ফেলুদার ধাঁধা

ফেলুদার ধাঁধা

তখন বাজে প্রায় সারে পাঁচটা, আড্ডা টা বেশ জমে উঠেছে। লালমোহন বাবু হঠাৎ ফেলুদা কে টেবিলের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন “আচ্ছা ফেলু বাবু টেবিলে কয়েক টা খাম দেখছি। ও গুলো কার?” ফেলুদা পেছনে ফিরে তিনটে খাম তুলে নিল, “ঐ দুপুর নাগাদ কিছু চিঠি এসেছিল, এই খাম কয়েকটা রয়ে গেছে। ” তারপর আমার দিকে ঘুরে বলল, “আচ্ছা, তোদের একটা মজার জিনিস দেখাই”। আমাদের আড়ালে ফেলুদা খাম গুলো নিয়ে কিছু একটা করলো। সেই তিনটে খাম চায়ের টেবিলে রাখলো, “এই ৩টে খাম এর ১টার মধ্যে ১টা ১০০ টাকার নোট রয়েছে আর বাকি দুটো ফাঁকা” ।
“এবার তুই এখান থেকে যে কোনো ১টা তুলে নে, কিন্তু সর্ত হলো এখন খুলতে পারবি না। ” এরম একটা অদ্ভুত খেলা দেখে আমি আর লালমোহন বাবু একটু অবাক হয়ে একে অপরের দিকে তাকালাম। তারপর যথারীতি একটা খাম তুলে নিলাম। এবার ফেলুদা আর একটা খাম তুললো। ঐ খাম টা ই খুলে বলল, “এই খাম টা কিন্তু ফাঁকা; এবার প্রশ্ন হচ্ছে তুই আগের খাম টা নিবি, না এই বেঁচে থাকা খাম টা”। লালমোহন বাবু এবার কিছু একটা অনুমান করে বললেন “তোপেস ভাই, ঐ খাম টা রাখো, আমার মন বলছে ওখানে ই রয়েছে টাকা টা”। ফেলুদা হালকা হেঁসে বলল, “অঙ্ক দিয়ে ভাব”। “বুঝতে পারছি তুমি probability র খেল দেখাচ্ছো কিন্তু যুক্তি টা ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না”, আমি বললাম। কিছু সময় বিষয় টা নিয়ে ভাবলাম। শেষমেশ হাল ছেড়ে বলে উঠলাম, “আচ্ছা ঐ খাম টা ই নিলাম”। আমার হাতের খাম টা রেখে অন্য খাম টা নিয়ে খুলে দেখি ১০০ টাকার নোট।
ফেলুদা আবার হালকা হেঁসে বলল, “এটি একটা বিখ্যাত ধাঁধা, Monty Hall Problem, মার্কিন টেলিভিশন গেম শো লেট’স মেক এ ডিল এর ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে। হেঁয়ালিটির নামকরণ হয়েছে অনুষ্ঠানটির উপস্থাপক মন্টি হিলের নামে। এর প্রকৃত ফলাফল অসম্ভব মনে হলেও প্রকৃত পক্ষে সত্য। এটার সম্পূর্ণ যুক্তি অঙ্কের একটি বিশেষ বিষয় দিয়ে দেওয়া যায়, যাকে আমরা ইংরাজী তে বলে থাকি Probability Theory” ফেলুদা বলল। জটায়ু কিছু টা আঁতকে উঠে বললেন “কি বলেন মশাই এখানে ও অঙ্ক, আমি তো এই বিষয় বরাবর কাচা ছিলাম”। বিছানার পাস থেকে কাগজ টা বের করে ফেলুদা কি সব আঁকি বুকি করে আমাদের দিকে এগিয়ে দিল, আর বলল,
“যেহেতু খেলোয়াড় নিশ্চিত হতে পারেন না যে অবশিষ্ট দুইটি খাম কোনটির ভিতরে টাকা আছে, বেশির ভাগ লোকই ধারণা করেন যে প্রতিটি দরজার সম্ভাবনাই সমান এবং সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে পছন্দ পরিবর্তন করলেও সম্ভাবনার কোন পরিবর্তন ঘটবে না। প্রকৃতপক্ষে Probability তত্ত্ব আনুসারে খেলোয়াড়ের পছন্দ পরিবর্তন করা উচিত—কারণ এর মাধ্যমে তার টাকা জয়ের সম্ভাবনা দ্বিগুণ হয়ে যায়, অর্থাৎ থেকে তা এ উন্নীত হয়। এই দেখ ৩টে খাম এর মধ্যে ১টা তে রয়েছে টাকা বাকি ২টো ফাঁকা। তার মানে ফাঁকা খাম তোলার chance আর টাকা থাকা খাম তোলার chance । এবার তুই যেই একটা খাম তুললি সেটা খালি হওয়ার chance বেশি। এরপর আমি তুলে নিলাম একটা খালি খাম। তাহলে পরে রইলো?”
“টাকা থাকা খাম! তার মানে আমি যদি টেবিলে পরে থাকা খাম টা নি তাহলে বেশির ভাগ সময় আমি লাভবান হবো। ”
“Excellent! এটার আরো ভালো প্রমাণ conditional probability দিয়ে দেওয়া যায়। সমস্যাটির একটি বহু পরিচিত বিবৃতি পাওয়া যায় প্যারেড ম্যাগাজিনে। এমনকি সকল ব্যাখ্যা ও প্রমাণ সহ উপস্থাপন সত্ত্বেও অনেক মানুষ মন্টি হল সমস্যার সঠিক সমাধানটি বিশ্বাস করতে পারেন না। পল এরডস, ইতিহাসের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ গণিতবিদদের একজন, যতক্ষণ না তাকে কম্পিউটার সিমুলেশন দেখানো হয়েছিল ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি অবিশ্বাসী ছিলেন। অঙ্কের বই টা একবার নেরে চরে দেখিস তোপসে। ”
টেবিলে রাখা ফোন টা বেজে উঠলো। ফেলুদা তুললো
“প্রদস মিত্র বলছি, ”
“কোথায় ? বোসপুকুর? আচ্ছা আমরা আসছি”।
উপসংহার
এখন বিভ্রমটি আরও ভালভাবে বোঝার জন্য কিছু সিমুলেশন পরিচালনা করা যাক। প্রথমত আমরা উভয় কৌশল থেকে জয়ের সংখ্যা প্লট করি। তারপরে আমরা জয় এবং হারের ভগ্নাংশ পরীক্ষা করি। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে এটি বেশ স্পষ্ট যে বদল করার কৌশলটি এ পৌঁছেছে, যেখানে অন্যটি এ পৌঁছেছে।
যেহেতু এই পরীক্ষাটি বেশ কয়েকটি রাউন্ডে পুনরাবৃত্তি হয়, তাই প্রতিটি কৌশলের জন্য পর্যবেক্ষিত জয়ের হার Law of large numbers এর সাথে সামঞ্জস্য রেখে তার তাত্ত্বিক জয়ের সম্ভাবনা আনুমানিক হতে পারে।

Figure 1
পাঠকের জন্য একটি অনুশীলন হিসাবে গাণিতিক প্রমাণ ছেড়ে দেওয়া যাক।

References:
Monty Hall Problem, Wikipedia
https://en.wikipedia.org/wiki/Monty_Hall_problem
Adams, Cecil (2 November 1990). “On Let’s Make a Deal, you pick door #1. Monty opens door #2 – no prize. Do you stay with door #1 or switch to #3?”. The Straight Dope.
Satyajit Ray (2005). Complete Adventures of Feluda. Penguin Books India. p. 10. ISBN 978-0-14-303278-6.

* লেখক বর্তমানে ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিকাল ইনস্টিটিউটে বি ম্যাথ(B. Math) ডিগ্রির ছাত্র। তিনি একজন প্রাক্তন JBNSTS(2018) এবং KVPY(2019) স্কলার। তার গণিতের প্রতি গভীর আগ্রহ এবং এই ক্ষেত্রে গবেষণা করতে চান। এছাড়াও, তিনি সাধারণ মানুষের পদে গণিত শেখাতে চান। তিনি কঠিন ধারণাগুলি কল্পনা করতে এবং সেগুলিকে গল্প হিসাবে সামনে রাখতে আগ্রহী