কোষ কেন্দ্রকের ‘মিনি মেটাবলিজম’

কোষ কেন্দ্রকের ‘মিনি মেটাবলিজম’

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৫ মার্চ, ২০২৬

মানবকোষের কেন্দ্রককে এতদিন ভাবা হত ‘জেনেটিক আর্কাইভ’। সেখানে শুধু ডিএনএ সংরক্ষিত থাকে, আর সেখান থেকেই নিয়ন্ত্রিত হয় জীবনের নির্দেশাবলি। আর শক্তি তৈরি, রাসায়নিক বিক্রিয়া বা কোষের জ্বালানি তৈরির কাজ হয় কোষের অন্য অংশে। কিন্তু নতুন এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন, মানুষের ডিএনএ-র উপরেই নীরবে কাজ করে চলেছে শত শত শক্তি তৈরির উৎসেচক। কোষের কেন্দ্রকের ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক ক্ষুদ্র “মিনি মেটাবলিজম”। এ একরকমের গোপন রাসায়নিক কারখানা, যা ক্যান্সার কোষ কীভাবে বেঁচে থাকে বা চিকিৎসার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে, তাকে প্রভাবিত করতে পারে। দেখা গেছে, মানুষের কোষে ২০০-রও বেশি মেটাবলিক উৎসেচক সরাসরি ডিএনএ-র ওপর বা তার খুব কাছাকাছি অবস্থান করছে। এদের অনেকগুলিই সাধারণত কোষের শক্তি উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত। এরা মাইটোকন্ড্রিয়া-র ভেতরে কাজ করে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, একই উৎসেচকগুলোকে কোষের নিউক্লিয়াসে, ডিএনএ-র সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করতেও দেখা যাচ্ছে। তবে সব কোষে এই উৎসেচকগুলির বিন্যাস এক নয়। বিভিন্ন কোষকলা, বিভিন্ন কোষপ্রকার, এমনকি বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সারে উৎসেচকগুলির আলাদা আলাদা প্যাটার্ন দেখা যাচ্ছে। গবেষকরা এটিকে বলছেন কোষের “নিউক্লিয়ার মেটাবলিক ফিঙ্গারপ্রিন্ট” অর্থাৎ নিউক্লিয়াসের নিজস্ব বিপাকীয় স্বাক্ষর। উৎসেচকগুলি আসলে সেখানে কী করছে, তা এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তবে বিজ্ঞানীদের ধারণা, তারা হয়তো নিউক্লিয়াসে রাসায়নিক বিক্রিয়া চালাচ্ছে, জিন চালু বা বন্ধ হওয়ার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করছে, কিংবা ডিএনএ-র গঠনকে স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করছে। সহ গবেষক সারা স্দেলচি জানিয়েছেন, “অনেক উৎসেচকই জীবনের মৌলিক রাসায়নিক উপাদান তৈরি করে। আর যখন এগুলো নিউক্লিয়াসে থাকে, তখন সেগুলো ডিএনএ মেরামতের প্রক্রিয়ার সঙ্গেও জড়িয়ে পড়তে পারে”। বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ক্যান্সারের অনেক চিকিৎসা, যেমন কেমোথেরাপি ডিএনএ-কে ক্ষতিগ্রস্ত করে ক্যান্সার কোষকে ধ্বংস করার চেষ্টা করে। যদি নিউক্লিয়াসের এই উৎসেচকগুলি ডিএনএ মেরামত করতে সাহায্য করে, তবে তারা ক্যান্সার কোষকে চিকিৎসা থেকে বাঁচতেও সাহায্য করতে পারে। এই অদ্ভুত চিত্রটি দেখতে গবেষকরা ব্যবহার করেন একটি বিশেষ প্রযুক্তি, যা ডিএনএ-র প্যাকেজড রূপ অর্থাৎ ক্রোমাটিন-এর সঙ্গে যুক্ত প্রোটিনগুলোকে আলাদা করে শনাক্ত করতে পারে। এই পদ্ধতিতে তারা বিশ্লেষণ করেন ৪৪টি ক্যান্সার সেল লাইন এবং ১০ ধরনের সুস্থ কোষকে। দীর্ঘদিন ধরে জীববিজ্ঞানীরা মনে করতেন, কোষের বিপাক ক্রিয়া আর জিন নিয়ন্ত্রণ যেন দুই আলাদা জগৎ। জিন থাকে কেন্দ্রকে, আর শক্তি উৎপাদনের উৎসেচক কাজ করে কোষের অন্য অংশে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, এই দুই জগৎ ভিন্ন নয়, পরস্পরের সঙ্গে কথোপকথনে ব্যস্ত। গবেষণার প্রধান সাভাস কুর্তিস বলছেন, “ক্যান্সার কোষ হয়তো এই যোগাযোগ ব্যবস্থাকেই কাজে লাগিয়ে টিকে থাকে”। গবেষণায় আরও এক বিস্ময়কর বিষয় সামনে আসে। বিজ্ঞানীরা কেন্দ্রকের মধ্যে এমন কিছু উৎসেচক খুঁজে পান, যা সাধারণত অক্সিডেটিভ ফসফোরাইলেশন প্রক্রিয়ায় কাজ করে, যা হল কোষের অধিকাংশ শক্তি তৈরির মূল রাসায়নিক প্রক্রিয়া। অর্থাৎ শক্তি উৎপাদনের মেশিনের অংশবিশেষ যেন সরাসরি ডিএনএ-র কাছে গিয়ে বসেছে। আরও দেখা গেছে, উৎসেচকদের উপস্থিতি ক্যান্সারের ধরন অনুযায়ী বদলায়। যেমন, স্তন ক্যান্সার কোষে এই শক্তি-সম্পর্কিত উৎসেচকগুলি বেশি দেখা যায়, কিন্তু ফুসফুস ক্যান্সার কোষে সেগুলি প্রায় অনুপস্থিত। গবেষণায় একটি নির্দিষ্ট উৎসেচকের আচরণ বিশেষভাবে নজর কাড়ে, IMPDH2। উৎসেচকটি কোথায় অবস্থান করছে, তার ওপর নির্ভর করে এর কাজ পুরোপুরি বদলে যায়। নিউক্লিয়াসে থাকলে এটি জিনোমের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। কিন্তু কোষের অন্য অংশে থাকলে এটি ভিন্ন কোষীয় পথকে প্রভাবিত করে। এই আবিষ্কার ক্যান্সার চিকিৎসা সম্পর্কে নতুন প্রশ্ন তুলছে। কিছু ওষুধ ক্যান্সারের বিপাক প্রক্রিয়াকে আক্রমণ করে, আবার কিছু ডিএনএ মেরামত ব্যবস্থাকে নিশানা করে। যদি এই দুই ব্যবস্থা আসলে গভীরভাবে সংযুক্ত-ই হয়, তবে চিকিৎসার কৌশল নিয়েও নতুনভাবে ভাবতে হতে পারে। তবে প্রশ্ন এখনও অনেক। সব উৎসেচক কি নিউক্লিয়াসে সক্রিয়? তারা সেখানে কীভাবে প্রবেশ করে? নিউক্লিয়াসের দরজার মতো কাজ করা নিউক্লিয়ার রন্ধ্র সাধারণত বড় আকারের প্রোটিনকে ঢুকতে দেয় না। তবুও এই বিপুল সংখ্যক উৎসেচক সেখানে পৌঁছে যাচ্ছে। বিজ্ঞানীদের সন্দেহ, কোষ হয়তো এমন এক পরিবহন পদ্ধতি ব্যবহার করছে, যার কথা আমরা এখনও জানি না। যদি সেই রহস্য উদ্ঘাটিত হয়, তবে একদিন হয়তো বিজ্ঞানীরা সরাসরি নিউক্লিয়াসের এই গোপন মেটাবলিজমকেই নিশানা করে নতুন ক্যান্সার চিকিৎসা তৈরি করতে পারবেন।

 

সুত্র: Center for Genomic Regulation, Sci-Tech Daily; Ref: Nature Communications, March 2026,

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

four × 5 =