আমরাই কি নিয়ান্ডারথালদের বিলুপ্তির কারণ?

আমরাই কি নিয়ান্ডারথালদের বিলুপ্তির কারণ?

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

প্রায় ৩৭ হাজার বছর আগে, আজকের স্পেনের-এর দক্ষিণে ছোট ছোট দলে বাস করত নিয়ান্ডারথালরা। তারা ছিল ইউরোপের পুরনো বাসিন্দা। এর কয়েক হাজার বছর আগে ইতালির ফ্লেগ্রিয়ান আগ্নেয়ক্ষেত্রে ভয়াবহ অগ্ন্যুৎপাত হয়। সেই বিস্ফোরণ ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের জলবায়ু ও খাদ্যশৃঙ্খল পাল্টে যায়। তার প্রভাব হয়তো নিয়ান্ডারথালদের জীবনেও পড়েছিল। তবু তারা তখনও টিকে ছিল। সে সময়ও তারা পাথরের সরঞ্জাম বানাত, পাখি শিকার করত, মাশরুম সংগ্রহ করত। গুহার দেওয়ালে চিহ্ন খোদাই করত, পালক ও শাঁস দিয়ে শরীর সাজাত। তবে তারা বুঝতে পারেনি, তারা আসলে নিজেদের প্রজাতির শেষ দিকের প্রজন্ম। প্রায় ৩৪ হাজার বছর আগে নিয়ান্ডারথালরা কার্যত হারিয়ে যায়। কিন্তু তাদের পতন একদিনে হয়নি। এটা শুরু হয়েছিল আরও আগে, যখন তারা ছোট ও বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠীতে ভেঙে গিয়েছিল। নিয়ান্ডারথালদের বৈজ্ঞানিক নাম হোমো নিয়ান্ডারথালেনসিস। ১৮৫৬ সালে জার্মানির নিয়ান্ডার ভ্যালি-তে একটি অদ্ভুত খুলির সন্ধান মেলে। সেখান থেকেই এই নামকরণ। প্রথমদিকে বিজ্ঞানীরা তাদের কুঁজো, হিংস্র, আধা-মানব বলে ভাবতেন। ফ্রান্সের সাঁ সেজেয়ার ও ইরাকের শানিদার গুহায় আর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত এক বৃদ্ধের কঙ্কাল পাওয়া গেলে সেই ভুল ধারণা আরও জোরদার হয়। কিন্তু গত দেড়শো বছরের প্রত্নতাত্ত্বিক ও জেনেটিক গবেষণা সেই ধারণা পাল্টে দিয়েছে। এখন আমরা জানি, নিয়ান্ডারথালরা ছিল দক্ষ শিকারি ও সরঞ্জাম নির্মাতা। তারা মৃতদেহ সমাহিত করত, অলংকার ব্যবহার করত। কঠোর ইউরোপীয় ও সাইবেরীয় ঠান্ডায় তারা লক্ষ লক্ষ বছর টিকে ছিল। প্রায় ৬ থেকে ৮ লক্ষ বছর আগে মানুষের শেষ সাধারণ পূর্বপুরুষ থেকে আলাদা পথে বিবর্তন শুরু হয়। নিয়ান্ডারথালরা ইউরেশিয়ার ঠান্ডা আবহাওয়ায় খাপ খাইয়ে নেয় শক্তপোক্ত শরীর নিয়ে। অন্যদিকে আফ্রিকায় বিবর্তিত হয় আধুনিক মানুষ। প্রায় ৫৫ থেকে ৪৫ হাজার বছর আগে হোমো সেপিয়েন্স ইউরোপে পৌঁছায়। ইউরোপে দুই প্রজাতির সহাবস্থান ছিল অন্তত ২,৬০০ বছর, হয়তো ৭,০০০ বছরও। এই সময়টাই বড় প্রশ্ন তোলে, আমরাই, আধুনিক মানুষই কি তাদের বিলুপ্তির কারণ? ২০১০ সালে নিয়ান্ডারথালদের পূর্ণ জিনোম পর্যায়ক্রম নিরূপণ করা হয়। তাতে স্পষ্ট হয়, দুই প্রজাতির মধ্যে নিয়মিত জিন আদানপ্রদান হয়েছিল। আজ আফ্রিকার বাইরে প্রায় সব মানব জনগোষ্ঠীতেই নিয়ান্ডারথাল ডিএনএ-র ছাপ আছে। অর্থাৎ তারা পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি, তাদের অংশ আমাদের শরীরেই রয়ে গেছে।

 

সূত্র: LiveScience; February 2026.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

three × 2 =