আফ্রিকার গভীরে, সবুজ অরণ্য আর জলাভূমির স্তরে স্তরে লুকিয়ে আছে পৃথিবীর এক বিশাল “কার্বন ভাণ্ডার’’- কঙ্গো অববাহিকা। হাজার হাজার বছর ধরে এই অঞ্চলের ভূমিগহ্বর নীরবে জমিয়ে রেখেছে বিপুল পরিমাণ কার্বন। বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, এই কার্বন নিরাপদ, মাটির নীচে বন্দি। কঙ্গো অববাহিকার কালো জলধারার হ্রদ ও নদীগুলি “ব্ল্যাকওয়াটার” নামে পরিচিত। সম্প্রতি গবেষণায় দেখা গেছে, এই জলাভূমিগুলিই প্রাচীন কার্বন বায়ুমণ্ডলে ছেড়ে দিচ্ছে। অর্থাৎ, হাজার বছরের পুরনো কার্বন এখন আবার গিয়ে বাতাসে মিশছে। তাহলে পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কার্বন-সংগ্রাহক অঞ্চল কি ধীরে ধীরে কার্বনের উৎসে পরিণত হচ্ছে? সুইস ফেডারেল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি জুরিখ-এর বিজ্ঞানী ও প্রধান গবেষক ট্রাভিস ড্রেক বলছেন বিষয়টি নেহাত ছোট নয়, এটিকে “৩০ মিলিয়ন টনের প্রশ্ন’’ হিসেবে বর্ণনা করা যেতে পারে। তাঁর ভাষায়, “আমাদের বুঝতে হবে, এটা কি স্বাভাবিক সামান্য গ্যাস বেরিয়ে আসার ঘটনা, নাকি এক বৃহৎ অস্থিতিশীলতার শুরু ?” এই রহস্যের উত্তর খুঁজতে ড্রেক ও তাঁর দল গত চার বছরে তিনবার অভিযান চালান কঙ্গো অববাহিকার অন্তঃস্থলে। তাঁদের গন্তব্য ছিল কুভেট সেন্ট্রাল। এটি এক বিশাল জলাভূমি, যা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ‘উষ্ণমণ্ডলীয় ভূমিগহ্বর কমপ্লেক্স’ হিসেবে পরিচিত। এই অঞ্চলের অন্তরে রয়েছে বিশাল দুই হ্রদ— লেক মাই এনডোম্বে ও লেক টুম্বা আর তাদের সঙ্গে যুক্ত রুকি নদী। জলাধারগুলোর রং কালচে, কারণ এতে ভাসমান থাকে পচে যাওয়া উদ্ভিদের অবশিষ্টাংশ, যা হল দ্রবীভূত জৈব কার্বন। এই জৈব পদার্থ এবং আশেপাশের বন ও জলাভূমি থেকে নির্গত কার্বন ডাই-অক্সাইড মিলে জলকে করে তোলে কার্বন- ডাই অক্সাইডে অতিসম্পৃক্ত। ফলে এই হ্রদ ও নদীগুলো বায়ুমণ্ডলে বিপুল পরিমাণ কার্বন- ডাই অক্সাইড ছাড়ে। কিন্তু এতদিন ধারণা ছিল, এই কার্বন- ডাই অক্সাইড আসে কেবল সাম্প্রতিক পচা উদ্ভিদ ও জৈব পদার্থ থেকে, যা প্রাচীন ভূমি গহ্বরের কার্বন নয়। কারণ ভূমি গহ্বরের কার্বন সাধারণত অক্সিজেনহীন, জলাবদ্ধ পরিবেশে সংরক্ষিত থাকে। সেটাই তাকে স্থিতিশীল রাখে। কিন্তু সদ্য প্রকাশিত এই গবেষণা বলছে, এর একটি বড় অংশ এসেছে ২,০০০ থেকে ৩,৫০০ বছর পুরনো ভূমি গহ্বরের কার্বন থেকেই! অর্থাৎ, হাজার বছর ধরে মাটির নীচে বন্দি কার্বন এখন মুক্ত হয়ে যাচ্ছে। গবেষকরা ক্ষেত্রীয় সমীক্ষার কঠিন পরিমাপের মাধ্যমে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান। ২০২২ ও ২০২৪ সালে লেক মাই এনডোম্বে এবং ২০২৫ সালে লেক টুম্বা ও রুকি নদী থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়। ছোট নৌকায় করে হ্রদের উত্তাল জলে কাজ করা ছিল বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। সংগৃহীত নমুনায় তারা পরিমাপ করেন দ্রবীভূত জৈব ও অজৈব কার্বন, গ্রিনহাউস গ্যাস এবং তলানি। পরে অত্যাধুনিক স্পেকট্রোমেট্রি প্রযুক্তি ব্যবহার করে নির্ণয় করা হয়, কোন কার্বন নতুন, আর কোনটি হাজার বছরের পুরনো। প্রথম নমুনাতেই দেখা যায় প্রায় ৪০% অজৈব কার্বনই প্রাচীন। এরপর একে একে সব নমুনা পরীক্ষা করে একই ফল পাওয়া যায়। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, ওই অববাহিকার অণুজীবগুলিই কার্বন ভেঙে কার্বন- ডাই অক্সাইড ও মিথেনে রূপান্তর করছে। এরপর সেই গ্যাস জলপথে হ্রদ ও নদীতে মিশে বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ছে। এখানেই লুকিয়ে আছে বড় বিপদ। কুভেট সেন্ট্রালে রয়েছে বিশ্বের উষ্ণমণ্ডলীয় ভূমি গহ্বরের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কার্বন, প্রায় ৩৩ বিলিয়ন টন। যদি এই ভাণ্ডার অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে, তবে তা বৈশ্বিক জলবায়ুর উপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এটি হয়তো প্রাকৃতিক ভারসাম্যের অংশও হতে পারে, যেখানে পুরনো গহ্বর ভেঙে নতুন গহ্বর তৈরি হচ্ছে। কিন্তু অন্য সম্ভাবনাটি আরও উদ্বেগজনক। জলবায়ু পরিবর্তন হয়তো এই স্থিতিশীল ব্যবস্থাকে ভেঙে দিচ্ছে। বিশেষ করে যদি ভবিষ্যতে খরা দেখা দেয়, তাহলে এই কার্বন নিঃসরণের গতি আরও বেড়ে যেতে পারে। তখন এই অঞ্চল “কার্বন সিংক’’ থেকে “কার্বনের উৎসে”-এ পরিণত হতে পারে, যা পৃথিবীর উষ্ণায়নকে আরও ত্বরান্বিত করবে।
সূত্র: Live Science; Rivers & Oceans; March 2026
