অক্টোপাস অনুপ্রাণিত কৃত্রিম ত্বক 

অক্টোপাস অনুপ্রাণিত কৃত্রিম ত্বক 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২০ জানুয়ারী, ২০২৬

সমুদ্রের অন্ধকার অতলে অক্টোপাস এবং কাটলফিশ এক জীবন্ত বিভ্রম। এই সে বালির মতো নিস্তেজ, আবার পরমুহূর্তেই পাথরের মতো খসখসে বা শৈবালের মতো রঙিন। শুধু রং নয়—তার ত্বকের গঠন, উজ্জ্বলতা আর স্পর্শও একসঙ্গে বদলে যায়। এভাবে চোখের পলকে রং ও ত্বকের গঠন বদলে চারপাশের সঙ্গে তার মিশে যাওয়ার ক্ষমতা নিয়ে বহুদিন ধরেই বিজ্ঞানীদের কৌতূহল। এবার সেই প্রাকৃতিক বিস্ময়কে অনুকরণ করে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা এমন এক অভিনব কৃত্রিম ত্বক তৈরি করেছেন, যা মাত্র দশ সেকেন্ডেরও কম সময়ে নিজের রং ও পৃষ্ঠের গঠন বদলাতে পারে।

এই ধরনের উন্নত কৃত্রিম ত্বকের ভিত্তি হলো PEDOT:PSS নামের একটি পরিবাহী প্লাস্টিক, যা সাধারণত ইলেকট্রনিক যন্ত্রে ব্যবহৃত হয়। তবে এখানে এই পদার্থ নতুন রূপ পেয়েছে—আলো, রং ও স্পর্শ নিয়ন্ত্রণের এক সূক্ষ্ম মাধ্যম হিসেবে।

এই কৃত্রিম ত্বকের ভেতরে লুকিয়ে আছে মানুষের চুলের থেকেও সূক্ষ্ম নকশা। শুকনো অবস্থায় সেগুলি একেবারেই অদৃশ্য, কিন্তু জল শোষণ করলেই নকশাগুলি সক্রিয় হয়ে ওঠে। ত্বকের কিছু অংশ বেশি ফুলে ওঠে, কিছু অংশ কম—ফলে সমতল পৃষ্ঠে তৈরি হয় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাহাড়-খাঁজের মতো গঠন। এই উঁচু-নীচু পরিবর্তন আলোর প্রতিফলন নিয়ন্ত্রণ করে: কোথাও আলো ছড়িয়ে পড়ে নিস্তেজ ভাব তৈরি করে, কোথাও আবার চকচকে ঝিলিক দেখা যায়। ছদ্ম-আবরণের ক্ষেত্রে এই উজ্জ্বলতা নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অতিরিক্ত চকচকেভাবই প্রায়শ কোনো বস্তুকে চোখে পড়ে যাওয়ার কারণ হয়।

রঙের ক্ষেত্রেও এই ত্বক ব্যতিক্রমী। এখানে কোনো রঞ্জক ব্যবহার করা হয়নি। বরং ধাতব স্তরের মাঝে আটকে থাকা আলো—Fabry–Pérot রেজোনেটর—পলিমারের পুরুত্বের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন রং সৃষ্টি করে। এই প্রক্রিয়া পুরোপুরি পুনরাবর্তনযোগ্য। পরীক্ষায় দেখা গেছে, প্রায় ২৫০ বার ভেজানো ও শুকানোর পরও ত্বক তার রং ও গঠন নির্ভুলভাবে ফিরে পায়।

এই উপাদানের সম্ভাব্য ব্যবহারের ক্ষেত্র অত্যন্ত বিস্তৃত। ভবিষ্যতে এটি দিয়ে এমন পোশাক বা রোবটের আবরণ তৈরি করা যেতে পারে, যা পরিবেশ বুঝে নিজেকে আড়াল করবে। আবার পৃষ্ঠের গঠন বদলানোর মাধ্যমে ঘর্ষণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হওয়ায়, ছোট রোবট দেয়াল বেয়ে ওঠা বা মসৃণভাবে চলার ক্ষমতা পেতে পারে। এমনকি চিকিৎসাবিজ্ঞানে কোষ কীভাবে কোনো পৃষ্ঠে আটকে থাকবে, তা নিয়ন্ত্রণেও এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।

অক্টোপাসের ত্বক থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তৈরি এই ত্বক রঙিন উপাদান ,গঠন ও স্পর্শ—এই তিনটিকে একসঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করার এক নতুন রাস্তা খুলে দিয়েছে, যা ভবিষ্যতের ছদ্ম প্রযুক্তিকে বাস্তবের আরও কাছাকাছি নিয়ে যাচ্ছে।

সূত্র: Soft photonic skins with dynamic texture and colour control by Siddharth Doshi, Nicholas A. Güsken, et.al; published in journal Nature, 7th January 2026.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

10 + eight =