চ্যাটবটের আবর্জনা 

চ্যাটবটের আবর্জনা 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১২ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

প্রায় ৩০ লক্ষ পাণ্ডুলিপির ভারবাহী আর-জাইভ (arXiv) কম্পিউটার সায়েন্স, পদার্থবিদ্যা ও গণিত গবেষণার একপ্রকার অনানুষ্ঠানিক মেরুদণ্ড। কিন্তু এবার তারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, “যে কেউ এলেই আর প্রিপ্রিন্ট ছাপা যাবে না”। ২১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হওয়া এই নতুন নিয়ম অনুযায়ী, আর-জাইভ-এ প্রথমবার কোনো গবেষণা আপলোড করতে চাইলে, লেখককে নিজের বিষয়ের একজন প্রতিষ্ঠিত আর-জাইভ লেখকের কাছ থেকে সমর্থন জোগাড় করতে হবে। আগে এই প্রক্রিয়া ছিল অনেক সহজ। বিশ্ববিদ্যালয় বা স্বীকৃত গবেষণা প্রতিষ্ঠানের একটি ই-মেল ঠিকানাই যথেষ্ট ছিল। এখন সেই যুগ শেষ। তবে যাঁরা ইতিমধ্যেই আর-জাইভ-এর একই বিষয়বিভাগে আগে কাজ পোস্ট করেছেন, তাঁদের জন্য এই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। এই কড়াকড়ির কারণ একটাই। ভুয়ো গবেষণার সুনামি। ইউনিভার্সিটি অব আমস্টারডামের জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং আর-জাইভ সম্পাদকীয় পরিষদের চেয়ার রালফ উইয়ার্স স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, “এটা মূলত খুবই নতুন, অদক্ষ মানুষদের আবর্জনা পাঠানো ঠেকানোর চেষ্টা।” তাঁর দাবি, এই আবর্জনার বড় অংশই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা চ্যাটবট দিয়ে তৈরি পেপার। আর-জাইভ ১৯৯১ সালে যাত্রা শুরু করেছিল একরকম বৈপ্লবিক ভাবনায়। পিয়ার রিভিউয়ের আগেই গবেষণা দ্রুত ছড়িয়ে দিয়েছিল তাদের লক্ষ্য। প্রতি মাসে প্রায় ২০ হাজার পত্র জমা হয় আর-জাইভ-এর আটটি বিষয়ক্ষেত্রে। যদিও এখানে কোনো আনুষ্ঠানিক পিয়ার রিভিউ নেই, তবু প্রায় ৩০০ জন স্বেচ্ছাসেবী বিশেষজ্ঞ প্রতিটি কাজ ছেঁকে দেখেন। প্লেজিয়ারিজম, ছদ্মবিজ্ঞান বা সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক কনটেন্ট বাদ দেওয়ার জন্য। একসময় এই ছাঁকনি খুব বেশি ব্যস্ত ছিল না। বছরের পর বছর গড়ে মাত্র ৪ শতাংশ লেখা বাতিল হতো। ২০২২ সালে চ্যাট জিপিটি আসার পর অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন, এ আই-লেখা, জাল গবেষণার ঢল নামবে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে ২০২৪ পর্যন্ত তেমন কিছু ঘটেনি। উইয়ার্স স্মরণ করেছেন, “কয়েকজন সহকর্মী বলেছিলেন, একটু অপেক্ষা করো।“ অপেক্ষার ফল দেখা গেল ২০২৫ সালের শুরুতেই। প্রথমে কম্পিউটার সায়েন্সে, তারপর ধীরে ধীরে অন্য বিষয়েও বাড়তে থাকে তথাকথিত “AI slop”। চকচকে ভাষা, কিন্তু ভেতরে ফাঁপা। এখন বাতিলের হার ১০ থেকে ১২ শতাংশে পৌঁছেছে। কিছু লেখা এতটাই আজগুবি যে, উইয়ার্সের ভাষায়, “এক ঝলক দেখলেই বোঝা যায়, চার পাতার পেপার, অথচ ৫০টা উপবিভাগ, তার অনেকগুলোতে কোনো লেখাই নেই।“ এই পরিস্থিতিতে আর-জাইভ ধাপে ধাপে কড়া হয়েছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে তারা ঘোষণা করে, কম্পিউটার সায়েন্সে পিয়ার-রিভিউ ছাড়া রিভিউ বা পজিশন পেপার নেওয়া হবে না। এরপর ডিসেম্বর মাসে গণিত বিভাগে পরীক্ষামূলকভাবে অনুমোদন চালু হয়। এখন তা পুরো সাইটে। উইয়ার্সের দাবি, “প্রায় সব এ আই-জেনারেটেড আবর্জনাই আসে প্রথমবার জমা দেওয়া লোকদের কাছ থেকে।“ অনেকেই হয়তো গ্র্যাজুয়েট ,স্কুল বা চাকরির আবেদনের জন্য দ্রুত একটি ‘পাবলিকেশন’ বানাতে চাইছেন। সমস্যা অবশ্য শুধু আর-জাইভ-এর নয়। ওপেন সায়েন্স ফ্রেমওয়ার্ক পরিচালিত সাধারণ প্রিপ্রিন্ট সার্ভার ২০২৫ সালের আগস্টে নতুন পেপার জমা নেওয়া বন্ধই করে দেয়। কারণ সেগুলোর বেশিরভাগই ছিল নিম্নমানের। তাই আর-জাইভ এর মতো প্ল্যাটফর্ম এখন পোস্ট করার আগেই বিষয় বস্তু যাচাই করছে। তবে এই কড়াকড়ির ঝুঁকিও আছে। সেন্টার ফর ওপেন সায়েন্সের ব্রায়ান নোসেক সতর্ক করছেন, ছোট বা কম প্রতিষ্ঠিত প্রিপ্রিন্ট সার্ভারে অনুমোদন বাধ্যতামূলক হলে প্রকৃত গবেষকরাও বাদ পড়তে পারে। যাঁদের তেমন শক্তিশালী নেটওয়ার্ক নেই। আরেকটি জটিলতা হল এ আই ব্যবহারের সূক্ষ্ম পার্থক্য। অনেক গবেষক, বিশেষ করে অন-ইংরেজিভাষী বৃহৎ ভাষা মডেল ব্যবহার করেন, ভাষা মসৃণ করতে। আর-জাইভ এখন বিদেশি ভাষার কাজের সঙ্গে পূর্ণ ইংরেজি অনুবাদও বাধ্যতামূলক করেছে, যা এ আই দিয়েই করা যায়। উইয়ার্স এটাকে ইতিবাচক চোখেই দেখছেন: “ভাঙা ইংরেজিতে লেখা পেপারের সংখ্যা দ্রুত কমছে।“ সোজা কথায়, আর-জাইভ এখন এক দ্বিধার মুখে। একদিকে অবাধ বিজ্ঞানের আদর্শ, অন্যদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে বেপরোয়া উৎপাদন। এই নতুন নিয়ম সেই সংঘর্ষেরই একটি প্রতিরোধমূলক রেখা। অর্থাৎ, অবাধ প্রবেশাধিকার মানেই আর অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশ নয়।

সূত্র: ArXiv preprint server clamps down on AI slop; Science, Jan 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

10 − seven =