আর্টেমিস কর্মসূচি ও ভবিষ্যৎ চন্দ্রযাত্রা

আর্টেমিস কর্মসূচি ও ভবিষ্যৎ চন্দ্রযাত্রা

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৪ এপ্রিল, ২০২৬

মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসার আসন্ন আর্টেমিস -২ মিশনকে ঘিরে বিজ্ঞানীদের মধ্যে প্রবল উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এই অভিযানে নভোচারীরা চাঁদের চারপাশ ঘুরে আসবেন। ১৯৭২ সালে অ্যাপোলো মিশনের পর এই প্রথম মানুষ পৃথিবীর কক্ষপথ ছেড়ে এত দূরে যাবে। অভিযানটি শুধু প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নয়, বস্তুত মানবসভ্যতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হতে পারে। কারণ অনেকেরই ধারণা, এখান থেকেই হয়তো মানুষের সত্যিকারের “মহাকাশ-ভ্রমণকারী সভ্যতা’’ গড়ে উঠবে। তবে এ লক্ষ্য অর্জনে দীর্ঘদিনের কঠোর পরিশ্রম, গবেষণা ও বিনিয়োগের প্রয়োজন রয়েছে। চাঁদ এখনও গবেষণার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। অ্যাপোলো মিশনের মাধ্যমে অনেক তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। গত ৫০ বছরের রোবোটিক মিশনের উপাত্তও হাতে রয়েছে। তবু চাঁদ সংক্রান্ত অনেক প্রশ্নের উত্তর অজানাই রয়ে গেছে। যেমন, সাম্প্রতিক গবেষণায় জানা গেছে, চাঁদে জলও রয়েছে। কিন্তু এই জল কোথা থেকে এসেছে, কতটা আছে, এবং বায়ুশূন্য পরিবেশে তা পৃথিবীর মতো কঠিন থেকে বাষ্পে রূপান্তরিত হয় কিনা, সেসব প্রশ্ন এখনও অমীমাংসিত।

আর্টেমিস -২ মিশনের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হল চাঁদে একটি স্থায়ী ঘাঁটি গড়া। এই ঘাঁটি ভবিষ্যতে মানুষ পাঠানোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। যদিও বর্তমানে এই কর্মসূচির প্রধান লক্ষ্য প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জন করা। এর বৈজ্ঞানিক সম্ভাবনা বিশাল। চাঁদ থেকে আনা পাথর ও বরফের নমুনা বিশ্বের বিভিন্ন গবেষক সহজেই বিশ্লেষণ করতে পারবেন। চাঁদের দূরবর্তী অংশে একটি রেডিও টেলিস্কোপ বসানো হলে, পৃথিবীর ইলেকট্রনিক সংকেত থেকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত অবস্থায় মহাবিশ্বের প্রাচীন “তামস যুগ’’কে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। যদিও চাঁদে প্রাণের সন্ধান পাওয়ার সম্ভাবনা নেই, তবে মঙ্গল-এর বরফস্তর, প্রাচীন শিলাস্তর ও ভূগর্ভস্থ জলে জীবনের চিহ্ন থাকতে পারে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন।

মানববাহী মহাকাশযাত্রা সবসময়ই ঝুঁকিপূর্ণ। আর্টেমিস-২ তখনই সফল হবে, যখন নভোচারীরা নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরে আসবেন। এরপর শুরু হবে আরও কঠিন চ্যালেঞ্জ। প্রযুক্তিগত দিক থেকে অন্য গ্রহে অবতরণ করা অত্যন্ত কঠিন কাজ। ইতিহাসে দেখা গেছে, প্রথম প্রচেষ্টার অনেকগুলোই ব্যর্থ হয়েছে। এই কারণে নাসা তাদের পরবর্তী মিশন আর্টেমিস-৩-এর পরিকল্পনায় পরিবর্তন এনেছে। সরাসরি চাঁদে নামার বদলে আগে মহাকাশে বিভিন্ন পরীক্ষা চালানো হবে, যাতে প্রযুক্তিকে আরও নির্ভরযোগ্য করা যায়। অন্যদিকে, মঙ্গল-এ মানব মিশনের পরিকল্পনাও এখনও স্পষ্ট নয়। ১৯৯৩ সাল থেকে নাসা-এর রোবোটিক মিশনগুলি অনেক গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার করেছে। ২০২১ সালে পারসিভিয়ারেন্স রোভার মঙ্গলের মাটি ও পাথরের নমুনা সংগ্রহ শুরু করে। ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার সঙ্গে যৌথ পরিকল্পনায়, এগুলি পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা জারি থাকলেও, অতিরিক্ত খরচ ও জটিলতার কারণে তা আপাতত স্থগিত রয়েছে। এই ধরনের মিশনে খরচ অত্যন্ত বেশি। তাই শুধু “প্রথম হওয়া’’বা শিল্পোন্নয়নের যুক্তি দিয়ে মহাকাশ অভিযানের প্রয়োজনীয়তা বোঝানো যথেষ্ট নয়। ভবিষ্যতে স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরাও যাতে চাঁদের রোভার পরিচালনা করতে পারে বা মঙ্গলের জন্য উপগ্রহ প্রস্তুত করতে পারে, এমন সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বাড়বে এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতাও বৃদ্ধি পাবে।

বর্তমানে পৃথিবীর ছয়টি মহাদেশে ৭০টিরও বেশি মহাকাশ সংস্থা কাজ করছে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছে। মিশন মঙ্গল পরিচালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বে। যেমন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রথম মঙ্গল গ্রহ অভিযান “হোপ’’ বা আল-আমাল। আবার চীনের জাতীয় মহাকাশ প্রশাসন, চাঁদের দূরবর্তী অংশের নমুনা বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীদের সঙ্গে ভাগ করেছে। রাশিয়া এবং যুক্তরাজ্য এখনও ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশনে একসঙ্গে কাজ করছে। এই প্রেক্ষাপটে আর্টেমিস সমঝোতা চুক্তি আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। সব মিলিয়ে, আর্টেমিস কর্মসূচীর সাফল্য নির্ভর করবে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার, বৈজ্ঞানিক গবেষণার অগ্রাধিকার এবং নতুন প্রজন্মকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ওপর। পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সঙ্গে সংযোগও বাড়াতে হবে। চাঁদ থেকে মঙ্গল- এই দীর্ঘ যাত্রাপথে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া গেলে, ভবিষ্যতে মানুষ সত্যিই একটি মহাকাশভিত্তিক সভ্যতা গড়ে তুলতে পারবে! এমন আশাই করছেন বিজ্ঞানীরা।

 

সূত্র: Nature, March, 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

3 × 5 =