কলেরা প্রতিরোধে প্রোটিন সমৃদ্ধ খাদ্য

কলেরা প্রতিরোধে প্রোটিন সমৃদ্ধ খাদ্য

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৮ জানুয়ারী, ২০২৬

কলেরা এখনও বিশ্বের বহু দরিদ্র ও উন্নয়নশীল অঞ্চলে এক নির্মম বাস্তবতা। বিশুদ্ধ পানীয় জলের অভাব, অপর্যাপ্ত পয়ঃ নিষ্কাশন ব্যবস্থার এবং সীমিত চিকিৎসা ব্যবস্থার দরুন এই ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ প্রতিবছর অসংখ্য মানুষের জীবন বিপন্ন করে তোলে। তীব্র ডায়রিয়া ও শরীরে জলশূন্যতার মাধ্যমে এ রোগ দ্রুত প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে যেসব অঞ্চলে বিশুদ্ধ পানীয় জলের অভাব রয়েছে সেখানে আজও কলেরা বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। যেমন, এশিয়া ও সাহারা – নিম্নবর্তী আফ্রিকার বহু অংশে। এ যাবৎ কলেরা মোকাবিলার মূল অস্ত্র ছিল স্যালাইন, ও প্রয়োজনে অ্যান্টিবায়োটিক। কিন্তু সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা একটা অদ্ভুত জিনিস দেখিয়েছেন। আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাস, বিশেষ করে প্রোটিন সমৃদ্ধ খাদ্য কলেরা সংক্রমণের ঝুঁকি ও তীব্রতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে।

ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রিভারসাইড-এর বিজ্ঞানীদের গবেষণায় দেখা গেছে, প্রোটিন সমৃদ্ধ খাদ্য কলেরা সংক্রমণের তীব্রতা কমিয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে দুধ ও চিজে থাকা কেসিন এবং গমের গ্লুটেন প্রোটিন, অন্ত্রে কলেরা ব্যাকটেরিয়ার বসতি স্থাপনের ক্ষমতাকে প্রায় অচল করে দেয়। গবেষণাপত্রের প্রধান লেখক অধ্যাপক অ্যানসেল হসিয়াও জানান, শুধুমাত্র খাদ্যের ভিন্নতার কারণে অন্ত্রে কলেরা ব্যাকটেরিয়ার পরিমাণে ১০০ গুণ পর্যন্ত পার্থক্য দেখা গেছে—যা চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

গবেষণাটি করা হয়েছিল ইঁদুরের ওপর। সংক্রমিত ইঁদুরদের বিভিন্ন ধরনের খাদ্য খাওয়ানো হয়—কখনো উচ্চ-চর্বিযুক্ত, কখনো উচ্চ-কার্বোহাইড্রেট, আবার কখনো উচ্চ-প্রোটিন। ফলাফল হিসেবে দেখা গেছে চর্বিযুক্ত খাদ্য প্রায় কোনো কাজই করেনি, কার্বোহাইড্রেট সামান্য উপকার দিয়েছে, কিন্তু দুগ্ধজাত প্রোটিন ও গমের গ্লুটেন কলেরা ব্যাকটেরিয়ার বিস্তার কার্যত থামিয়ে দেয়।

এই সাফল্যের পেছনের কারণটি আরও চমকপ্রদ। গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা জানতে পারেন, এই বিশেষ প্রোটিনগুলো কলেরা ব্যাকটেরিয়ার গায়ে থাকা এক সূক্ষ্ম সূচের মতো গঠনকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়। এই গঠনটি ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার করে আশপাশের কোষে বিষ ঢুকিয়ে দেয় এবং প্রতিযোগী উপকারী ব্যাকটেরিয়াকে ধ্বংস করে। একে বলা হয় টাইপ-৬ সিক্রেশন সিস্টেম (T6SS)। এই ব্যবস্থাটি দুর্বল হয়ে পড়লে কলেরা অন্ত্রে আধিপত্য বিস্তার করতে পারে না।

জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে এই আবিষ্কার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে কলেরার চিকিৎসা মূলত স্যালাইন ও তরল পদার্থের ওপর নির্ভরশীল। অ্যান্টিবায়োটিক এ রোগের সময়কাল কিছুটা কমালেও বিষক্রিয়া বন্ধ করতে পারে না। তাছাড়া অতিরিক্ত ব্যবহারে ব্যাকটেরিয়ার ওষুধ-প্রতিরোধী হয়ে ওঠার ঝুঁকি থাকে। সে তুলনায় খাদ্যভিত্তিক প্রতিরোধ কৌশল নিরাপদ, সস্তা এবং অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের ঝুঁকিমুক্ত।

যদিও এই গবেষণা এখনো প্রাণীর ওপর সীমাবদ্ধ, গবেষকদের ধারণা, মানুষের ক্ষেত্রেও প্রোটিন সমৃদ্ধ খাদ্য অনুরূপ সুরক্ষা দিতে পারে। ভবিষ্যতে মানব অন্ত্রের জীবাণুর ওপর এই প্রভাব পরীক্ষা করার পরিকল্পনাও রয়েছে। গবেষকদের মতে, সঠিক খাদ্যাভ্যাস শুধু কলেরা নয়, অন্যান্য সংক্রামক রোগ থেকেও মানুষকে রক্ষা করার এক শক্তিশালী উপায় হতে পারে।

 

সূত্র: “Diet modulates Vibrio cholerae colonization and competitive outcomes with the gut microbiota” by Rui Liu, Yue Zhang,et.al ,1st December 2025, Cell Host & Microbe.

DOI: 10.1016/j.chom.2025.11.004

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

one × three =