শতাব্দীর পর শতাব্দী মানুষ ভেবেছে জ্যামিতিক বোধ যেন তাদের নিজস্ব দক্ষতা। কোনো আকৃতির গঠন চিনে নেওয়া, সোজা কোণ, সমান্তরাল রেখা, সমমিতি- এসবই মানবমস্তিষ্কের বিশেষ ক্ষমতা বলে মনে করা হতো। কিন্তু নতুন এক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, এই জ্যামিতিক অন্তর্দৃষ্টি শুধু মানুষের মধ্যে নেই। কাকও তা বুঝতে পারে অনায়াসে। জার্মানির টিউবিঙ্গেন বিশ্ববিদ্যালয়-এর গবেষকদের এক পরীক্ষায় দেখা গেছে, ক্যারিয়ন ক্রো বা দাঁড়কাকরা আকৃতির ভেতরে লুকিয়ে থাকা জ্যামিতিক নিয়ম শনাক্ত করতে পারে। বহুদিন ধরেই করভিড গোত্রের পাখিদের বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের আগ্রহ ছিল। কারণ, এরা সরঞ্জাম ব্যবহার করতে পারে, সমস্যা সমাধান করতে পারে, এমনকি সংখ্যা গোনার ক্ষমতাও এদের মধ্যে রয়েছে। কিন্তু এবার তাদের আকৃতির ভেতরের নিয়ম ধরতে পারার ক্ষমতা লক্ষ্য করা গেছে। এই গবেষণা শুধু পাখির বুদ্ধিমত্তার গল্প নয়। এটি আরও বড় প্রশ্ন তুলছে, আমরা যেভাবে স্থান, আকার ও গঠন বুঝি, সেই বোধ কি সত্যিই শুধু মানুষের? নাকি তার শিকড় আরও গভীরে, বিবর্তনের ইতিহাসে? জ্যামিতি বলতে আমরা সাধারণত স্কুলে শেখা গণিত বা স্থাপত্যের নকশাকে বুঝি। কিন্তু তার আসল ভিত্তি অন্য জায়গায়। এটি আসলে গঠন চিনে নেওয়ার একটি বিশেষ ক্ষমতা যা মস্তিষ্কের থাকে। মানুষের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, যারা কখনও আনুষ্ঠানিকভাবে গণিত শেখেনি তারাও সহজ জ্যামিতিক নিয়ম ধরতে পারে। সমমিতিও তাদের চোখে পড়ে। সমান্তরাল রেখা আলাদা করে ধরা পড়ে। সমান বাহু বা সোজা কোণ থাকলে তা সহজেই বোঝা যায়। যদি একটু কিছু বেঁকা টেরা থাকে, তাহলে সেটি দেখেও কিছু একটা “ঠিক নেই”-এমন অনুভূতি আমরা দ্রুত পাই। দীর্ঘদিন মনে করা হতো, অন্য প্রাণীরা এসব সূক্ষ্ম জ্যামিতিক নিয়ম বুঝতে পারে না। তারা পথ খুঁজে নিতে পারে, সংখ্যা আন্দাজ করতে পারে, এমনকি সরঞ্জামও ব্যবহার করতে পারে, কিন্তু আকৃতির গভীর নিয়ম তাদের নজরে পড়ে না। একসময় বেবুনদের উপর করা গবেষণাও এই ধারণাকে শক্ত করেছিল। সেখানে দেখা গিয়েছিল, নিয়মিত চতুর্ভুজ আকৃতি, যথা- বর্গ বা সামান্তরিক, তারা আলাদা করে চিনতে ব্যর্থ হয়। তখন অনেক বিজ্ঞানী ভাবতে শুরু করেন, জ্যামিতিক অন্তর্দৃষ্টি হয়তো মানুষের একান্ত বৈশিষ্ট্য। কিন্তু কাক সেই ধারণা ভেঙে দিল। গবেষণাটির নেতৃত্বে ছিলেন স্নায়ুবিজ্ঞানী আন্দ্রেয়াস নিডার। তাঁর কথায়, “শুধু মানুষই জ্যামিতিক নিয়ম শনাক্ত করতে পারে, এই দাবি এখন আর টেকে না। অন্তত কাক এই কাজ করতে পারে।‘’ গবেষণায় দুটি পুরুষ দাঁড় কাককে ব্যবহার করা হয়। তাদের বয়স দশ বছরের বেশি। তারা আগে থেকেই টাচস্ক্রিনে ঠোকর দিয়ে কাজ করতে প্রশিক্ষিত ছিল এবং আগের পরীক্ষায় সংখ্যা গোনার দক্ষতাও দেখিয়েছিল। এবার তাদের সামনে নতুন পরীক্ষা দেওয়া হয়। স্ক্রিনে একসঙ্গে ছয়টি আকৃতি দেখানো হল। পাঁচটি একই রকম, একটি আলাদা। কাজ ছিল, অন্যদের থেকে ভিন্ন আকৃতিটিকে ঠোকর মেরে বেছে নেওয়া। শুরুর দিকে কাজটি সহজ ছিল। যেমন পাঁচটি তারা আর একটি অর্ধচন্দ্র। কাক খুব দ্রুত নিয়মটি শিখে ফেলল। যেটা আলাদা, সেটাই বেছে নিতে হবে। আর সঠিক উত্তর দিলে পুরস্কার, রসালো মিলওয়ার্ম বা কেঁচো জাতীয় পোকা। এরপর শুরু হয় আসল পরীক্ষা। গবেষকেরা স্ক্রিনে দেখাতে লাগলেন নানা চতুর্ভুজ আকৃতি। বর্গ, ট্রাপিজিয়াম, সামান্তরিক, কিংবা সামান্য বিকৃত চতুর্ভুজ। পার্থক্যগুলো খুব সূক্ষ্ম। কোথাও একটি কোণ একটু সরানো হয়েছে, কোথাও সমমিতি ভেঙে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, চোখে পড়ার মতো বড় পার্থক্য নয়। বরং জ্যামিতিক নিয়মের সূক্ষ্ম ভাঙন। আশ্চর্যের বিষয়, কাকরা এই পার্থক্য ধরতে পারল। প্রথম পরীক্ষাতেই তাদের সাফল্য ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রথম কাকটি প্রায় ৫০ শতাংশ ক্ষেত্রে সঠিক উত্তর দেয়, দ্বিতীয়টি প্রায় ৬০ শতাংশ। অথচ ছয়টি বিকল্পের মধ্যে আন্দাজে সঠিক হওয়ার সম্ভাবনা ছিল মাত্র ১৬.৭ শতাংশ। আকৃতিগুলো প্রতিবার ঘোরানো বা বড়-ছোট করা হলেও তারা একইভাবে শনাক্তকরনের কাজ করতে থাকে। “অপরিচিত’’আকৃতি প্রতি পরীক্ষায় ভিন্ন জায়গায় থাকত। তবুও কাকের সাফল্যের হার অনেক বেশি ছিল। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণও দেখায়, আকৃতির জ্যামিতিক নিয়ম যত শক্তিশালী, কাকদের জন্য ভিন্ন আকৃতি শনাক্ত করা তত সহজ হয়েছে। যেমন সমান্তরাল বাহু, সোজা কোণ, সমান দৈর্ঘ্য। এমনকি এই দক্ষতার জন্য তাদের আলাদা করে দীর্ঘ প্রশিক্ষণেরও দরকার হয়নি। গবেষকেরা আরও খতিয়ে দেখেন বিভিন্ন ধরনের চতুর্ভুজের ক্ষেত্রে কাকের পারফরম্যান্স কেমন। দেখা যায়, নিয়মিত আকৃতিতে তারা বেশি সফল, আর আকৃতি যত অনিয়মিত হয় ততই ভুল বাড়ে। রম্বাস বা সমবাহু সামান্তরিক যা আসলে খুব নিয়মিত আকৃতি, তা মানুষ ও কাক দুজনকেই কিছুটা বিভ্রান্ত করে। সম্ভবত আমাদের দৃষ্টিগত পক্ষপাত এখানে কাজ করে। কোনো বৈশিষ্ট্যকে আমরা বেশি গুরুত্ব দিই, কোনোটাকে কম। তাই জ্যামিতিক বোধ হয়তো শুধু সভ্যতার সৃষ্টি নয়। এটি মস্তিষ্কের গভীরে থাকা এক প্রাচীন ক্ষমতা, যা বিবর্তনের পথে নানা প্রাণীর মধ্যে তৈরি হয়েছে। কাক তো কখনও শ্রেণিকক্ষে বসে জ্যামিতি শেখেনি, কোণ মাপেনি, উপপাদ্য প্রমাণ করেনি। তবুও তারা আকৃতির ভেতরের নিয়ম বুঝেছে। কোনটি গঠনের সঙ্গে মেলে, কোনটি বেমানান, তা তারা ধরতে পেরেছে। আর এখানেই লুকিয়ে আছে জ্যামিতির আসল সারকথা। সম্ভবত স্থান আর আকার বোঝার যে ক্ষমতা আমরা এতদিন মানুষের সাংস্কৃতিক আবিষ্কার বলে ভেবেছি, তার শিকড় আসলে আরও গভীরে। তা মানুষের মস্তিষ্কে যেমন আছে, তেমনই হয়তো কাকের মধ্যেও আছে। হয়তো দেখা যাবে আরও অনেক প্রাণীর মধ্যেও এই ক্ষমতা আছে।
সূত্র: Earth . com ; March, 2026
