অ্যাফান্টাসিয়া: মন-চিত্রকরের অনুপস্থিতি 

অ্যাফান্টাসিয়া: মন-চিত্রকরের অনুপস্থিতি 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

২০১৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্র থেকে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে ‘অ্যাফান্টাসিয়া’। মনের চোখ দিয়ে ছবি দেখতে না পাওয়া। সেই গবেষণার পরের দশকেই স্পষ্ট হয়েছে, এই অভিজ্ঞতা একক নয়। এটি আসলে বিস্তৃত ও বৈচিত্র্যময় এবং বিজ্ঞানীদের কৌতূহলী করে তুলেছে। অ্যাফান্টাসিয়া মানে যে কেবল কল্পচিত্রের অনুপস্থিতি, এমনটা নয়। অনেকের ক্ষেত্রে দৃশ্য কল্পনার পাশাপাশি শব্দ, গন্ধ বা স্পর্শ কল্পনাও অনুপস্থিত থাকতে পারে। অর্থাৎ, তাদের ‘মনের কান’ বা ‘মনের নাক’ নেই। কেউ কেউ স্বপ্নে ছবি দেখেন, আবার কেউ দেখেন না। এই বৈচিত্র্যই ইঙ্গিত দেয়, এটি সহজ কোনো ঘাটতি নয়, এ হল মানসিক অভিজ্ঞতার এক চরম প্রান্ত। অ্যাফান্টাসিয়ার একটি জিনগত উপাদান রয়েছে। কারুর ভাই বা বোনের মনের চোখ দুর্বল বা অনুপস্থিত থাকলে, তার অ্যাফান্টাসিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় দশ গুণ বেড়ে যায়। এই বৈশিষ্ট্য শিল্পকলার তুলনায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি পেশার মানুষের মধ্যে তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। গবেষক জেম্যান জোর দিয়ে বলেন, একে রোগ বা ব্যাধি বলা ভুল হবে। তাঁর মতে, এটি “মানসিক চিত্রকল্পের ক্ষমতার বণ্টনে একটি কৌতূহলোদ্দীপক ভিন্নতা।“ সমস্যা হলো, মানসিক চিত্রকল্প নিয়ে গবেষণা দীর্ঘদিন ধরেই নির্ভর করেছে মানুষের বর্ণনার উপর। কিন্তু অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার ভাষা ব্যক্তিভেদে আলাদা। কেউ কম বলে, কেউ বেশি। ফলে প্রশ্ন ওঠে, এটা কি সত্যিই অভিজ্ঞতারই পার্থক্য, নাকি নিছক বর্ণনার? এই জট খুলতেই বিজ্ঞানীরা আশ্রয় নিয়েছেন নতুন কৌশলের। সিডনির নিউ সাউথ ওয়েলস বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুবিজ্ঞানী জোয়েল পিয়ারসন ব্যবহার করেছেন এক চমকপ্রদ পদ্ধতি- বাইনোকুলার রাইভালরি। দুটি চোখে একসঙ্গে আলাদা ছবি দেখালে মস্তিষ্ক সেগুলোকে মিশিয়ে না দিয়ে বরং পালা করে দেখে। পিয়ারসন দেখালেন, পরীক্ষার আগে কেউ যদি কল্পনায় লাল বা সবুজ রেখা ধরে রাখে, পরীক্ষার সময় সেই রঙটাই বেশি দেখা যায়। এখান থেকেই মানসিক চিত্রকল্পের “শক্তি” মাপার পথ খুলে যায়। কিন্তু অ্যাফান্টাসিয়ায় আক্রান্তদের ক্ষেত্রে এই প্রভাব অনুপস্থিত। এর অন্যান্য সূচকও আছে। ভয়ের গল্প শুনে শরীর কতটা ঘামছে, বা উজ্জ্বল আলো কল্পনা করলে চোখের মণি কতটা সঙ্কুচিত হচ্ছে, এসবই মানসিক চিত্রকল্পের তীব্রতার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। এক দশকের গবেষণার পর বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত, অ্যাফান্টাসিয়া বিষয়টি বাস্তব। কিন্তু ধাঁধা থেকেই যাচ্ছে, আচরণে এর প্রভাব এত কম কেন? অ্যাফান্টাসিয়ায় আক্রান্তরা স্মৃতি পরীক্ষায় ভালো করেন, মনের মধ্যে বস্তু ঘোরাতে পারেন, খেলাধুলা করেন, রেখাচিত্র আঁকেন। “আমি মস্তিষ্কের ছবি এঁকে দিতে পারি, কিন্তু যদি বলেন, একটা বেগুনি ডাইনোসর বলের ওপর খেলা দেখাচ্ছে, তাহলে মনে কিছুই আসে না” – বলছেন শাইন। অর্থাৎ মস্তিষ্ক সবকিছুই ঠিকঠাক করছে, অথচ একটি নির্দিষ্ট ক্ষমতা অনুপস্থিত। কীভাবে সম্ভব এমনটা? প্রথমে ধারণা ছিল, সমস্যার উৎস ভিজুয়াল কর্টেক্সে। কারণ কল্পনার সময় এই অংশটিই সক্রিয় হয়। কিন্তু মস্তিষ্ক-স্ক্যান দেখিয়েছে, অ্যাফান্টাসিয়ায় আক্রান্তরা কল্পনা করার চেষ্টা করলে ভিজুয়াল কর্টেক্স সক্রিয়ই থাকে। তাহলে ছবি কোথায় হারাচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গবেষক কাব্বাই ও তাঁর দল এমন এক পরীক্ষা করেন যেখানে অংশগ্রহণকারীদের ইচ্ছাকৃতভাবে কল্পনা করতে বলা হয়নি। তাদের কিছু শব্দ শোনানো হয়। যেমন- কুকুরের ডাক, যার মাধ্যমে স্বাভাবিকভাবেই কুকুরের দৃশ্য তৈরি হওয়ার কথা। মেশিন-লার্নিং বিশ্লেষণে দেখা যায়, অ্যাফান্টাসিয়ায় আক্রান্তদের মস্তিষ্কেও ‘কুকুর’-সংক্রান্ত ভিজুয়াল উপস্থাপনা তৈরি হচ্ছে, অথচ তাঁরা কিছুই দেখছেন না। অর্থাৎ চিত্র আছে, কিন্তু চেতনাতে পৌঁছাচ্ছে না। স্বেচ্ছাকৃত কল্পনার ক্ষেত্রে আবার ভিন্ন চিত্র উঠে আসে। তখন ঐ ভিজুয়াল সংকেত দুর্বল বা অস্পষ্ট। ফলে অ্যাফান্টাসিয়া হয়তো এক দ্বিমুখী সমস্যা, এই ধারণাই জোরালো হচ্ছে। চেতনায় ছবি আসে না, ইচ্ছায় ছবি গড়া যায় না। তাছাড়া মূল সমস্যা হতে পারে মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চলের সংযোগে। প্যারিস ব্রেন ইনস্টিটিউটের জিয়াংহাও লিউ দেখিয়েছেন, এক্ষেত্রে ভিজুয়াল প্রক্রিয়াকরণের অঞ্চল ও সম্মুখবর্তী এলাকার মধ্যে সংযোগ কম লক্ষ্য করা গেছে। সচেতন কল্পনার জন্য যে “নীরব ভিজুয়াল সংকেত” বাড়িয়ে তোলা দরকার, সেটাই এখানে ব্যর্থ। এই ভিন্নতা জীবনে বড় বাধা তৈরি করে না, কিন্তু স্মৃতির গভীরতায় এর প্রভাব পড়ে। অতীতের স্মৃতি কম রঙিন থাকে, কম জীবন্ত থাকে। “স্মৃতিতে এক ধরনের মলিনতা থাকে,” বলেন জেম্যান। তবে এই অভাবও কারও কারও কাছে আশীর্বাদ। শাইন বলেন, ভ্রমণের সময় তিনি একাকিত্বে ভোগেন না, পরিবারের মুখ ভেসে ওঠে না, মনও ভারী হয় না। “আমি বসে বসে ভাবনায় ডুবে যাই না,” তিনি বলেন। অ্যাফান্টাসিয়া আমাদের শেখায়, মানুষের ভেতরের জগৎ একরকম নয়। বাস্তবতা প্রত্যেকের কাছে আলাদা ভাবে ধরা দেয়। আর সেই বৈচিত্র্যই, বিজ্ঞানীদের মতে, মানব মস্তিষ্ক বোঝার চাবিকাঠি।

 

সূত্রঃ: Nature 650; February, 2026.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

18 − 4 =