যায়। আমরা রোগীর প্রাথমিক শারীরিক অবস্থার নিরিখে দু’ধরনের পথ নিয়েছিলাম।
১) যারা অতিরিক্ত জলশূন্যতায় ভুগছিলেন তাদের আমরা প্রথমে ইন্ট্রাভেনাস ফ্লুইড দিয়েছিলাম। কারণ তা নইলে এদের জলহীনতা ও অম্লতার মাত্রা এতটাই বেশী হয়ে পড়ে যে জীবনসংশয় হতে পারে। এই রকম মানুষের চিকিৎসায় প্রথম ৬–৮ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় লিটার তিনেক ইন্ট্রাভেনাস ফ্লুইডের প্রয়োজন হল। এত বিপুল ইন্ট্রাভেনাস ফ্লুইড আমাদের কাছে প্রায়ই থাকত না। কখনও কখনও এমনও হত যে প্রায় একদিন কোনও ফ্লুইড নেই। যদিও সাধারনভাবে আমাদের কাছে যা থাকত তাতে ক’রে এই মাত্রাতিরিক্ত জলশূন্যতায় ভোগা মানুষদের প্রাথমিক ‘দুরবস্থা’ কাটিয়ে তোলার জন্য তা যথেষ্ট ছিল। এই শুরুর অংশ ইন্ট্রাভেনাস ফ্লুইড দিয়ে প্রাথমিক অবস্থার উন্নতি হলে আমরা মুখে নুন-চিনির জল খাওয়াতে শুরু করতাম। এতে করে যে জল এবং শরীরের অন্যান্য ইলেক্ট্রোলাইটের অভাব তা পূরণ করা যেত।
২) অন্যদিকে যারা প্রাথমিক পর্যায়ে অতটা গুরুতর জলশূন্যতায় ছিলেন না এবং অল্প জলহীনতায় আসতেন চিকিৎসার জন্য তাদের জন্য আমরা শুরু থেকেই নুন-চিনির জল খাওয়াতে শুরু করতাম। রোগীরা যখনই খেতে পারবে তখনই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এটা শুরু করা হত। আর যতক্ষণ না পাতলা পায়খানা বন্ধ হচ্ছে ততক্ষণ অবধি তা চালিয়ে যাওয়া হত। আমরা দেখে জেনেছিলাম যে কজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের পায়খানা না বন্ধ হওয়া পর্যন্ত ১০–২০ লিটার জলের প্রয়োজন হচ্ছিল।
খুব ছোটো বাচ্চাদের পটাশিয়ামও দেওয়া হচ্ছিল ডাই-হাইড্রোজেন ফসফেট হিসেবে। ডাবের জলে যেহেতু প্রচুর পটাশিয়াম থাকে তাই পাওয়া গেলে তাও দেওয়া হচ্ছিল। প্রাপ্তবয়স্ক আর বড়ো বাচ্চাদের এর সাথে দেওয়াই হচ্ছিল টেট্রাসাইক্লিন ক্যাপ্সুল। ২৫০ মিলিগ্রাম প্রতি ছয় ঘণ্টা করে ২ দিন পর্যন্ত তা ব্যবহার করা হচ্ছিল। ছোটো বাচ্চাদের দেওয়া হচ্ছিল এর অর্ধেক। স্বাভবিক খাওয়া দাওয়া করতে প্রত্যেককে উৎসাহিত করা হচ্ছিল – এর ফলে পাতলা পায়খানা বন্ধ হত।

আমাদের প্রয়াসের ফলাফল

কলেরার প্রাদুর্ভাব সবথেকে গুরুতর আকার ধারণ করেছিল ১৯৭১ সালের জুন মাসে। এই সময় সেই তিন হাজারেরও বেশী কলেরা রুগী তিন সপ্তাহের মধ্যে চিকিৎসা পেয়েছিলেন। প্রতিদিন প্রায় ২০০ কলেরা আক্রান্ত বনগাঁ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। ছোট ছোট যে কেবিনগুলো ছিল সেগুলো ভর্তি হয়ে গিয়েছিল আর রোগীদের মেঝেতে রাখতে হচ্ছিল। এমনও একটা সময় এল যখন তাদের মেঝেতে শুইয়ে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় জায়গাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। কোলকাতা থেকে প্রায় এক হাজার ক্যানভাস তাঁবু তৈরির কাপড় পাঠানো হল। তাই দিয়ে তৈরি হল অস্থায়ী সব রোগীদের কুঁড়েঘর। বিশাল আকৃতির সেই তাঁবুর নীচে সারিসারি কলেরা-ক্লিষ্ট মানুষের চিকিৎসার ব্যাবস্থা হল। তা সত্ত্বেও ঠাঁইয়ের বড় অভাব – প্রয়োজন অনেক বেশী। একই বিছানায় দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ অথবা চারজন বাচ্চাকে শোয়ানোর ব্যবস্থা হল। রোগীর প্রবাহ এত বেশী যে জায়গা তৈরী করার জন্য আমাদের অনেকক্ষেত্রেই চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে তাদের ছুটি দিতে হচ্ছিল, যাতে নতুন মানুষকে জায়গা দেওয়া যায়। যাবার সময় তাদের হাতে ধড়িয়ে দিচ্ছিলাম কিছুটা নুন চিনির জল আর টেট্রাসাইক্লিন। আর বলে দেওয়া হত অসুবিধায় পড়লে চলে আসবেন। আমাদের সৌভাগ্য তাদের মধ্যে মাত্র কয়েকজনকেই ফিরে আসতে হয়েছিল। অর্থাৎ পাতলা পায়খানার বেশীর ভাগই চব্বিশ ঘন্টাতেই সেরে যেত। অবস্থার উন্নতি হতে পনেরো থেকে কুড়ি দিন লাগল। জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে প্রতিদিন ভর্তির সংখ্যা ২০০ থেকে কমে প্রতিদিন জন্য ষাট (৬০) হয়ে দাঁড়াল। আগস্ট মাসে তা আরও কমে দাঁড়াল প্রায় নগণ্য।
১৯৭১ সালের ২৪শে জুন থেকে ৩০ শে আগস্ট- এর মধ্যে আমরা চিকিৎসা করেছিলাম প্রায় ৩৭০০ জন কলেরা-আক্রান্তের। এদের মধ্যে মারা গেছিলেন মাত্র ৩.৬%। আরও উল্লেখযোগ্য একটি আলাদা তাঁবুতে শুধুমাত্র এই নতুন পদ্ধতিতে চিকিৎসা হচ্ছিল। এখানে চিকিৎসা পাওয়া ১২০০ জনের মধ্যে মৃত্যুর হার ছিল আরও কম – ১% মাত্র।
এই সময় আমরা রোগীর বাড়ীর লোকজন আর স্বাস্থ্যকর্মী সবাইকে বলতাম, পাতলা পায়খানা শুরু হলেই, যে নুন খেতে পারে তাকে নুন চিনির জল খাওয়ান গোগ্রাসে। আর অবস্থার উন্নতি হলে শুধু জল – নুনের ভাগ বাদ দিয়ে। যদিও অনেকেই এই নুন চিনির জল খেয়ে বমি করছিলেন কিন্তু বেশীরভাগই জলশূন্যতা ঠিক করার মতো প্রয়োজনীয় পরিমাণ গ্রহণ করতে সমর্থ হচ্ছিলেন। চিকিৎসক আর অচিকিৎসক স্বাস্থ্যকর্মী সবাইকে বোঝানো হয়েছিল যে প্রথমদিকে যত পারো নুন চিনির জল খাওয়াও। আমরা দেখেছিলাম যে যে ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত পরিমান জল খাওয়া হচ্ছিল না সেখানে ফলও আশানুরূপ ছিল না।
সবথেকে আনন্দের দিন এই যে রোগী আর তাদের বাড়ির লোকেরা এই পদ্ধতিটা গ্রহণ করছিল খুব সুন্দরভাবে। কিন্তু কিছু কিছু মানুষের তাতে ভরসা ততটা আসছিলনা তখনও। তারা আমাদের সাথে ঝগড়াঝাঁটি করতেন ইন্ট্রাভেনাস ফ্লুইড দেবার দাবী নিয়ে। এর একটা বিশ্বাসগত ভিত্তি যুগ যুগ ধরে ছিল কলেরা হওয়া আর “স্যালাইন” দিয়ে তা সেরে ওঠা- এই ভাবনা বাংলায় বহুদিন ধরে ছিল। আমরা দেখলাম যে “স্যালাইন” নামাটাকে কোথাও না কোথাও ধরে রাখতে পারলে গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে। অতটা আমরা নুন চিনির জলের নাম দিলাম “পানীয় স্যালাইন”। তা সত্ত্বেও বমি হলেই রোগী আর তাদের বাড়ির লোকেরা ভরসা হারাতেন। আমাদেরও লেগে থাকতে হত এর গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর জন্য। লাগাতার বোঝানো, ভরসা দেওয়া এই চিকিৎসা পদ্ধতিতে গ্রহণ যোগ্য করে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন।

বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা

আমরা দেখেছিলাম যে সামগ্রিকভাবে শরণার্থীদের মধ্যে বাচ্চার সংখ্যা ১৪%, কলেরা আক্রান্ত মানুষদের মধ্যে বাচ্চাদের (ছয় বছরের নীচে) সংখ্যা ৩৮% । অর্থাৎ কলেরা আক্রান্তদের মধ্যে শিশুর সংখ্যা আনুপাতিক হারে বেশী। এতে করে চিকিৎসা দেবার ক্ষেত্রেও বিশেষ সাবধানতা আর নজর দেওয়ার দরকার হচ্ছিল। ১০৮ জন রোগীর থেকে কালচার পদ্ধতিতে দেখা হয়েছিল জীবাণুর অস্তিত্ব ও তার বংশগত চরিত্র ঠিক করার জন্য। এই পরীক্ষা করেই একমাত্র পাতলা পায়খানা হবার কারন ঠিক করা যায় বৈজ্ঞানিকভাবে। ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিকাল রিসার্চের কলকাতার কলেরা রিসার্চ প্রতিষ্ঠানে এই পরীক্ষা হল। তাতে দেখা গেল যে প্রায় ৭৯% ক্ষেত্রেই তাতে কলেরার জীবাণু পাওয়া যাচ্ছে।

গবেষণা থেকে যা উঠে এল

সবার আগে যা মনে রাখা দরকার যে সারা বিশ্বের কলেরা-উপদ্রুত এলাকাগুলিতে একটা সহজ সরল পদ্ধতিতে চিকিৎসার পথ বাতলানো দরকারি। এখানেই হচ্ছে নুন-চিনির জল দিয়ে কলেরার চিকিৎসায় আমাদের উদ্যোগ এবং তার ফলের গুরুত্ব। যদিও আমাদের নিরীক্ষাগুলো মূলত ছিল বর্ণনামূলক এবং পরিমাণগত পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্যের অপ্রতুলতা তাতে ছিল তবুও কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তার থেকে বেরিয়ে এল।
প্রথমত প্রমাণিত হল যে প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে কলেরার চিকিৎসায় আমাদের নুন চিনির জল ভিত্তিক চিকিৎসা পদ্ধতি, আগের থেকে তৈরি নুন চিনির মিশ্রণ প্যাকেট করে নিয়ে গিয়ে তা গুলে চিকিৎসার প্রয়োজন অনুযায়ী প্রয়োগ করা যায়। আর তাতে কার্যকারিতা থাকে। আগের থেকে প্যাকেট তৈরী করতে পারলে ঠিকভাবে এর অংশগুলি মেপে নেওয়া যায়। তাছাড়া গুঁড়ো নিয়ে থাকার খরচ ও অনেকে বলেন যে ট্যাবলেট করে এটা প্রয়োগ করলে কেমন হয়! কিন্তু গুঁড়োর প্যাকেট তৈরির খরচ ও কারিগরি দক্ষতার প্রয়োজনের তুলনায় ট্যাবলেট তৈরী করা অনেক বেশী খরচসাধ্য।

দ্বিতীয়তঃ প্যাকেটের গুঁড়ো করা নুন চিনির মিশ্রণ জলে গুলে ব্যবহার করার এই পদ্ধতি খুব সহজেই মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলা যায়। এরজন্য কোনো বিশেষ প্রশিক্ষনের দরকার নেই। শিবির কিংবা গ্রামে একটু বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষই তা বানাতে পারে। আর এটুকু বুদ্ধি প্রত্যেকেরই থাকে। তাছাড়া সংবাদমাধ্যম আর রেডিওর মাধ্যমে সাধারন মানুষের কাছে এই খবরটা পৌছে দিতে পারলে আরও বেশী সংখ্যায় মানুষ তা ব্যাবহার করেন। গ্রহণযোগ্যতাও বাড়ে। আমরা এটাই করেছিলাম।
এটা মনে রাখা দরকার যে সবথেকে ভাল ফল পেতে গেলে নুন চিনির জল পায়খানা শুরু হওয়ার পর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শুরু করতে হবে। এই চিকিৎসা শুরু করার সময় চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের এই প্রচুর জলের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ভাবনা খোলসা করা দরকার। আর নানানরকম জটিল পরীক্ষা-নিরীক্ষায় না গিয়ে সোজা সাপটা নুন চিনির জল যত বেশী পরিমাণে যত বেশী তাড়াতাড়ি পাওয়া শুরু করা যায় – ততই ভালো। আরও গুরুত্বপূর্ণ, মুখ দিয়ে জল খেলে শরীরে বেশী জল ঢোকালে যে কুফল হতে পারে- তা হবার সম্ভাবনা দেখাই যায়না। এটা ইন্ট্রাভেনাস ফ্লুইডের ক্ষেত্রে দেখা যায়।
এরই পাশাপাশি মনে রাখা দরকার যে প্রাথমিক পর্যায়ে বমি হওয়া এই নুন চিনির জল খাওয়ায় সবথেকে বড় বাধা। আবার বমির ফলে শরীর থেকে আরও জল বেরিয়ে যায়। তা বন্ধ করাও দরকার। সেক্ষেত্রে যেভাবে পারা যায়- দরকার হলে নাক দিয়ে জল ঢোকানোতে গুরুত্ব দিতে হবে। এটা চিকিৎসার সাফল্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
বনগাঁ শরণার্থী শিবিরের আমাদের গবেষণালব্ধ অভিজ্ঞতা শিখিয়েছে যে নুন দিয়ে জল খাইয়ে কলেরার মৃত্যুর হার কমানো সম্ভব। আমরা বিশ্বাস করি এই পদ্ধতি আরও বেশী মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারলে কলেরার চিকিৎসায় আরও সাফল্য মিলতে পারে।

সারাংশ

নিতান্তই প্রতিকূল সামাজিক অবস্থা এবং প্রশাসনিক অব্যবস্থার মধ্যেও কিভাবে মুখ দিয়ে নুন চিনির জলের মতো সহজ সরল পদ্ধতিতে কলেরাক্লিষ্ট মানুষজনকে চিকিৎসা করা যায় তা নিয়ে এই গবেষণা প্রামাণ্য তথ্য নিয়ে এসেছে।
বাংলাদেশ যুদ্ধের সময় যন্ত্রণাবিহ্বল অবস্থায় কলেরা আক্রান্ত শরণার্থীদের মধ্যে এর প্রয়োগ করা হয়েছিল। ক্ষেত্রটি ছিল পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত শহর বনগাঁ । কলেরা যখন তুঙ্গে তখন আক্রান্ত মানুষদের কাছে এযাবৎকাল প্রচলিত ইন্ট্রাভেনাস ফ্লুইডের জোগান প্রায় ছিল না বললেই চলে। প্রয়োজনের তুলনায় তা ছিল নিতান্তই কম। এই অবস্থায় মুখ দিয়ে নুন চিনি মিশ্রিত জল খাইয়ে আমরা মৃত্যুর হার অনেক নীচে নামিয়ে আনতে সমর্থ হয়েছিলাম।
আমাদের অভিজ্ঞতার নিরিখে আমরা বিশ্বাস করি এই পদ্ধতি নিতান্তই সহজ সরল। এই মিশ্রণের যে উপাদানগুলি তা এলাকাতেই পাওয়া যায়। ব্যবহারও সোজা আর কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। এর প্রয়োগের জন্য বিশেষ কোন প্রশিক্ষনেরও দরকার নেই। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পাতলা পায়খানা শুরু হলে এর প্রয়োগ প্রয়োজন।

Add Comments