“মনে হচ্ছে আমাকে যেন একটা মিশনে পাঠানো হয়েছে,” বলছে রাম। “টিভির ভেতর দিয়ে বার্তা আসছে।” কী লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য সে জানে না। শুধু এটুকু বোঝে, এটা ভালো কিছু নয়। টিভিটা যেন তাকে কিছু খারাপ করতে বলছে। সেই অনুভূতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে হত্যার চিন্তা, আর পুরো ব্যাপারটার একটা কড়া, আদেশমূলক আবহ।
এই রামের কথাই ধরা পড়েছে দ্য ল্যানসেট সাইকিয়াট্রি-তে প্রকাশিত এক নতুন গবেষণায়। বিষয় ‘ক্লিনিক্যাল সাইকোসিস আর অলীক বিভ্রম’। পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় ১ শতাংশ মানুষ জীবনে কখনও না কখনও এমন অলীক বিভ্রমে ভোগেন। সংখ্যা কম হলেও, যাঁদের হয় তাঁদের কাছে এই অভিজ্ঞতা ভয়ংকর। আর চিকিৎসকদের কাছে সেটাকে ভাঙা খুব কঠিন। প্রশ্নটা সোজা কিন্তু গভীর। এইসব অদ্ভুত বিশ্বাস আসে কোথা থেকে? বিশেষ করে জীবনের প্রথম সাইকোসিস পর্বে? মানুষকে কীভাবে আবার বাস্তবের মাটিতে ফেরানো যায়? যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ার একদল মনোবিজ্ঞানী বলছেন, বিষয়টা শুধু “ভুল চিন্তা” নয়। এটা আসলে মানুষের ‘বাস্তব-অনুভব’ পাল্টে যাওয়া। শরীর, আবেগ, স্মৃতি, ভাষা সব মিলিয়ে এক ধরনের ভাঙন। এই ধারণা যাচাই করতে তাঁরা যুক্তরাজ্যের ১০ জন তরুণ-তরুণীকে নিয়ে ছয় মাস ধরে বিশদ গবেষণা করেন। এদের গড় বয়স ২৫। সবারই জীবনের প্রথম সাইকোসিস হয়েছে কিংবা অলীক বিভ্রম ছিল বা আছে। মাদক-সংক্রান্ত বিভ্রম থাকলে তাঁদের বাদ দেওয়া হয়েছে। গবেষণার প্রধান রোসা রিতুন্নানো বলেন, “আমাদের গবেষণা অলীক বিভ্রমকে একেবারে নতুন চোখে দেখায়। এগুলো মানুষের আবেগ, শরীর আর ভাষার ভেতর গাঁথা।“ তাঁর মতে, বিভ্রম শুধু মাথার ভিতরের ভুল নয়, এটা শরীরজোড়া তোলপাড়ের ফল। ২০২৩ সালে গবেষকেরা মোট ৩৩টি গভীর সাক্ষাৎকার নেন। সঙ্গে উদ্বেগ, আত্মবোধ, জীবনের উদ্দেশ্য, অস্বাভাবিক অভিজ্ঞতা সম্পর্কিত নানা প্রশ্নমালা। তারপর তাঁরা তিনটি স্তরে তথ্য বিশ্লেষণ করেন। প্রথমে ক্লিনিক্যাল দৃষ্টিভঙ্গিতে অলীক বিভ্রমের ধরন চিহ্নিত করা হয়। এরপর চলে ঘটনা তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, অর্থাৎ ভুক্তভোগীর নিজের অভিজ্ঞতার রূপ: সেই সময় কেমন লাগছে, অন্যান্য মানুষকে কেমন মনে হচ্ছে, পরিবেশের আবহ কেমন, ভাষা কীভাবে বদলাচ্ছে। শেষ ধাপে জীবনের গল্প, শৈশব, সম্পর্কের মোড়, টিকে থাকার কৌশল। বিশেষ নজর ছিল রূপকাশরিত ভাষার দিকে। এক্ষেত্রে সবার অলীক বিভ্রমের মধ্যেই কিছু মিল আছে। তিনটি বিষয়ে সবচেয়ে বেশি। এক, সব অলীক বিভ্রমই কোনো না কোনোভাবে তাড়িত বা নির্যাতিত হওয়ার অনুভূতি। দুই, ১০ জনের মধ্যে ৯ জনের মনে হয়েছে, চারপাশের সবকিছু যেন তাদের উদ্দেশ্যে বিশেষ সংকেত পাঠাচ্ছে। তিন, অনেকের অলীক বিভ্রমে ছিল ঈশ্বরীয় বা মহিমান্বিত ভাব। এই বিভ্রমগুলোর সঙ্গে সঙ্গে বাস্তবকে বোঝার ধরনও বদলে গেছে। সময় যেন বিকৃত, মানুষ অচেনা, পরিবেশ রহস্যময়, নিজের অবস্থানও অনিশ্চিত মনে হয়। দেখা গেছে, অনুভূতি অস্বাভাবিকভাবে তীব্র, সময় স্থির থাকছে, নিজের আর অন্যের সীমা ঝাপসা হয়ে পড়ছে, সারাক্ষণ “কিছু একটা প্রকাশ পাচ্ছে” এমন কোন আবহ, আর নিজেকে বিশেষ বা মহাজাগতিকভাবে আলাদা মনে হচ্ছে। গবেষকেরা বলছেন, অলীক বিভ্রম কিন্তু এলোমেলো বিশ্বাস নয়। এটা মনের বানানো এক গল্প, যার মাধ্যমে ব্যক্তিটি পুরো সিস্টেম বদলে যাওয়া অভিজ্ঞতাকে বোঝার চেষ্টা করে। এদের জীবনকাহিনীতেও মিল আছে। অনেকেরই শৈশবে বা কৈশোরে বারবার কষ্টকর সম্পর্ক ভাঙা, লজ্জা, ভয়, রাগ, নিয়ন্ত্রণের অনুভূতি রয়েছে। পরে বড় ধাক্কা। বিচ্ছেদ, একাকিত্ব, অপমান, অত্যাচার, তীব্র চাপ, তাতেই পুরোনো আবেগ আবার জেগে ওঠে। তখন মানুষ অর্থ খোঁজে মরিয়া হয়ে। ধর্ম, আধ্যাত্মিকতা, কল্পকাহিনি, গভীর আত্মমগ্নতার নাম দিয়ে।
তিনটি পরিস্থিতি প্রায়ই অলীক বিভ্রমের আগে দেখা যায়। এক, সবাই তাকে দেখছে, বিচার করছে, এরকম লজ্জাজনক অনুভূতি। দুই, শূন্যতা থেকে হঠাৎ অর্থ বা সংযোগের অনুভব অর্থাৎ নিজেকে নির্বাচিত বা রক্ষিত মনে হওয়া। তিন, বাস্তব যেন নকল, শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন, সব কিছু অভিনয়ের মতো লাগা। গবেষকদের মতে, অলীক বিভ্রম ভাঙা কঠিন এই জন্য যে এগুলি যুক্তির ভুল নয়। এগুলি শরীরের গভীর অনুভূতিতে বাঁধা। লড়াই, পালানো, লুকানো, মান্য করার প্রবৃত্তিতে। তাই এর চিকিৎসায় শুধু ভুল বিশ্বাসকে নিশানা করলে চলবে না। দরকার নিরাপদ আবহ, আবেগের যত্ন, জীবনের ইতিহাস বোঝা, ভাষার রূপকের দিকে মনোযোগ। জ্যানেট লিটলমোর বলেন, “আমরা সবাই রূপক দিয়ে জীবন বুঝি। কিন্তু সাইকোসিসে ভোগা মানুষরা সেই রূপকের ভিতরেই বাস করেন।“ এই গবেষণা যদি বড় পরিসরে সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে পরিষ্কার হবে, অলীক বিভ্রম একটা অদ্ভুত চিন্তা নয়। এটা ভিতরের এক গভীর, গোটা-জগৎ বদলে যাওয়ার সংকেত।
সূত্রঃ: Nautilus Magazine
