একাকিত্বের দুষ্টচক্র ও তার প্রতিকার

একাকিত্বের দুষ্টচক্র ও তার প্রতিকার

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৫ এপ্রিল, ২০২৬

আজকের আধুনিক যুগে আমরা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি সংযুক্ত একে অপরের সঙ্গে । কিন্তু তাও যেন ভেতরে ভেতরে বিচ্ছিন্ন। যুক্তরাষ্ট্রে পরিচালিত এক বৃহৎ পরিসরের গবেষণা এই বাস্তব চিত্রকে সবার সামনে তুলে ধরেছে। প্রায় ৬৫,০০০ কলেজ শিক্ষার্থীকে নিয়ে এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, অর্ধেকেরও বেশি ১৮ থেকে ২৪ বছরের তরুণ-তরুণীরা চরম একাকিত্বে ভুগছে। এই গবেষণাটির বিশদ বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে জার্নাল অফ আমেরিকান কলেজ হেলথ-এ।

এই একাকিত্বের জন্য দায়ী দৈনন্দিন অভ্যাস। বিশেষ করে দীর্ঘক্ষণ সোশ্যাল মিডিয়ার অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার। গবেষণায় দেখা যায়, প্রতিদিন মাত্র ২ ঘণ্টা (সপ্তাহে প্রায় ১৬ ঘণ্টা) সোশ্যাল মিডিয়ায় কাটালেও একাকিত্বের অনুভূতি যেন আরও বাড়ে। আর যারা সপ্তাহে ৩০ ঘণ্টার বেশি সময় অনলাইনে থাকে, তারা প্রায় ৩৮% বেশি একলা অনুভব করে। অর্থাৎ, ভার্চুয়াল সংযোগ যত বাড়ছে, বাস্তব সংযোগ ততই ফিকে হয়ে যাচ্ছে।

এই গবেষণার নেতৃত্ব দেন ম্যাডেলিন জে. হিল। তাঁর মতে, একাকিত্ব কোনো সাধারণ আবেগ নয়, এটি আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য একটি গুরুতর বিপদ। এতে বিষণ্নতার ঝুঁকি বাড়ে, এমনকি দীর্ঘমেয়াদে শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে কলেজে নতুন জীবন শুরু করার সময়, যখন বন্ধুত্ব, পরিচয় ও আত্মপরিচয় গড়ে ওঠে, তখন এই একাকিত্ব আরও গভীরভাবে আঘাত করে।

গবেষণায় আরও যেটা বিশেষ দেখা গেছে, নারী ও কৃষ্ণাঙ্গ শিক্ষার্থীদের মধ্যে একাকিত্বের হার বেশি। যারা বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করে, তারা ক্যাম্পাসে থাকা শিক্ষার্থীদের তুলনায় বেশি বিচ্ছিন্ন বোধ করে। অন্যদিকে, যারা বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, ক্লাব বা গ্রুপে যুক্ত, তারা তুলনামূলকভাবে কম একাকিত্ব অনুভব করে। কারণ তারা বাস্তব জীবনে নিয়মিত মানুষের সংস্পর্শে থাকে।

তবে এই সম্পর্ক একমুখী নয়। অনেক সময় একাকী মানুষই বেশি সোশ্যাল মিডিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়ে সান্ত্বনা বা সংযোগ খুঁজতে। ফলে একাকিত্বের বিষয়টি এক চক্রে আবর্তিত হয়। একদিকে একাকিত্ব অনলাইন নির্ভরতাকে বাড়াচ্ছে, আবার অনলাইন নির্ভরতা বেশি বাড়লেও মানুষ সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে একা হচ্ছে।

গবেষকরা মনে করেন, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সক্রিয় ভূমিকা জরুরি। শিক্ষার্থীদের সচেতন করা, সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে সংযম শেখানো এবং ক্যাম্পাসে সামাজিক কার্যক্রম বাড়ানো। এই পদক্ষেপগুলো বাস্তব মানবিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে সাহায্য করতে পারে।

প্রযুক্তি আমাদের কাছাকাছি এনেছে ঠিকই , সেইসঙ্গে সত্যিকারের সম্পর্কের উষ্ণতা কেড়ে নিয়েছে। আর সেই হারিয়ে যাওয়া সংযোগই আজকের তরুণ প্রজন্মের একাকিত্বের মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সূত্র: “Exploration of excessive social media use with loneliness among U.S. College students” by Madelyn J. Hill, Keith A. King,et.al; 15th February 2026, published in Journal of American College Health.

DOI: 10.1080/07448481.2025.2573108

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

17 + nineteen =