কৃবুর প্রকোপে গবেষণার সংকট

কৃবুর প্রকোপে গবেষণার সংকট

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণার ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে, বলাই বাহুল্য। কিন্তু সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধান দেখাচ্ছে—এই প্রযুক্তির অতিরিক্ত ও অসতর্ক ব্যবহার এখন একাডেমিক জগতের জন্য বড় বিপদ হয়ে উঠছে। বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ এআই গবেষণা সম্মেলন NeurIPS (Conference on Neural Information Processing Systems)–এ গৃহীত একাধিক গবেষণাপত্রে এআই-সৃষ্ট ভুয়ো তথ্য ও কাল্পনিক উদ্ধৃতির উপস্থিতি সেই আশঙ্কাকেই আরও জোরালো করেছে।

এ আই শনাক্তকারী সংস্থা GPTZero-এর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, NeurIPS-এ গৃহীত অন্তত ৫১টি প্রবন্ধে ১০০টিরও বেশি ভুয়ো তথ্যসূত্র রয়েছে। এসব উদ্ধৃতির মধ্যে আছে এমন গবেষণা, লেখক ও প্রকাশনার উল্লেখ, যেগুলোর বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব নেই। গবেষকরা একে বলছেন— কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অলীক দর্শন ( এ আই হ্যালুসিনেশান)। মূলত জেনারেটিভ এআই টুল ব্যবহার করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে লেখা বা সম্পাদনার সময় এসব ভুল ঢুকে পড়ছে, যা গবেষণার গ্রহণযোগ্যতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে। অর্থাৎ, গবেষণার কাঠামো ঠিক থাকলেও ভিতরে ঢুকে পড়েছে এআই-সৃষ্ট অলীক দর্শন।

GPTZero-এর গবেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই প্রবণতার পেছনে রয়েছে গবেষণা প্রকাশনার এক অদ্ভুত দৌড়। ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে NeurIPS-এ জমা পড়া প্রবন্ধের সংখ্যা বেড়েছে ২২‍০ শতাংশেরও বেশি। এত বিপুল সংখ্যক লেখা যাচাই করতে গিয়ে রিভিউ প্রক্রিয়া ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞের অভাব, সময়ের চাপ এবং অতি-নির্ভরতা—সব মিলিয়ে ত্রুটি অনিবার্য হয়ে উঠছে।

তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, ত্রুটি কেবল ভুয়ো উদ্ধৃতিতে সীমাবদ্ধ নয়। সাম্প্রতিক এক প্রি-প্রিন্ট গবেষণায় দেখা গেছে, শীর্ষস্থানীয় এআই সম্মেলন ও জার্নালে প্রকাশিত প্রবন্ধে গাণিতিক ভুল, সূত্রগত অসংগতি ও তথ্যগত ত্রুটির সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। NeurIPS-এর ক্ষেত্রে ২০২১ সালে যেখানে প্রতি প্রবন্ধে গড়ে ৩.৮টি ভুল ছিল, ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫.৯টিতে—অর্থাৎ প্রায় ৫৫ শতাংশ বৃদ্ধি।

আইন জগতেও একই চিত্র দেখা গেছে। আদালতে দাখিল করা নথিতে এআই-সৃষ্ট ভুয়ো উদ্ধৃতির কারণে ইতিমধ্যেই শত শত মামলা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। যদিও একাডেমিক গবেষণায় আইনি শাস্তির কঠোরতা তুলনামূলকভাবে কম, তবুও এর প্রভাব অনেক গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী। ভুল তথ্যের ভিত্তিতে গবেষণা ভবিষ্যতের বিজ্ঞানকে ভুল পথে চালিত করতে পারে।

NeurIPS কর্তৃপক্ষ অবশ্য বলছে, ভুল উদ্ধৃতি থাকলেই গবেষণার মূল বিষয়বস্তু অকার্যকর হয়ে যায় না। অনেক ক্ষেত্রে গবেষকরা কেবল রেফারেন্স ফরম্যাট করতে এআই ব্যবহার করে থাকতে পারেন। একটি বা দুটি ভুল উদ্ধৃতি পুরো গবেষণাকে বাতিল করে না। কিন্তু সমালোচকদের মতে, এ কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—বরং একটি বড় সমস্যার উপসর্গ। প্রকাশনার সংখ্যাকে সাফল্যের মানদণ্ড বানিয়ে ফেলায় গুণগত মান ক্রমেই উপেক্ষিত হচ্ছে।

মোটকথা , কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণার সহায়ক শক্তি হতে পারে। কিন্তু দায়িত্বশীল ব্যবহার, কঠোর যাচাই প্রক্রিয়া ও নীতিগত সংস্কার ছাড়া এই প্রযুক্তিই বিজ্ঞানকে তার নিজস্ব বিশ্বাসযোগ্যতা থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে।

 

সূত্র: AI conference’s papers contaminated by AI hallucinations, Updated on 23rd January 2026 to include a statement from NeurIPS.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nineteen + twelve =