অ্যালঝাইমার এমনই এক জটিল স্নায়ুবিক ব্যাধি, যা ধীরে ধীরে ফিকে করে দেয় স্মৃতি, চিন্তার স্বচ্ছতা ও ব্যক্তিত্বের রঙ। বিশ্বজুড়ে বাড়তে থাকা এই রোগের কার্যকর ও নিরাপদ চিকিৎসা খুঁজে পাওয়া এখনো চিকিৎসাবিজ্ঞানের বড় চ্যালেঞ্জ। এই প্রেক্ষাপটে আশার আলো দেখাচ্ছে আলোভেরা (ঘৃতকুমারী)। সাম্প্রতিক এক গবেষণা ইঙ্গিত দিয়েছে এই পরিচিত উদ্ভিদের ভেতরে থাকা একটি প্রাকৃতিক যৌগ ভবিষ্যতে অ্যালঝাইমারের চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে কারেন্ট ফার্মাসিউটিক্যাল অ্যানালিসিসে। বিজ্ঞানীরা উন্নত কম্পিউটারভিত্তিক বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, অ্যালোভেরার বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান মস্তিষ্কের স্মৃতিহানির সঙ্গে যুক্ত গুরুত্বপূর্ণ উৎসেচকগুলোর ওপর কীভাবে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষভাবে তারা নজর দেন দুটি উৎসেচকের উপর—অ্যাসিটাইলকোলিনেস্টেরেজ (AChE) ও বুটিরিলকোলিনেস্টেরেজ (BChE)। এই উৎসেচক দুটি অ্যাসিটাইলকোলিন নামের এক রাসায়নিক বার্তাবহকে ভেঙে দেয়, যা স্নায়ুকোষগুলোর মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করে। অ্যালঝাইমার রোগে অ্যাসিটাইলকোলিনের মাত্রা আগেই কমে যায়; ফলে স্মৃতিভ্রংশ ও মানসিক অবক্ষয় ত্বরান্বিত হয়। তাই এই উৎসেচকগুলোর কার্যকারিতা কমিয়ে দিলে উপসর্গ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হতে পারে।
কম্পিউটার সিমুলেশনের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা “মলিকিউলার ডকিং” ও “মলিকিউলার ডাইনামিক্স” পদ্ধতিতে দেখেছেন কোন যৌগ উৎসেচকের সঙ্গে কতটা দৃঢ়ভাবে যুক্ত হতে পারে এবং সেই সংযোগ কতটা স্থিতিশীল থাকে। এ পরীক্ষায় অ্যালোভেরার প্রাকৃতিক উদ্ভিদ-যৌগ বিটা-সিটোস্টেরল সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ফল দেখায়। এটি AChE ও BChE—উভয়ের সঙ্গেই শক্ত বন্ধন তৈরি করে, যা ইঙ্গিত দেয় যে এটি সম্ভাব্য দ্বৈত প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করতে পারে। অর্থাৎ, একসঙ্গে দুটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসেচকের কার্যকারিতা কমিয়ে অ্যাসিটাইলকোলিনের মাত্রা রক্ষা করতে সহায়তা করতে পারে।
গবেষকেরা শুধু উৎসেচকগুলোর সঙ্গে বন্ধনই নয়, সম্ভাব্য ওষুধ হিসেবে যৌগটির নিরাপত্তা ও দেহে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার (ADMET বিশ্লেষণ) মূল্যায়ন করেছেন। কীভাবে এটি শোষিত হবে, কীভাবে ছড়াবে, বিপাক হবে এবং কোনো বিষাক্ত প্রভাব ফেলবে কি না তা নিয়ে পরীক্ষা করেছেন। ফলাফল বলছে, বিটা-সিটোস্টেরলের নিরাপত্তা- চিত্র আশাব্যঞ্জক।
তবে গবেষকরা সতর্ক করে দিয়েছেন—এটি এখনো প্রাথমিক ধাপের গবেষণা। বাস্তব ল্যাবরেটরির পরীক্ষা ও মানবদেহে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ছাড়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। তবুও এই অনুসন্ধান দেখাচ্ছে, চেনা ঔষধি উদ্ভিদের ভেতরেই লুকিয়ে থাকতে পারে ভবিষ্যতের স্নায়ুরোগ চিকিৎসার নতুন দিগন্ত।
সূত্র: In silico exploration of Aloe vera leaf compounds as dual AChE and BChE inhibitors for Alzheimer’s disease therapy by Meriem Khedraoui, Fatima Zahra Guerguer, et.al; Current Pharmaceutical Analysis, 2025; 21 (4): 238 DOI: 10.1016/j.cpan.2025.03.005
