ওজন কমানোর নতুন দিশা 

ওজন কমানোর নতুন দিশা 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৬ জানুয়ারী, ২০২৬

চিকিৎসকের চেম্বারে বসে কত মানুষই না বছরের পর বছর শুনে এসেছে সেই একই বাক্য—“কম খান, বেশি হাঁটুন।“ কথাগুলো পরিচিত ঠিকই, কিন্তু বাস্তবে এই পরামর্শ বহু রোগীর জন্য যথেষ্ট নয়। কলোরাডোর এক এন্ডোক্রিনোলজিস্ট/হরমোন বিশেষজ্ঞ ড. লি পেরোর কাছে এই পুনরাবৃত্ত উপদেশ একদিন অসহনীয় হয়ে ওঠে। রোগীর ফাইলের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ তাঁর মনে হয়—তিনি কি শুধু উপসর্গের চিকিৎসা করছেন, সমস্যার মূলকে কি উপেক্ষা করছেন?

ড. পেরো লক্ষ্য করেন, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা কোলেস্টেরলের মতো সমস্যার জন্য তিনি নিয়মিত ওষুধ লিখে দিচ্ছেন, কিন্তু মূল সমস্যাটি অর্থাৎ অতিরিক্ত ওজন সেই উপেক্ষিতই থেকে যাচ্ছে। তাঁর বিশ্বাস ছিল, রোগীদের ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারলে এই সব রোগ নিজে থেকেই অনেকটা কমে যাবে। এই ভাবনা থেকেই তৈরি হয় PATHWEIGH, যা প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে ওজন নিয়ন্ত্রণের চিকিৎসাকে আলাদা গুরুত্ব দেয়।

PATHWEIGH কোনো ডায়েট ট্রেন্ড নয়, বা কোনো জাদু বড়িও নয়। এটি মূলত চিকিৎসার ভাষা ও কাঠামোর পরিবর্তন। এর মূল ধারণা খুবই সহজ—রোগীরা নিজেরাই চাইলে ওজন নিয়ন্ত্রণের জন্য বিশেষ অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে পারবেন, যেখানে পুরো ভিজিটটাই ওজন-সম্পর্কিত চিকিৎসার ওপরেই থাকবে। এই ভিজিটে সময় নেই বলে ওজন সংক্রান্ত আলোচনা আর থামিয়ে রাখা , সেসব হবে না। পুরো সময়টাই বরাদ্দ থাকবে ওজন ও স্বাস্থ্য নিয়ে বাস্তব সিদ্ধান্তের জন্য।

কলোরাডোর ইউ সি হেলথ-এর ৫৬টি প্রাইমারি কেয়ার ক্লিনিকে এই পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। প্রায় ২ লাখ ৭৪ হাজার রোগীকে নিয়ে পরিচালিত এই বিশাল বাস্তবভিত্তিক পরীক্ষাটি এই ক্ষেত্রের অন্যতম বৃহৎ গবেষণা। এত বৃহৎ পরিসরে বাস্তব জীবনের চিকিৎসা ব্যবস্থায় এমন পরীক্ষা বিরল। ফলাফল প্রকাশিত হয় নেচার মেডিসিন-এ। তা আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের জগতে সাড়া ফেলে দেয়।

দেখা গেছে, ১৮ মাসে গড় জনসংখ্যাগত ওজন বৃদ্ধি ০.৫৮ কেজি কমে যায়, অর্থাৎ যেখানে সাধারণত ওজন বাড়ার কথা, সেখানে সেই প্রবণতা থেমে গিয়ে উল্টে ওজন হ্রাস পেতে শুরু করে। পাশাপাশি, ওজন-সম্পর্কিত চিকিৎসা পাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায় ২৩ শতাংশ। এমনকি যেসব রোগী সরাসরি চিকিৎসা নেননি, তাঁদের মধ্যেও স্বাভাবিকের তুলনায় কম ওজন বৃদ্ধি দেখা গেছে।

এই সাফল্যের আরেকটি দিক আরও মানবিক। ওজন নিয়ে লজ্জা, অপরাধবোধ আর অস্বস্তিকর নীরবতাকে ভেঙে দিয়েছে PATHWEIGH। রোগীরা আর মনে করেন না যে সাহায্য চাইলে তাকে জেরা করা হবে। বরং তাঁরা জানেন, চাইলে সাহায্যের একটি নিরিবিলি পথ আছে। জীবনশৈলী পরিবর্তনের পরামর্শের পাশাপাশি স্থূলত্ব-প্রতিরোধী ওষুধ ব্যবহারের হারও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

ব্যক্তিগত পর্যায়ে পরিবর্তন সামান্য মনে হলেও, সামগ্রিক জনস্বাস্থ্য স্তরে এর প্রভাব বিশাল। বছরে গড়ে আধা কেজি ওজন বাড়ার প্রবণতা যদি থামানো যায়, তাহলে ঘরে ঘরে মহামারির ন্যায় স্থূলতার গতিপথই বদলে যেতে পারে। স্থূলতার ক্রমবর্ধমান হার থামাতে PATHWEIGH একটি কার্যকর রূপরেখা হিসেবে উঠে এসেছে। ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজ্যে এই মডেল গ্রহণের উদ্যোগ চলছে। শুধু একটি প্রকল্প হিসেবেই নয়— ভবিষ্যতের ওজন চিকিৎসার সম্ভাব্য মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ড. পেরোর কথায়, এটাই ভবিষ্যতের পথ —যেখানে ওজনকে আর উপেক্ষিত সমস্যা হিসেবে নয়, বরং চিকিৎসার মূল অংশ হিসেবে দেখা হবে।

 

সূত্র: An endocrinologist tried a new weight loss approach and it worked by Leigh Perreault, Qing Pan, et.al; Materials provided by University of Colorado School of Medicine, published in Nature Medicine, 2025; DOI: 10.1038/s41591-025-04051-5

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

16 + seventeen =