জলবায়ু বিজ্ঞানের নেপথ্য নির্মাতা বীরভদ্রন রামনাথন

জলবায়ু বিজ্ঞানের নেপথ্য নির্মাতা বীরভদ্রন রামনাথন

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২০ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আজ বিশ্ব জুড়ে উদ্বেগ। জলবায়ুর নীতিনির্ধারণ, তার সংকটকে বৈজ্ঞানিকভাবে বোঝা এবং তা নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনা চলেছে প্রতিনিয়ত। এসবকে কেন্দ্রে নিয়ে আসার পেছনে যাঁদের অবদান সবচেয়ে মৌলিক অথচ যারা তুলনামূলকভাবে নীরব, তাঁদের অন্যতম বিজ্ঞানী বীরভদ্রন রামানাথন। সম্প্রতি ৮১ বছর বয়সে তিনি পেয়েছেন ক্রফোর্ড প্রাইজ, যাকে ভূ-বিজ্ঞানের নোবেল পুরস্কার বলা হয়। তাঁর এই প্রাপ্তি কেবল একটি ব্যক্তিগত সম্মান নয়; এটি জলবায়ু বিজ্ঞানের বিকাশধারার এক গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি।

১৯৭০-এর দশকে বিশ্বের উষ্ণতা নিয়ে বৈজ্ঞানিক আলোচনা ছিল সীমিত এবং প্রান্তিক। সেই সময়েই রামনাথন একটি মৌলিক প্রশ্ন তোলেন— বিশ্ব উষ্ণায়নের জন্য কেবল কার্বন ডাই অক্সাইড-ই কি দায়ী? নাসার ল্যাংলি গবেষণা কেন্দ্রে কাজ করার সময় রামনাথন এমন এক আবিষ্কার করেন, যা জলবায়ু বিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়। তিনি প্রথম দেখান যে রেফ্রিজারেটর ও এয়ার কন্ডিশনারে ব্যবহৃত ক্লোরোফ্লুরোকার্বন (সিএফসি) কার্বন ডাই অক্সাইডের চেয়েও বহু গুণ বেশি তাপ ধরে রাখতে পারে। একটি মাত্র সিএফসি অণু হাজার হাজার কার্বন ডাই-অক্সাইড অণুর সমান উষ্ণতা সৃষ্টি করতে পারে। সেসময় তাঁর এই উপলব্ধি ছিল এককথায় যুগান্তকারী। এর মধ্য দিয়েই প্রথম প্রমাণিত হয় যে কার্বন ডাই-অক্সাইড ছাড়াও অন্যান্য গ্যাস বিশ্বের উষ্ণতা বাড়াতে সক্ষম।

এই গবেষণার গুরুত্ব দ্রুত বৈজ্ঞানিক পরিসর ছাড়িয়ে নীতিনির্ধারণের অঙ্গনে পৌঁছে যায়। মন্ট্রিয়াল প্রোটোকল (১৯৮৭)—যাকে আজ বিশ্ব পরিবেশ নীতির অন্যতম সফল উদাহরণ বলা হয়, তার ভিত্তি ছিল রামনাথন প্রমুখ বিজ্ঞানীদের সতর্কবার্তা। এই চুক্তি প্রমাণ করে, নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে সময়োপযোগী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব এবং তা কার্যকরও হতে পারে।

রামনাথনের কাজের আরেকটি বিশেষ দিক হলো, তাঁর কাজ শুধু তাত্ত্বিক গবেষণায় সীমাবদ্ধ ছিল না । তিনি প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণভিত্তিক গবেষণার ওপর জোর দেন। উপগ্রহ, বেলুন, জাহাজ ও পরবর্তীকালে ড্রোন ব্যবহার করে তিনি সরাসরি বায়ুমণ্ডলের গঠন ও আচরণ বিশ্লেষণ করেন। এছাড়াও দক্ষিণ এশিয়ার উপর বিস্তৃত দূষিত বায়ুস্তর যা “অ্যাটমস্ফেরিক ব্রাউন ক্লাউড” নামে পরিচিত, সেটি তাঁর গবেষণায় বিশেষ গুরুত্ব পায়। এই দূষণ একদিকে সূর্যালোক আংশিকভাবে প্রতিহত করে স্বল্পমেয়াদে উষ্ণতা আড়াল করে বটে, কিন্তু অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে বর্ষা, কৃষি ও জনস্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই দ্বৈত বাস্তবতা তাঁর গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদান।

বৈজ্ঞানিক কাজের পাশাপাশি রামনাথন জলবায়ু পরিবর্তনের নৈতিক ও সামাজিক দিক নিয়েও সক্রিয় ছিলেন। পন্টিফিক্যাল একাডেমি অব সায়েন্সেসের সদস্য হিসেবে তিনি তিনজন পোপকে জলবায়ু সংকট বিষয়ে পরামর্শ দেন এবং ধারাবাহিকভাবে জোর দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, এই সংকটের সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করে দরিদ্র ও উন্নয়নশীল সমাজ।

বীরভদ্রন রামনাথনের অবদান দেখায়, জলবায়ু বিজ্ঞান কেবল ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সতর্কবার্তা নয়; এতে সঠিক সময়ে কান দিলে বিশ্ব জুড়ে কার্যকর পদক্ষেপের ভিত্তিও তৈরি করা সম্ভব, ভবিষ্যৎ বদলানোর সুযোগও তৈরি করা সম্ভব।

 

সূত্র: http://timesofindia.indiatimes.com/articleshow/127869282.cms?utm_source=contentofinterest&utm_medium=text&utm_campaign=cppst

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nine − 2 =