চিন্তন শক্তি ও চালিকা শক্তি 

চিন্তন শক্তি ও চালিকা শক্তি 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৭ মার্চ, ২০২৬

চিন্তন শক্তিতে এবার নড়বে হাত। এমনই এক অভিনব প্রযুক্তিতে পক্ষাঘাতগ্রস্ত মানুষের জীবনে সুস্থভাবে বাঁচার আশার আলো জ্বালাল চীন। বলাই বাহুল্য , চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হল। গুরুতর পক্ষাঘাতে আক্রান্ত মানুষদের চিকিৎসার জন্য অনুমোদন পেল এক অত্যাধুনিক ব্রেন–কম্পিউটার ইন্টারফেস (বি সি আই)। এর মাধ্যমে শুধু হাত নাড়ানোর কথা ভাবলেই হাত নাড়ানো সম্ভব হবে। এই যুগান্তকারী ডিভাইসটির নাম এন ই ও, যা তৈরি করেছে সাংহাইয়ের নিউরাল মেডিক্যাল টেকনোলোজি। এটি বিশ্বের প্রথম বি সি আই যা ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ব্যতীতই বাস্তব ব্যবহারের জন্য অনুমোদন পেল। চীনের ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ন্যাশনাল মেডিক্যাল প্রোডাক্টস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এই প্রযুক্তিকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন দিয়েছে। এটি ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সী সেইসব ব্যক্তিদের জন্য প্রযোজ্য, যাদের ঘাড়ের স্পাইনাল কর্ডে গুরুতর আঘাতের ফলে চারটি অঙ্গই প্রায় সম্পূর্ণ অবশ হয়ে গেছে। এতদিন এই ধরনের রোগের কার্যকর চিকিৎসা প্রায় ছিল না বললেই চলে। তাই অনেকেই এই প্রযুক্তিকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে একটি বড় অগ্রগতির পাশাপাশি ভালোভাবে বেঁচে থাকার একটা নতুন উপায় বলে মনে করছেন।

এন ই ও ডিভাইসটি আকারে ছোট, প্রায় একটি মুদ্রার মতো। এটি মাথার খুলির ভেতরে স্থাপন করা হয়। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে আটটি সূক্ষ্ম তড়িৎদ্বার, যা মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক সংকেত সংগ্রহ করে, বিশেষ করে যখন রোগী তার হাত নাড়ানোর কথা কল্পনা করে। প্রথমে, রোগীর হাতে একটি নরম রোবোটিক গ্লাভস পরানো হয়। তারপর সেই বৈদ্যুতিক সংকেতগুলো কম্পিউটারের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করে গ্লাভসটিকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। ফলে রোগীরা আবার নিজের হাতে জিনিসপত্র ধরা, খাওয়া-দাওয়া করা বা নিত্যদিনের ছোটোখাটো কাজগুলো করতে পারেন।

গবেষণায় দেখা গেছে, অন্তত ৯ মাস এই গ্লাভস ব্যবহার করার পর একজন রোগী তার ডান হাত দিয়ে খাওয়া-দাওয়া করতে সক্ষম হয়েছেন, যা আগে একেবারেই সম্ভব ছিল না। তার হাতের ধরার ক্ষমতা ও হাত নাড়ানোর ধরন আগের থেকে অনেক উন্নত হয়েছে। এমনকি যে হাতে গ্লাভস ব্যবহার করা হয়নি, সেই হাতেও কিছুটা উন্নতি লক্ষ্য করা গেছে। এখন পর্যন্ত ৩২ জন রোগীর ওপর এই প্রযুক্তি প্রয়োগ করা হয়েছে, এবং প্রত্যেকেই এই গ্লাভসের সাহায্যে অন্তত কোনো না কোনো বস্তু ধরার ক্ষমতা ফিরে পেয়েছেন।

এই প্রযুক্তির আরেকটি বড় সুবিধা হলো এটির ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম। উদাহরণস্বরূপ, নিউরালিঙ্কের মতো ডিভাইস সরাসরি মস্তিষ্কের ভেতরে প্রবেশ করানো হয়, অথচ এন ই ও কেবল খুলির ভেতরে স্থাপন করা হয়। এর ফলেই এটির দ্রুত অনুমোদন পাওয়া সম্ভব হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যদিও এই প্রযুক্তির ফলাফল আশাব্যঞ্জক, তবুও পরীক্ষার পরিসর এখনও সীমিত। দীর্ঘমেয়াদি আরও গবেষণা প্রয়োজন। তবুও, এই অনুমোদন বি সি আই গবেষণার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে পক্ষাঘাতগ্রস্ত মানুষের জীবনে বাঁচার নতুন পথের হদিশ দিতে পারে। একসময় যা ছিল কেবল কল্পবিজ্ঞান আজ তা বাস্তব। এখন মানুষের চিন্তাই হয়ে উঠছে তার চলার শক্তি।

 

সূত্র: China approves brain chip to treat paralysis — a world first Chip allows people with paralysis to control a soft robotic han ByRachel Fieldhouse & Xiaoying You, published in Nature journal, 16th March 2026.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

five − 4 =