অর্ধ-মোবিয়াস অণু

অর্ধ-মোবিয়াস অণু

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৪ মার্চ, ২০২৬

ধরা যাক, একটা ফিতে একবার পাক খেয়ে নিজের সঙ্গেই জুড়ে গেছে। আশ্চর্যের বিষয়, এতে থাকে মাত্র একটি পৃষ্ঠ ও একটি প্রান্ত। জার্মান গণিতবিদ অগুস্ট ফার্দিনান্দ মোবিয়াস-এর নামানুসারেই এই অদ্ভুত জ্যামিতিক গঠনটির নাম মোবিয়াস স্ট্রিপ। বহুদিন এটি ছিল মূলত গণিতের এক কৌতূহলজনক ধারণা। কিন্তু এখন সেই পাক খাওয়া ফিতার ধারণা থেকেই রসায়নবিদরা তৈরি করেছেন এক নতুন ধরনের কার্বনভিত্তিক অণু, যাকে বলা হচ্ছে “হাফ-মোবিয়াস’’ । সাধারণ মোবিয়াস স্ট্রিপ তৈরি করতে হলে একটি ফিতার এক প্রান্তকে অন্য প্রান্তের তুলনায় ১৮০ ডিগ্রি ঘুরিয়ে জুড়ে দিতে হয়। কিন্তু নতুন অণুতে বিজ্ঞানীরা সেই নিয়ম ভেঙেছেন। এখানে পরমাণুর একটি শৃঙ্খলকে পুরো ১৮০ ডিগ্রি নয়, মাত্র ৯০ ডিগ্রি ঘুরিয়ে একটি বৃত্তাকার লুপ বানানো হয়েছে। ফলে তৈরি হয়েছে সম্পূর্ণ নতুন ধরনের একটি টপোলজিক্যাল গঠন। গবেষণা পত্রের সহলেখক ইগর রনচেভিচ বলেন, “৯০ ডিগ্রির এই মোচড়টি মজার, কারণ এটি ডান দিকেও ঘুরতে পারে, আবার বাঁ দিকেও।‘’ এখানেই আসে রসায়নের গুরুত্বপূর্ণ ধারণা ‘কাইরালিটি’। যেমন ডান হাতের দস্তানা বাঁ হাতে ঠিকমতো বসে না, তেমনি এই অণুর ডান-পাক ও বাঁ-পাক রূপ একে অপরের আয়নার প্রতিচ্ছবি হলেও আলাদা। এই সাফল্যকে এক বড় অগ্রগতি বলছেন তাত্ত্বিক রসায়নবিদ জেমা সলোমন। আর রসায়নবিদ রাইনার হের্গেস-এর মতে, “এই ধরনের অণু আগে কখনও তৈরি হয়নি।‘’ উল্লেখ্য, ২০০৩ সালে তিনিই প্রথম মোবিয়াস-স্ট্রিপ ধরনের অণু তৈরি করেছিলেন। নতুন গবেষণায় বিজ্ঞানীরা তৈরি করেছেন ১৩টি কার্বন পরমাণুর একটি লুপ। এর বিপরীত পাশে থাকা দুটি কার্বনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ক্লোরিন পরমাণু। ফলে বাকি ১১টি কার্বন সরাসরি একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি শৃঙ্খল তৈরি করেছে। প্রতিটি কার্বনের দুটি ইলেকট্রনের অরবিটাল ডাম্বেলের মতো আকার নিয়ে লুপের বাইরে বেরিয়ে থাকে। পাশের অরবিটালের সঙ্গে এগুলো অতিরিক্ত বন্ধন তৈরি করে, ফলে তৈরি হয় একটি কনজুগেটেড কাঠামো, যেখানে ইলেকট্রনগুলো পুরো অণু জুড়ে ভাগাভাগি হয়ে যায়। এই ধরনের কনজুগেশনই অনেক অণুর নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের উৎস। যেমন, পরিচিত গন্ধময় অণু বেঞ্জিন বা দ্বিমাত্রিক উপাদান গ্রাফিন-এর ক্ষেত্রেও ইলেকট্রনের এমন ভাগাভাগি দেখা যায়। অণুটি সত্যিই ৯০ ডিগ্রি পাক খেয়েছে কিনা তা দেখতে বিজ্ঞানীরা ব্যবহার করেছেন অত্যাধুনিক পরমাণু পর্যায়ের মাইক্রোস্কোপ। এই কাজের নেতৃত্ব দেন লিও গ্রস। ছবিতে স্পষ্ট দেখা যায়—অণুটি সত্যিই অর্ধ-মোবিয়াস আকার ধারণ করেছে। এই অবস্থায় অণুর ইলেকট্রনগুলো এমনভাবে সাজানো থাকে যে প্রতিটি অরবিটাল জোড়া সংখ্যক ইলেকট্রনে পূর্ণ থাকে। ফলে এটি পাকহীন অবস্থার তুলনায় বেশি স্থিতিশীল। যদিও মাঝে মাঝে অণুটি উচ্চ-শক্তির পাকহীন অবস্থায় চলে যেতে পারে, পরে আবার ডান-পাক বা বাঁ-পাক হাফ-মোবিয়াস রূপে ফিরে আসে। গবেষকদের মতে, এই অদ্ভুত জ্যামিতি শুধু নান্দনিক নয়, এটি ইলেকট্রনের চলাচল বদলে দিতে পারে, অস্বাভাবিক চৌম্বকীয় বা স্পিন-নির্ভর প্রভাব তৈরি করতে পারে। ভবিষ্যতে এমন কাঠামো চৌম্বক ক্ষেত্রের প্রতি অতিসংবেদনশীল উপাদান তৈরির পথ খুলে দিতে পারে। এমনকি এটি কোয়াসিপার্টিকল নামে পরিচিত সমষ্টিগত কণার আচরণ বোঝার নতুন পরীক্ষাগারও হতে পারে। সুতরাং গণিতের এক পাকানো ফিতার ধারণা এখন পৌঁছে গেছে অণুর জগতে আর সেখানেই খুলছে প্রকৃতির জ্যামিতির এক নতুন অধ্যায়।

 

সূত্র : Nature, March 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

one × five =