গাঁজানো খাবারের উপকারিতা

গাঁজানো খাবারের উপকারিতা

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৩১ মার্চ, ২০২৬

হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ জানত, ফারমেন্টেড বা গাঁজানো খাবার শরীরের জন্য ভালো। কিন্তু ঠিক কীভাবে এই খাবারগুলো কাজ করে, তা স্পষ্ট ছিল না। সম্প্রতি অক্সফোর্ড বিশ্ব বিদ্যালয়য়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, সাওয়ারক্রাউট (গাঁজানো বাঁধাকপি) তৈরির সময় বিশেষ ধরনের ব্যাকটেরিয়া তৈরি হয়। তাদের উৎপন্ন রাসায়নিক পদার্থ, সরাসরি আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতিতে ভূমিকা রাখে। নিয়মিত সাওয়ারক্রাউট খেলে মনমেজাজ বা মানসিক অবস্থার উন্নতি হয়। সেই উন্নতি হালকা অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট ওষুধের সমতুল্য হতে পারে। অর্থাৎ, এটি হতে পারে এক ধরনের সহজলভ্য, সুস্বাদু এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন বিকল্প। কিছু উপকারী ব্যাকটেরিয়া, বিশেষ করে ল্যাক্টোব্যাসিলাস এবং পেডিওককাস প্রজাতি মূল ভূমিকা পালন করে। গাঁজানোর প্রক্রিয়ায় ব্যাকটেরিয়াগুলি তৈরি হয়। এগুলি শরীরে বিভিন্ন নিউরোট্রান্সমিটার ও নিউরো মডুলেটরি যৌগ উৎপন্ন করে। নিউরোট্রান্সমিটার হল এমন রাসায়নিক, যা আমাদের মস্তিষ্কের কোষগুলির মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে এগুলি সরাসরি মনমেজাজ, উদ্বেগ এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণে প্রভাব ফেলে। তাছাড়া, প্রক্রিয়ার সময় শর্ট-চেইন ফ্যাটি অ্যাসিড (SCFA) নামে কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপাদানও তৈরি হয়। উপাদানগুলি অন্ত্রের প্রাচীরকে শক্তিশালী করে এবং মস্তিষ্কে প্রদাহ বা নিউরো ইনফ্ল্যামেশন কমাতে সাহায্য করে। অন্ত্র ও মস্তিষ্কের মধ্যে একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে, যাকে “গাট-ব্রেন অ্যাক্সিস” বলা হয়। এই গবেষণা সেই সম্পর্ককে আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করেছে। গবেষণায় বিষণ্নতায় আক্রান্ত কিছু ব্যক্তিকে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের জন্য বেছে নেওয়া হয়। একদল অংশগ্রহণকারীকে নিয়মিত গাঁজানো খাবার খেতে দেওয়া হয়, আর অন্য দলকে প্লাসেবো (নকল চিকিৎসা)। দেখা যায়, গাঁজানো খাবার খাওয়া রোগীদের মনমেজাজের উন্নতি হয় প্রায় ৩৫%, কিন্তু প্লাসেবো গ্রুপে মাত্র ১০%। এই পার্থক্য স্পষ্টভাবে দেখায় যে ফারমেন্টেড খাবারের প্রভাব বাস্তব এবং তা উপেক্ষণীয় নয়। তবে গাঁজানো খাবার খাওয়া আর শুধু তৈরি করা সাপ্লিমেন্ট নেওয়া এক নয়। গাঁজানো খাবার তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর। এর অর্থ, ফারমেন্টেড খাবারের মধ্যে বিভিন্ন উপাদান একসঙ্গে কাজ করে একটি সুসমন্বিত বাড়তি প্রভাব সৃষ্টি করে। এই জটিল পারস্পরিক ক্রিয়াই সম্ভবত এর আসল শক্তি। তাপ প্রয়োগ করে জীবিত ব্যাকটেরিয়া নষ্ট করে ফেললে, সেই খাবারে কিন্তু কোনো উপকার পাওয়া যায় না। বাজারে চালু গাঁজানো খাবারে কিন্তু তাই করা হয়। অর্থাৎ, জীবিত ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি অত্যন্ত জরুরি। কাঁচা, গাঁজনো খাবারে কোটি কোটি জীবন্ত ব্যাকটেরিয়া থাকে, যা আমাদের শরীরে প্রবেশ করে উপকারী প্রভাব সৃষ্টি করে। এটি প্রমাণ করে যে শুধু রাসায়নিক উপাদান নয়, জীবন্ত অণুজীবই এখানে মূল ভূমিকা পালন করে। সুতরাং চিরাচরিত খাবারগুলির মধ্যে লুকিয়ে আছে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের সম্ভাবনা। যেমন কিমচি, মিসো, টেম্পে, কম্বুচা বা কেফির আবার ভারতের ইডলি–দোসা ব্যাটার, ধকলা, কাঞ্জি, ঘুন্দ্রুক, এই সব ফারমেন্টেড খাবার বহু দেশের কৃষ্টিতে বহুদিন ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আধুনিক বিজ্ঞান এখন দেখাচ্ছে, এগুলি শুধু স্বাদের জন্য নয়, একধরনের “প্রাকৃতিক ওষুধ” হিসেবেও কাজ করতে পারে। সম্ভবত আমাদের পূর্বপুরুষরা অজান্তেই স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য এই খাবারগুলি খেতেন। আধুনিক বিজ্ঞান সেই প্রাচীন জ্ঞানকেই নতুনভাবে ব্যাখ্যা করছে। যেখানে খাবারই হয়ে উঠতে পারে “অণু-স্তরের চিকিৎসা”।

 

সূত্রঃ Science Simplified, March 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

five + three =