বিজ্ঞানের দোহাই

-গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়
অধ্যাপক, পদার্থবিদ্যা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়

ছোটবেলায় বাংলা রচনায় লিখতে হত আধুনিক যুগ হল বিজ্ঞানের যুগ, বিজ্ঞানই হল এই সময়ের চালিকা শক্তি, ইত্যাদি, ইত্যাদি। বয়স যত বাড়ছে কথাটার তাৎপর্য আরও ভালো করে বুঝতে পারছি। সত্যিই বিজ্ঞান ছাড়া এ যুগে এক পা এগোনোর উপায় নেই। বিজ্ঞান না থাকলে গুজরাটে গোমূত্রে যে সোনা পাওয়া যায় তা আমরা কেমন করে জানতাম? যে কোনো ধরনের ঘটনাকে আজ বিজ্ঞান দিয়েই ব্যাখ্যা করতে হবে। আজ থেকে পাঁচশো বছর আগে হলে গোমূত্রে সোনা থাকার পক্ষে প্রমাণ হিসাবে শাস্ত্রবাক্যকে হাজির করতে হতো, এখন অন্তত বলতে হয় যে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মেপে পাওয়া গেছে। বিজ্ঞানকে নিজের মতের সমর্থনে এনে হাজির করতে হবে। সমর্থন পুরোপুরি না করলেও ক্ষতি নেই, প্রথম কয়েকটা বাক্যে করলেই চলবে। বাকিটাতে কী আছে, তা জানা বা পড়ার আগেই বুঝে নেওয়া তো খুব সহজ কাজ। তারপরে বিজ্ঞানের দোহাই দিলেই চলবে।

একসময় যে কোনো বক্তব্য প্রতিষ্ঠার পক্ষে বেদ, বাইবেল, কোরান, জেন্দ-আভেস্তা ইত্যাদি ধর্মগ্রন্থেরাই ছিল সবচেয়ে বড়ো যুক্তির আকর। এখনো যে আমরা তাদের সেই জায়গা থেকে সরিয়ে দিয়েছি তা নয়, আমরা শুধু তাদের পাশাপাশি বিজ্ঞানকে রেখেছি। বিজ্ঞানের মূল কথা যে পরীক্ষা নিরীক্ষা, আপ্তবাক্যে বিশ্বাস করা যে তার স্বভাববিরোধী– সে কথা মনে রাখার দরকার কি? বিজ্ঞান ও ধর্মগ্রন্থের মধ্যে কোনো মৌলিক বিরোধ অনেকেরই চোখে কখনো পড়ে না – তাদের কাছে অন্তত বিজ্ঞান তাদের ধর্মগ্রন্থকে নানা ভাবে সমর্থন করে।

সেতুসমুদ্রম প্রকল্পের কথা মনে আছে? কয়েক বছর আগের কথা। একটা নৌপরিবহনযোগ্য পথ তৈরির জন্য শ্রীলঙ্কা ও ভারতের মধ্যে এক জায়গায় সমুদ্রের তলায় প্রণালী খোঁড়ার প্রস্তাব করেছিল ইউ পি এ সরকার। ভারতীয় জনতা পার্টি ও তার সহযোগী সংগঠনেরা অমনি মাঠে নেমে পড়লো। তাদের বক্তব্য ওখানে সমুদ্রের তলায় একটা সেতুর ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়। রামায়ণে আছে শ্রীরামচন্দ্র শ্রীলঙ্কাতে যাওয়ার জন্য সেতু বেঁধেছিলেন- এটা সেই সেতু। কিছুতেই এখানে খোঁড়াখুঁড়ি চলবে না।

রামায়ণে আছে বললে বিশ্বাসীদের কাছে অন্য কোনো প্রমাণ পেশের দরকার হয় না। কিন্তু আজকাল আর এক ধরনের লোক দেখা যায়, যারা অবিশ্বাসী, যারা শাস্ত্রবাক্য না মেনে অন্য প্রমাণ দেখতে চায়। ভারতে সংবিধানে ওই ধর্মনিরপেক্ষ বলে একটা শব্দ ঢোকানো হয়েছে বলেই তাদের এত বাড়বাড়ন্ত। মরার পরে এরা নরকেও জায়গা পাবে না, কিন্তু সে তো পরের কথা। ইহলোকে এদেরকেও নিজেদের দলে টানা দরকার। এরা সবাই বিজ্ঞানে বিশ্বাস করে – সুতরাং এদেরকে বিজ্ঞান দিয়েই বোঝাতে হবে।

বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে পরিচিত নামদের মধ্যে একটি হল মার্কিন মহাকাশ গবেষনা সংস্থা নাসা অর্থাৎ ন্যাশনাল এরোনটিকস এণ্ড স্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন। সুতরাং তার দোহাই দেওয়াই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। খবর নিয়ে দেখা গেল মহাকাশ থেকে তোলা ছবিতে নাসা দেখিয়েছে যে ভারত ও শ্রীলঙ্কার মধ্যে একটি সেতুর মত ভূমিরূপ আছে। ব্যাস, আর তো কোনো তথ্যের দরকার নেই। এটা বলার দরকার নেই যে নাসা একই সঙ্গে এও বলেছিল যে এই ভূমিরূপ প্রাকৃতিক, প্রবাল দ্বীপমালার মতো তার গঠন। আরএসএস- বিজেপির কর্মকর্তারা বরঞ্চ বললেন কার্বন ডেটিং করে নাসা দেখেছে যে রামসেতুর বয়স সাড়ে সতেরো লক্ষ বছর। তাদের হিসাবে রামকথাও ঐ রকম প্রাচীন। কার্বন ডেটিং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি, তার উপর কথা চলে না। সুতরাং দুয়ে দুয়ে চার; রাম ঐতিহাসিক পুরুষ, রামায়ণ সত্য, রামসেতু তার প্রমাণ। হিন্দু ধর্মের প্রাচীনত্বের পক্ষে এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কী চাই? সেতুসমুদ্রম প্রকল্প বন্ধ হল। আজও তা চালু হয়নি।

সমুদ্রের জলে শিলা ভাসা বা বানর সেনার কথা কবির কল্পনা বলে মেনে নিলেও অন্তত চারটি আলাদা আলাদা বিজ্ঞান শ্রীলঙ্কা ও ভারতের মধ্যে মানুষের তৈরি কৃত্রিম সেতুর ধারণার বিরোধিতা করে। প্রথম কথাটা আগেই বলেছি, ভূবিদ্যা থেকে সহজেই দেখা যায় সেতুর ভূমিরূপ প্রাকৃতিক, কৃত্রিম নয়। বিবর্তন তত্ত্ব বলে আধুনিক মানুষের বয়স এক থেকে দুই লক্ষ বছর। সাড়ে সতের লক্ষ বছর আগে মানুষের যে পূর্বপুরুষরা জীবিত ছিল, তারা হোমো গণে পড়ে না। (শ্রীলঙ্কাতে মানুষ প্রথম গিয়েছিল সম্ভবত শেষ তুষার যুগের সময়, মোটামুটি কুড়ি থেকে তিরিশ হাজার বছর আগে, যখন সমুদ্রের জল অনেক নীচে ছিল। তখন সত্যিই ঐ সেতু দিয়ে হেঁটে সমুদ্র পার হওয়া যেত।) রামায়ণে লঙ্কা বা অযোধ্যার বর্ণনা থেকে দেখা যায় তারা বেশ বড় নগর। কৃষিকাজ আবিষ্কারের আগে নগর সভ্যতা সম্ভব নয়। তুষার যুগ কেটে না গেলে চাষ করা একেবারেই অসম্ভব ছিল। সর্বশেষ তুষার যুগ আজ থেকে মোটামুটি দশ থেকে বারো হাজার বছর আগে শেষ হয় — তার পরেই কৃষিকাজ আবিষ্কার হয়। তাই নৃতাত্ত্বিকভাবেই রামায়ণের কাহিনির কালকে তার আগে ফেলা যাবে না।

কিন্তু এ সমস্তই হল শেষ পর্যন্ত অনুমান, রামসেতুর ঐতিহাসিকতার সমর্থকরা বলতেই পারেন যে কার্বন ডেটিং বলে দিয়েছে সেতুর বয়স সাড়ে সতের লক্ষ বছর, কাজেই বিবর্তন তত্ত্ব বা নৃতত্ত্বের কালের হিসাবটাই আসলে ভুল। দেখা যাক কার্বন ডেটিং ব্যাপারটা কী। বিজ্ঞানীর ভাষায় কার্বনের দুটি আইসোটোপ আছে। ভরসংখ্যা দিয়ে তাদের আমরা লিখি কার্বন-১২ ও কার্বন-১৪। কার্বন-১৪ চিরস্থায়ী নয়, সে আস্তে আস্তে ভাঙতে থাকে। কাজেই কোনো বস্তুতে কতটা কার্বন-১২ ও কতটা কার্বন-১৪ আছে তা জানলে তার বয়স জানা যায়। এ পর্যন্ত কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু যুক্তিটাকে জোরালো করতে গিয়ে নাসার নাম করাটা গণ্ডগোল করে দিল। মহাকাশ থেকে পৃথিবীতে কোনো কিছুর মধ্যে কত পরিমাণ কার্বন-১৪ আছে তা মাপার কোনো উপায় নেই। রামেশ্বর সেতুবন্ধে দাঁড়িয়ে না মেপে মহাকাশ থেকে মাপলে বেশি সঠিক মাপ পাওয়া সম্ভব? দ্বিতীয়ত কার্বন ডেটিং পদ্ধতিতে খুব বেশি হলে এক লক্ষ বছরের পুরানো বস্তুর বয়স মাপা সম্ভব, সাড়ে সতের লক্ষ বছরের কথা আকাশকুসুম কল্পনা। পাথরের কার্বন ডেটিং করাও সম্ভব নয়, একমাত্র মৃত জীবদেহের ক্ষেত্রেই সেটা সম্ভব।

রামের তৈরি সেতুর কথা যারা বলছে, সেই আরএসএস-বিজেপি-হিন্দু মহাসভার লোকজন কেউই বিজ্ঞান জানে না তা নয়। জেনে বুঝেই তারা মানুষকে বিভ্রান্ত করার পথ বেছে নিয়েছে। তাদের নানা অবাস্তব দাবীর সমর্থনে বিজ্ঞানের দোহাই দিচ্ছে। একেই আমরা অপবিজ্ঞান বলে থাকি।

তবে বিজ্ঞানের দোহাই দেওয়া শুধুমাত্র হিন্দুত্ববাদীদের একচেটিয়া এ কথা ভাবলে ভুল হবে। বিজ্ঞানকে এইরকম ভাবে ব্যবহার শুধু ধর্মীয় মৌলবাদীরাই করেছে, বিষয়টা এমনও নয়। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখতে পাই নিজেদের মত প্রতিষ্ঠার জন্য কায়েমি স্বার্থ নানা যুগে নানা ভাবে বিজ্ঞানের ভুল ব্যাখ্যা দিয়েছে বা তথ্য বিকৃতি ঘটিয়েছে। বিজ্ঞানীরাও জ্ঞানে বা অজ্ঞানে তার সহায়ক হয়েছেন। তারই দুটি উদাহরণ দেখা যাক। দুটি অবশ্য পরষ্পরের সঙ্গে সংযুক্ত – প্রথমটি হল জাতিবাদ ও দ্বিতীয়টি হল সামাজিক ডারউইনবাদ। আমরা দেখব যে এই দুইকেই বিজ্ঞানের মোড়কে চালানোর চেষ্টা করা হলেও প্রকৃতপক্ষে এরিক হবসবমের বক্তব্যই সত্য, ‘Social Darwinism and racist anthropology or biology belong not to the science of the nineteenth century but its politics.’

ঊনবিংশ শতাব্দির শেষ দিকে জাতি বিষয়ক ধারণা পৃথিবীর রাজনীতি-সমাজনীতি-অর্থনীতিতে একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। (এই লেখায় জাতি শব্দটা ইংরাজি race শব্দের অনুবাদ।) সে সময় জাতিগত পার্থক্য নির্ধারণের জন্য জিন পরিমাপের কোনো উপায় ছিল না, স্বাভাবিক ভাবেই অন্য নানা পদ্ধতি অবলম্বন করতে হত। তার মধ্যে ছিল মস্তিষ্কের আয়তন মাপ, মাথার খুলির আকার বিচার, অন্যান্য শারীরিক অঙ্গের মাপ, ইত্যাদি। পরবর্তীকালে তার সঙ্গে যোগ করা হয়েছিল তথাকথিত বুদ্ধিবৃত্তি বা আই কিউ। এই সমস্ত মাপ থেকে বিজ্ঞানীরা কী সিদ্ধান্তে পৌঁছোলেন?

আমেরিকার সমস্ত গবেষণা থেকেই দেখা গেল কৃষ্ণাঙ্গরা শ্বেতাঙ্গদের থেকে অনেক আলাদা, তাদের সঙ্গে বনমানুষের মিল বরঞ্চ বেশি। কৃষ্ণাঙ্গ, রেড ইণ্ডিয়ান ও মহিলাদের মস্তিষ্কের গড় আয়তন শ্বেতাঙ্গ পুরুষদের থেকে কম। একথা নিশ্চয় বলতে হবে না যে গবেষণা যাঁরা করছিলেন সেই বিজ্ঞানীরা সবাই ছিলেন শ্বেতাঙ্গ পুরুষ। ফরাসি বিজ্ঞানীরা দেখলেন ফরাসিদের মস্তিষ্কের গড় আয়তন ইউরোপে সবচেয়ে বেশি। জার্মানরা জার্মানদের জিতিয়ে দিলেন। ইউরোপ ও আমেরিকার বিজ্ঞানীরা সবাই দেখলেন যে এশীয়রা এ ব্যাপারে ইউরোপ-আমেরিকার শ্বেতাঙ্গদের থেকে অনেকটা পিছিয়ে আছে। আমেরিকাতে আই কিউ বিচার করে দেখা গেল সবচেয়ে আগে থাকবে ইংল্যাণ্ড-ফ্রান্স-জার্মানি অর্থাৎ উত্তর ইউরোপের শ্বেতাঙ্গরা। বোঝাই যায় সে সময় আমেরিকার সমাজের উচ্চ অংশে এঁদের দাপটই ছিল বেশি। তারপরের দুটি স্থান নেবে যথাক্রমে দক্ষিণ ও পূর্ব ইউরোপের শ্বেতাঙ্গরা। সবশেষে আসবে কৃষ্ণাঙ্গরা। স্পষ্টতই তাহলে কৃষ্ণাঙ্গরা, এশীয়রা ও শ্বেতাঙ্গরা পৃথক জাতি। জাতিগত পার্থক্যের প্রথম দিকের উৎসাহী সমর্থকরা তো তাদের আলাদা প্রজাতিতে (অর্থাৎ জীববিদ্যার ভাষায় species) ফেলার চেষ্টাও করেছিলেন। শ্বেতাঙ্গদের মধ্যেও আবার নানা ভাগ আছে। আধুনিক গবেষণা কি এই ধরনের জাতিগত পার্থক্যকে সমর্থন করবে?

বর্তমানে এই ধরণের অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড়ো সহায় হল জিনবিদ্যা বা জেনেটিক্স। জিন সম্পর্কে অধিকাংশ খবর আমরা জানতে পেরেছি মোটামুটিই গত কয়েক দশকে। জিনবিদ্যা দেখিয়ে দিয়েছে আধুনিক মানুষ সবাই একই উপপ্রজাতি (subspecies) হোমো সেপিয়েন্স সেপিয়েন্সের মধ্যে পড়ে। আধুনিক গবেষণা থেকে আরও দেখা যায় মানুষে মানুষে জিনগত প্রভেদ অন্যান্য প্রায় সমস্ত স্তন্যপায়ী প্রজাতির তুলনায় কম। পৃথিবীর যে কোনো দু জন মানুষকে বেছে নিন — নিউজিল্যাণ্ডের মাওরি উপজাতির একজন মানুষ, আন্দামানের একজন জারোয়া, আফ্রিকার একজন হটেনটট বা একজন নর্ডিক জার্মান, যাকে আপনা্র খুশি -– তাদের মধ্যে জিনগত প্রভেদ সর্বোচ্চ যতটা হতে পারে, মধ্য আফ্রিকার প্যান ট্রোগ্লোডাইটস ট্রোগ্লোডাইটস উপপ্রজাতির দুটি শিম্পাঞ্জির মধ্যে জিনের বিচারে তফাত তার চেয়ে বেশি হওয়া সম্ভব। অথচ পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যা এখন সাড়ে সাতশো কোটি আর ঐ বিশেষ প্রজাতির শিম্পাঞ্জি সম্ভবত পঞ্চাশ হাজারের বেশি বেঁচে নেই। আরও ইন্টারেস্টিং হল দুটি তথাকথিত জাতির মধ্যে জিনের গড় পার্থক্যের পরিমাণ কম, একই জাতির দুটি ব্যক্তির মধ্যে পার্থক্য তার থেকে বেশি হতেই পারে। ধরুন বাঙালী আর ইংরেজ এই দুই ধরনের মানুষের মধ্যে জিনের যতটা তফাত গড়ে হতে পারে, শুধু দুজন বাঙালী বা শুধু দুজন ইংরেযের মধ্যে তার চেয়ে বেশি জিনের পার্থক্য হতে পারে। তার মানে হল জিনগত বিচারে জাতি কথাটার কোনো অস্তিত্ব নেই, বাঙালী বা ইংরাজ জাতি বলে কিছু হতে পারে না।

জিন সম্পর্কে ধারণা না থাকার জন্য পুরানো মোটা দাগের পরিমাপ, যাদের কথা আগে লিখেছি, তাদের মধ্যে অনেক ভুল ছিল। বিজ্ঞানে সেটা দোষের কথা নয়, সে সময় যে পদ্ধতি জানা ছিল, তা নিয়েই তো কাজ করতে হবে। কিন্তু ভাবতে আশ্চর্য লাগে যে বিভিন্ন রকম ভুল থাকা সত্ত্বেও সমস্ত পুরানো হিসাবই পরিষ্কার জাতিতে জাতিতে পার্থক্য দেখতে পেল প্রকৃতপক্ষে যার কোনো অস্তিত্ব নেই! জাতি কথাটারই যখন কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই, তখন বিভিন্ন জাতির মানুষের মধ্যে মস্তিষ্কের আকার, আয়তন, দেহের গঠনে পার্থক্য যাঁরা খুঁজে পেয়েছেন তাঁদের গবেষণা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। তাঁদের দেওয়া তথ্য পরবর্তীকালে উৎসাহীরা বিশ্লেষণ করেছেন। সমস্ত ক্ষেত্রেই দেখা গেছে সেই সমস্ত তথ্য থেকেই তাঁদের সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। তথ্য বিকৃতি, সুবিধামত তথ্য বেছে নেয়া, কখনো বা স্রেফ জালিয়াতি – নানা রকম অনৈতিক পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়েছে। কখনো কখনো বিজ্ঞানী নিজেকেই ঠকিয়েছেন। এ সমস্তই হয়েছে তার কারণ সচেতন বা অচেতন ভাবে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত ছিলেন যে তাঁরা যে গোষ্ঠীর মানুষ, তারাই জাতিগত বিচারে শ্রেষ্ঠ। তাঁরা সবাই ছিলেন পুরুষ, তাঁরা এও জানতেন যে পুরুষরা নারীদের থেকে উন্নত। তাই তাঁদের গবেষণার সিদ্ধান্ত আগে থেকেই তাঁরা জানতেন – সেখানে পৌঁছোনোর জন্য গবেষণাকে প্রয়োজন মতোই তাঁরা চালনা করেছিলেন। আজ যদি কোনো ধরণের পরীক্ষাতে দেখা যায় এক বিশেষ গোষ্ঠীর মানুষেরা অন্যদের থেকে খারাপ করছে, তাহলে প্রথমেই কি আমরা ধরে নেব তারা জাতি বা জিনগতভাবে খারাপ? বরঞ্চ আমাদের দেখা প্রয়োজন সেই বিশেষ গোষ্ঠীর মানুষজনের সামাজিক-অর্থনৈতিক পরিবেশ সাধারণ ভাবে অন্যদের থেকে আলাদা কিনা। ঊনবিংশ শতকের শেষে বা বিংশ শতকের গোড়ায় কিন্তু এই প্রশ্ন তোলা হয় নি। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, আমেরিকাতে বিংশ শতাব্দির প্রথম ভাগে বুদ্ধিবৃত্তি বা আই কিউ মাপার যে পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়েছিল তা স্পষ্টতই দরিদ্র, অশিক্ষিত, আমেরিকাতে সদ্য আগত অভিবাসী বা প্রথম প্রজন্মের শিক্ষিতদের বিরুদ্ধে যাচ্ছিল। দুঃখের কথা হল শুধুমাত্র বিংশ শতকের আমেরিকা নয়, আজও আমাদের দেশ সহ আরও নানা দেশে এই রকম ত্রুটিপূর্ণ বিচারের মাধ্যমেই মানুষের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা হচ্ছে।

বর্তমান বিচারে জাতি কথাটা অর্থহীন হলেও এ বিষয়ে ঊনবিংশ শতকের ইঊরোপীয়-আমেরিকানদের মধ্যে এত বেশি উৎসাহের কারণটা সহজেই আমরা বুঝতে পারি। এশিয়া আফ্রিকা বা অন্যান্য মহাদেশের মানুষের উপর ঔপনিবেশিক শাসন বা আমেরিকা-অস্ট্রেলিয়ার আদিম অধিবাসীদের প্রায় সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ণ করার সমর্থনে যুক্তি হিসাবে শ্বেতাঙ্গদের তথাকথিত জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বকে ব্যবহার করা যেতে পারে। আরও একটা সুপরিচিত উদাহরণ দেখা যাক। যখন ম্যাক্সমুলারের মতো জার্মান ভাষাতত্ত্ববিদদের গবেষণার সুবাদে আর্য কথাটা জনপ্রিয় হয়েছে, তখন হঠাৎ করে ফরাসি, জার্মান, ইংরাজ, ভারতীয় – সবাই দাবি করতে শুরু করল তাদের দেহেই আর্য জাতির রক্ত সবচেয়ে বিশুদ্ধ ভাবে বইছে। আর্যদের আদি বাসস্থান কোথায় তা নিয়ে লাঠালাঠি শুরু হয়ে গেল। আর্য জাতির শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কিত হিটলারের কল্পনা বন্দীশিবিরে (খেয়াল রাখবেন, যুদ্ধে নয়) ষাট লক্ষ ইহুদি, তিরিশ লক্ষ রাশিয়ান, পাঁচ লক্ষ জিপসির প্রাণ কেড়ে নিল। আজও আমাদের দেশে এক শ্রেণির ঐতিহাসিক মহেঞ্জোদড়ো থেকে শুরু করে বৈদিক ভারতীয় সভ্যতা পুরোটাই আর্যদের তৈরি তা দেখানোর জন্য সাক্ষ্যপ্রমাণ জাল করতে পিছপা হচ্ছেন না। সিন্ধু সভ্যতাতে ঘোড়ার চিহ্ণ পাওয়া না গেলেও সম্প্রতি একটি চলচ্চিত্রে পরিচালক মহেঞ্জোদড়োতে ঘোড়া এনে হাজির করেছেন। এ ব্যাপারে তিনি মহাজনের পদাঙ্কই অনুসরণ করেছেন। অনেক ঐতিহাসিকই নানাভাবে হরপ্পা-মহেঞ্জোদড়োতে ঘোড়ার অস্তিত্ব প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন, কারণ ঘোড়ার ব্যবহার ও আর্য জাতি প্রায় সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

হিটলারের কাছাকাছি না পৌঁছোলেও জাতি বিষয়ে একই রকম মতামত কিন্তু আরও অনেকেই পোষণ করতেন। নিজেদেরকে আর্য জাতির বংশধর প্রমাণ করার এই উদগ্র বাসনার কারণ কী? সিন্ধু সভ্যতা তো ভারতের ইতিহাসেরই অঙ্গ, তা আর্যদের তৈরি প্রমাণ করলে তো ভারতের ইতিহাসের প্রাচীনত্ব বাড়বে না। আসলে আর্য জাতিকে কল্পনার সঙ্গে সঙ্গে এও কল্পনা করা হয়েছে তারা হল বিজেতাদের জাতি, অন্যান্য জাতিদের পদানত করে তারা তাদের প্রভুত্ব বিস্তার করেছে। যে সময় আর্য কথাটা চালু হয়, সে সময় সারা পৃথিবী শাসন করত ইউরোপীয়রা। ইংরাজি, ফরাসি, জার্মান, গ্রিক, লাতিন – এই সমস্ত ভাষাভাষীরাই বিভিন্ন সময় অন্য জাতিদের পদানত করেছ। এই সব ভাষাগুলিই আর্যদের ভাষা থেকে উদ্ভূত। সুতরাং আর্য যে বিজেতাদের ভাষা তা নিয়ে আর সন্দেহ কী? তাই আর্যদের বংশধররাই বাকি পৃথিবীকে শাসনের অধিকারী। ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণের পক্ষে এটা একটা বড় যুক্তি হয়ে দাঁড়ালো। ভারতে অবশ্য আর্য জাতির প্রতি আকর্ষণের প্রথম দিকের কারণ সামান্য পৃথক। ইংরাজরা নিজেদের আর্য বংশজাত বলে দাবি করেছিল। সংস্কৃত ভাষা আর্য ভাষা ত বটেই, তাই ভারতীয়রাও আর্য। বিজেতা জাতির সঙ্গে আত্মীয়তা প্রমাণ বিজিত জাতির পক্ষে আত্মসম্মান প্রতিষ্ঠার এক সহজ উপায় হয়ে দাঁড়ালো। রবীন্দ্রনাথ ব্যঙ্গ করে লিখেছিলেন, ‘মোক্ষমূলর বলেছে, ‘আর্য’,/ সেই শুনে সব ছেড়েছি কার্য, / মোরা বড়ো বলে করেছি ধার্য, / আরামে পড়েছি শুয়ে।’

জার্মান পণ্ডিতদের গবেষণার কথা বলে শরীরে আর্য রক্ত প্রমাণ করাটা খুব জরুরি হয়ে পড়েছিল। তাই সহজেই ভুলে যাওয়া সম্ভব হল যে আর্য কথাটা প্রথম ব্যবহার করছিলেন ভাষাতত্ত্ববিদরা, নৃতাত্ত্বিকরা নন। তাঁরা আর্য বলতে একটা ভাষাগোষ্ঠীকে বুঝেছিলেন, জাতিকে নয়। আর্য শব্দের সঙ্গে জাতি কথাটা এবং হিটলারের গণহত্যা এতটাই জড়িয়ে গেছে যে তাই আজকের দিনে বাধ্য হয়েই পণ্ডিত মহলে ঐ শব্দটার বদলে প্রায় সব সময়েই ইন্দো-ইউরোপীয় বা ইন্দো-ইরানীয় এই ধরনের শব্দগুলো ব্যবহার করতে হচ্ছে। আগেই বলেছি জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের নামে তিরিশ লক্ষ রাশিয়ান ভাষাভাষী ও পাঁচ লক্ষ জিপসিকে হত্যা করিয়েছিলেন জার্মানির শাসক হিটলার। রাশিয়ান ভাষা এবং জিপসিদের ভাষা রোমানি, দুইই কিন্তু জার্মান ভাষার মতোই ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। জার্মানরা আর্য জাতির বংশধর হলে রাশিয়ান ও জিপসিরাও তাই।

আধুনিক যুগের সবচেয়ে প্রভাবশালী মতবাদের একটা হল নয়া উদারনীতিবাদ। ঊনবিংশ শতকের শেষ ভাগের অবাধ বাণিজ্য ও মুক্ত বাজার ভিত্তিক ধনতন্ত্রই আবার নয়া উদারনীতিবাদ হিসাবে ফিরে এসেছে। এই অবাধ ধনতন্ত্র ছিল বাজারের উপর যে কোনো রকম হস্তক্ষেপের বিরোধী। বিজ্ঞানের সে সময়কার সবচেয়ে বেশি আলোচিত তত্ত্ব হয়েছিল তার আত্মপক্ষ সমর্থনের হাতিয়ার। ডারউইনের বিবর্তন তত্ত্ব সবে তখন খ্রিস্টধর্মের সঙ্গে লড়াইয়ে নেমেছে। সেই সংগ্রামে জয়ী হওয়ার আগে থেকেই তাকে অবাধ ধনতন্ত্রের সমর্থনে ব্যবহার করা শুরু হয়েছিল। সেই মতবাদের নাম হল সামাজিক ডারউইনবাদ (Social Darwinism)। ডারউইনের সময়ের সবচেয়ে প্রভাবশালী দার্শনিক হারবার্ট স্পেনসার সামাজিক ক্ষেত্রে ডারউইনবাদের প্রথম প্রয়োগ করে এই তত্ত্ব আমদানি করেন। আমরা দেখব যে আপাতদৃষ্টিতে ডারউইনের মতাবলম্বী হলেও প্রকৃতপক্ষে এই মতবাদের সঙ্গে ডারউইনের বিখ্যাত বিবর্তন তত্ত্বের কোনো সম্পর্ক নেই।

খুব সহজ কথায় সংক্ষেপে যদি সামাজিক ডারউইনবাদকে ব্যাখ্যা করতে গেলে বলা যায় যে এই মতবাদ অনুযায়ী সমাজ আভ্যন্তরীণ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্যে এগোচ্ছে। এই সংগ্রামে অবশ্যই সমাজের দুর্বলতর শ্রেণিকে কষ্টভোগ করতে হবে, কারণ তারা অযোগ্য। একমাত্র যোগ্যরাই সেই সংগ্রামে টিকে থাকতে পারবে। এভাবে সমাজে ভালো গুণের পরিমাণ বাড়বে এবং খারাপ দিকগুলি আস্তে আস্তে সমাজ থেকে বিলুপ্ত হবে। স্পষ্ট ভাষায় বললে এমন গুণগুলি যা ঐ সংগ্রামে টিকে থাকতে সাহায্য করে, সেগুলিই সমাজে প্রচলিত হবে। এর ফলে সমাজ উন্নত হবে। সমাজের উন্নতির স্বার্থে দুর্বলদের এই কষ্ট সহ্য করতেই হবে। তার কারণ সেই কষ্ট দূর করার যে কোনো রকম প্রচেষ্টা, তা সে রাষ্ট্রীয় স্তরেই হোক বা ব্যক্তিগত স্তরে, তা সমাজের প্রগতিকে ব্যাহত করে শেষ বিচারে সমাজের ক্ষতিই করবে।

স্পেনসারের তত্ত্ব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিশেষ সমাদর লাভ করে। শিল্পপতি জন ডি রকফেলার বললেন, ‘The growth of large business is merely a survival of the fittest. … The American Beauty rose can be produced in the splendor and fragrance … only by sacrificing the early buds which grow up around it. This is not an evil tendency in business. It is merely the working-out of a law of nature and a law of God.’ অর্থাৎ যোগ্যতমের উদবর্তন প্রকৃতির ও ঈশ্বরের নিয়ম। অপর এক বিখ্যাত শিল্পপতি আণ্ড্রু কার্নেগির ভাষায়, ‘And while the law of competition may be sometimes hard for the individual, it is best for the race, because it ensures the survival of the fittest in every department’. বাকিদের যা হয় হোক, যোগ্যতম বেঁচে থাকুক, তাতে করে জাতির উন্নতি হবে। আশ্চর্য নয় যে ঊনবিংশ শতকের শেষে আমেরিকান বৃহৎ শিল্পপতিরা অধিকাংশই ব্যাবসাতে এতটাই অনৈতিক পথ নিতেন যে তাঁরা Robber Baron নামে পরিচিত হয়েছিলেন। হবসবম কার্নেগি, রকফেলার বা তাঁদের মতো মার্কিন শিল্পপতিদের সম্পর্কে লিখছেন, ‘None had noticeable scruples, or could afford to have in an economy or an age where fraud, bribery, slander and if necessary guns were normal aspects of competition.’ তাঁদের সমর্থনে বিজ্ঞানকে ব্যবহার করেছিল সামাজিক ডারউইনবাদ।

দুজন শিল্পপতিই Survival of the fittest কথাটা বলেছেন। ডারউইনবাদে একটা মূল কথা হল প্রাকৃতিক নির্বাচন বা Natural selection. কিছুদিন ডারউইন তার সঙ্গে একই অর্থে যোগ্যতমের উদবর্তন বা Survival of the fittest বাক্যবন্ধটি ব্যবহার করেছিলেন। এঁর অর্থ যোগ্যতম জীবই বেঁচে থাকে ও বংশ বিস্তার করে। কথাটা ডারউইন নিজে তৈরি করেন নি, হারবার্ট স্পেনসারের লেখা থেকে নিয়েছিলেন। ডারউইনের লেখা থেকে যোগ্যতমের উদবর্তন সম্পর্কে তাঁর ধারণা পরিষ্কার বোঝা যায়। কিন্তু তাঁর এই শব্দচয়ন পরবর্তীকালে অনেক সমস্যার জন্ম দিয়েছিল। ডারউইন নিজেও এই বিশেষ পরিভাষাটি যে ভুল তা কিছুদিন পরে বুঝতে পেরেছিলেন। কিন্তু ততদিনে যা ক্ষতি হওয়ার হয়ে গেছে, স্পেনসারের সামাজিক অগ্রগতির তত্ত্বের সমর্থনে জীববিদ্যার সবচেয়ে বিখাত তত্ত্বের সিলমোহর পড়ে গেছে। অথচ সঠিক বিচারে সামাজিক ডারউইনবাদের সঙ্গে ডারউইনের তত্ত্বের কোনো সম্পর্ক নেই। স্পেনসার নিজে জীববিদ্যাতে প্রাকৃতিক নির্বাচনের ডারউইনিয় তত্ত্বে বিশ্বাস করতেন না।

ডারউইনের তত্ত্বের অপর এক স্তম্ভ হল অস্তিত্বের সংগ্রাম বা Struggle for existence। এই ধারণাটা (এবং এই বাক্যবন্ধ) ডারউইন নিয়েছিলেন টমাস ম্যালথাসের লেখা থেকে। ম্যালথাসও সমাজতাত্ত্বিক, জীববিজ্ঞানী নন। তিনি দেখাতে চেয়েছিলেন সমাজে দারিদ্র অপরিহার্য, অভাব ও দুঃখকষ্টকে এড়ানো সম্ভব নয়। সুতরাং সমাজ বা রাষ্ট্রের এ বিষয়ে কোনো দায়িত্ব নেই। অস্তিত্বের সংগ্রাম ও যোগ্যতমের উদবর্তন, এই দুই বাক্যবন্ধ সমাজবিজ্ঞানে প্রয়োগের অর্থ দাঁড়ালো একমাত্র যোগ্যরাই জীবনসংগ্রামে জয়লাভ করে। সংগ্রামের ভিতর দিয়ে সমাজ ক্রমশ উন্নতির দিকে যাচ্ছে। সুতরাং জীবনসংগ্রাম প্রগতির অপরিহার্য অঙ্গ, তাতে রাষ্ট্র বা সমাজের হস্তক্ষেপ অনুচিত। এভাবেই সামাজিক ডারউইনবাদের জন্ম হল।

একটু বিচার করলেই বোঝা যায় স্পেনসারের সমর্থনে ডারউইনের তত্ত্বকে বিকৃত করা হয়েছিল। এমনিতেই যোগ্যতমের উদবর্তন বাক্যবন্ধটা খুব সুবিধার নয়। যোগ্যতা মাপা হবে কিসের ভিত্তিতে? বেঁচে থাকাই যোগ্যতার প্রমাণ। আবার যোগ্যরাই বেঁচে থাকে। অর্থাৎ একটু অসতর্ক হলেই আমরা সারকুলার আর্গুমেন্ট বা চক্রাকার যুক্তির চক্করে পড়ে যেতে পারি। জীববিজ্ঞানে তাই বলা হয় যে জীব যত বেশি বংশধর রেখে যেতে পারবে সে তত যোগ্য। রকফেলারের বর্ণিত বৃহৎ ব্যবসার বিকাশকে এই মাপকাঠিতে সারভাইভাল বলা সম্ভব নয়। জীববিজ্ঞানী লামার্ক বলেছিলেন কোনো জীব তার জীবিতকালে অর্জিত বৈশিষ্ট্য তার বংশধরদের মধ্যে দিয়ে যেতে পারে। স্পেন্সার এই ভ্রান্ত তত্ত্বে বিশ্বাস করতেন। ডারউইনের তত্ত্বে যে পরিব্যক্তি বা মিউটেশনের দরকার হয়, লামার্কের তত্ত্বে তার প্রয়োজন নেই। সামাজিক ক্ষেত্রে পরিব্যক্তির কোনো অর্থ নেই, তাই সেখানে লামার্কের তত্ত্ব অনুসরণ করাটাই সুবিধাজনক। এই সমস্ত বিভ্রান্তি সামাজিক ক্ষেত্রে প্রযুক্ত হয়ে জন্ম দিল সামাজিক ডারউইনবাদের। ছলে বলে কৌশলে সারভাইভাল হয়ে দাঁড়ালো একমাত্র মাপকাঠি।

অস্তিত্বের সংগ্রামও বিকৃতর্থে ব্যবহৃত হতে থাকল। ডারইনের তত্ত্বের অস্তিত্বের সংগ্রাম মানেই কিন্তু অপর সকলের বিলোপ নয়। হিটলারও তাঁর জাতিতত্ত্বের পিছনে ডারউইনের বিবর্তনবাদের দোহাই দিয়েছিলেন। নাৎসিদের নীতির পিছনে সামাজিক ডারউইনবাদের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। তাদের কাছে অস্তিত্বের সংগ্রামের অর্থ হয়ে দাঁড়াল অপর সকলকে হত্যা। প্রকৃতিতে একই প্রজাতির জীব পরষ্পরকে হত্যা করার উদাহরণ খুব কম– হিটলারের জার্মানিতে তাই হয়ে দঁড়ালো অস্তিত্বের সংগ্রামের মূল কথা।

হিটলার যে পথ অনুসরণ করেছিলেন, মার্কিন শিল্পপতিরা নিশ্চয় সে পথ নেন নি। কিন্তু পদ্ধতি-প্রকরণের কথা বাদ দিয়ে ভাবলে দেখব হিটলার যা মনে করতেন, উপরে উদ্ধৃত কার্নেগির বক্তব্যেও সেই কথাই উঠে এসেছে – সংগ্রামের মাধ্যমে জাতি বা রেসের উন্নতি। স্পেনসার বা তাঁর অনুসারী সামাজিক ডারউইনবাদীরাও অনেকটা এরকম কথাই মনে করতেন। হিটলার ভেবেছিলেন আর্য জার্মান জাতি বিবর্তনের ফলে শেষ পর্যন্ত জার্মান দার্শনিক নিৎশের কল্পিত সুপারম্যান স্তরে উন্নত হবে। বিবর্তন তত্ত্বে প্রগতির বিষয়টা জটিল ও তর্কসাপেক্ষ। কিন্তু নিশ্চিতভাবে বলা যায় প্রাকৃতিক বিবর্তন প্রক্রিয়া কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য সামনে রেখে অগ্রসর হয় না। আমাদের মনে হতেই পারে মানুষ হল বিবর্তন প্রক্রিয়ার শ্রেষ্ঠ ফসল, কিন্তু সেটা একান্তই আমাদের মানুষকেন্দ্রিক চিন্তার ফল। বিবর্তনের ফলে সমস্ত জীব তার নিজস্ব পরিবেশে অভিযোজিত হয়ে অর্থাৎ মানিয়ে নিয়ে বেঁচে থাকে, সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটলে তারও পরিবর্তন হয়। আমার পাশের দেওয়ালের টিকটিকি ও আমি একই বিবর্তন প্রক্রিয়ার ফল, আমাদের দুজনের পিছনে একই দৈর্ঘ্যের বিবর্তনের ইতিহাস আছে। আমি এই লেখাটা লিখতে পারি বলে আমি যদি নিজেকে উন্নত মনে করি, তাহলে দেয়ালে হেঁটে পোকা ধরে খেতে পারে বলে নিজেকে উন্নত মনে করার সমান অধিকার টিকটিকিটার আছে। যোগ্যতমের উদবর্তন শ্রেষ্ঠ জাতির জন্ম দেয়, এই মত প্রতিষ্ঠা করতে, বুঝে বা না বুঝে, ডারউইনের দোহাই দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই ধারণা আদৌ ডারউইনের তত্ত্বের অনুসারী নয়।

স্পেনসার বিশ্বাস করতেন বিচার ব্যবস্থা ছাড়া রাষ্ট্রের আর কোনো কর্তব্য নেই। সরকারী খরচে শিক্ষা, স্বাস্থ্যব্যবস্থা চালানোর তিনি বিরোধী ছিলেন। ঊনবিংশ শতকের শেষ দিকে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট নানা কল্যাণকামী সরকারী সিদ্ধান্ত বাতিল করে দেয়। ঘোষিতভাবেই স্পেনসারপন্থী বিচারকদের মনে হয়েছিল সেই সিদ্ধান্তগুলো সবলদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে দুর্বলদের পক্ষে হস্তক্ষেপ করছে, সামাজিক ডারউইনবাদের বিরোধী সেই সমস্ত সিদ্ধান্ত প্রকৃতপক্ষে মানবজাতিকে দুর্বল করবে। এই বিপুল প্রভাব-প্রতিপত্তির মূলে ছিল ডারউইনের বিবর্তনবাদের সঙ্গে তার বাহ্যিক সম্পর্ক। মজার কথা হল জীববিদ্যাতে ডারউইনের মতের বিরোধিতা সবচেয়ে বেশি যে দেশ থেকে এসেছিল, সেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই আবার সামাজিক ডারউইনবাদকে আঁকড়ে ধরেছিল। সাম্রাজ্যবাদী, ঔপনিবেশিক এবং জাতিবাদী নীতির পক্ষে দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক যুক্তি সাজিয়েছিল সামাজিক ডারউইনবাদ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসিরা তাদের বর্বরতার সমর্থনে তাকে ব্যবহার করছিল, হিটলারের পরাজয়ের পরে তাই সারা বিশ্বে সে ধিক্কৃত হয়েছিল। আমরা দেখলাম বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক ডারউইনবাদের মূল ভিত্তিও ভুল প্রমাণিত হয়েছে। আজ আবার সে নব রূপে এসে হাজির। নয়া উদারনীতিবাদের মূল নীতিগুলির সঙ্গে তার কোনো পার্থক্য আমার চোখে অন্তত পড়ে না।

বিজ্ঞানের এই অপব্যবহারের প্রাথমিক দায় নিশ্চয় তাদের যারা এই কুযুক্তি সাজাচ্ছে। বিজ্ঞানীরাও কখনো কখনো ভুলে যান বৈজ্ঞানিক দর্শনের একটা মূল কথা হল যুক্তি ও পরীক্ষানিরীক্ষার আলোকে সমস্ত কিছুর বিচার — বিজ্ঞানের নিজের ক্ষেত্রেও সেটা সমান সত্য। জাতিবাদের সমর্থনে এ ধরনের ঘটনাই ঘটেছিল। কিন্তু শুধুমাত্র এদের দোষ দিলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। সাধারণ মানুষ প্রায়শই দুর্বোধ্য বলে বিজ্ঞানকে সরিয়ে রেখে দেন। বিজ্ঞানীরাও অনেকেই তাঁদের গবেষণা যে কত দুর্বোধ্য তা বলতে গর্ববোধ করেন। একথা নিশ্চয় ঠিক যে অনেক গবেষণার মূল অ্যাকাডেমিক অংশ সাধারণ মানুষের কাছে প্রায় অগম্য। কিন্তু তার বাইরেও এক বিরাট ক্ষেত্র পড়ে আছে যেখানে বিজ্ঞানকে, অন্তত তার সিদ্ধান্তদের সাধারণের কাছে নিয়ে যাওয়া সম্ভব – যে বিষয়টা বিজ্ঞানীরা অনেকেই অবহেলা করেন। বিজ্ঞান কোনো জাদুবিদ্যা নয়, বৈজ্ঞানিকও সুপারম্যান বা সুপারওম্যান নন।

সামান্য যে কয়েকটা উদাহরণ আলোচিত হল, তাদের মধ্যে মিল কী? প্রত্যেকটিতেই নানা অবৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত, পূর্বানুমান, অন্ধবিশ্বাস –- এ সবের সমর্থনে বিজ্ঞানকে এনে হাজির করা হয়েছে। আরও অনেক উদাহরণ আমাদের প্রত্যেকেরই জানা আছে। জ্যোতিষী যখন খবরের কাগজে বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে রত্ন নির্ধারণের বিজ্ঞাপন দেয়, তখন সে যে অবিজ্ঞানকে বিজ্ঞানের মোড়কে হাজির করছে তা সহজেই বোঝা সম্ভব। বাস্তুশাস্ত্র বা ফেং শুই যখন বলে যে ঘরের দক্ষিণ পশ্চিম কোণে একটা বিশেষ মূর্তি রাখলে পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রের উপর তার প্রভাব পড়বে এবং তা বাসিন্দাদের ভাগ্য পালটে দেবে, সেটা আমরা হেসে উড়িয়ে দিতে পারি। দুর্ভাগ্যক্রমে বিষয়টা সবসময় এত হালকা করে দেখা অনুচিত। জাতিবিদ্বেষের সমর্থনে বৈজ্ঞানিক কুযুক্তি ব্যবহার করে দশ বছরেরও কম সময়ে এক কোটি নিরপরাধ নরনারীশিশুর মৃত্যু ঘটানো সম্ভব হয়েছিল। যে সাম্রাজ্যবাদী ও ঔপনিবেশিক শাসনের যূপকাষ্ঠে কত বলি হয়েছে তার কোনো হিসাব করাই সম্ভব নয়, তাকে মান্যতা দেওয়ার জন্যেওও বৈজ্ঞানিক যুক্তির অবতারণা করা হয়েছে। অপবিজ্ঞানকে ব্যবহার করে পঁচিশ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পকে দু দশক আটকে রাখা যায়। একটা কথা বলে রাখা প্রয়োজন, সেতুসমুদ্রম প্রকল্পের প্রভাব নিয়ে পরিবেশবাদীদের আপত্তি আছে, সে বিষয়টা নিশ্চয় দেখতে হবে। কিন্তু পুরাণকথার সমর্থনে বিজ্ঞানের অপব্যবহারকে সমর্থন করা যায় না। তাই প্রয়োজন সচেতনতা।

তথ্যসূত্র

১। The Age of Capital, Eric Hobsbawm

২। The Mismeasure of Man, Stephen Jay Gould

৩। Evolution and Human Nature, Richard Morris

৪। The Aryans: Recasting Constructs, Romila Thapar

৫। The Penguin History of Early India: From the Origins to AD 1300, Romila Thapar

৬। Darwinism and Social Darwinism, James Allen Rogers, Journal of the History of Ideas, Vol 33, Page 265 (1972)

৭। The Ancestor’s Tale, Richard Dawkins

Add Comments