পৃথিবীর জীবজগতে সবচেয়ে অবহেলিত গোষ্ঠী হল ছত্রাক। সাম্প্রতিক গবেষণা ও উদ্যোগগুলো থেকে দেখা যাচ্ছে, পৃথিবীর জৈবব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে ছত্রাকের ভূমিকা কতটা গভীর এবং অপরিহার্য। অথচ এখনও পর্যন্ত এই গোষ্ঠীটি যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি।
এই প্রেক্ষাপটে বিশেষভাবে আলোচনায় উঠে এসেছে একটি বিরল ছত্রাক—Agarikon (যাকে quinine conk-ও বলা হয়)। এটি যুক্তরাষ্ট্রের মাত্র দুটি বিপন্ন ছত্রাক প্রজাতির একটি। এতটাই বিরল যে এর নমুনা সংরক্ষণ করা হয়েছে একটি বায়োব্যাংকে, যাতে ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে এটি আবার প্রকৃতিতে ফিরিয়ে আনা যায়। একসময় এই ছত্রাককে “দীর্ঘায়ু অমৃত’’ বলা হতো। বহু শতাব্দী ধরে এটি যক্ষ্মা, হাঁপানি, ক্যান্সারসহ নানা রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়েছে। আধুনিক গবেষণাও প্রমাণ করেছে, এতে শক্তিশালী অ্যান্টিভাইরাল, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ও অ্যান্টি-ক্যান্সার উপাদান রয়েছে। তবুও গত এক শতকে এর সংখ্যা প্রায় ৭০ শতাংশ কমে গেছে।
তবে Agarikon কেবল একটি উদাহরণ। প্রকৃতপক্ষে, পৃথিবীতে ছত্রাকের মোট প্রজাতির সংখ্যা ২.২ মিলিয়ন থেকে ১২ মিলিয়নের মধ্যে হতে পারে, অথচ এখন পর্যন্ত মাত্র প্রায় ১,৫৫,০০০ প্রজাতি শনাক্ত করা হয়েছে। এই বিশাল অজানা ভাণ্ডারই বোঝায়, আমরা এখনও ছত্রাক জগতটা সম্পর্কে কত কম জানি।
ছত্রাকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদানগুলোর একটি হলো তাদের মাইকোরাইজাল নেটওয়ার্ক। এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ছত্রাক সহাবস্থান করে গাছের শিকড়ের সঙ্গে। প্রায় ৯০ শতাংশ উদ্ভিদ এই সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল। ছত্রাক মাটির গভীর থেকে জল ও পুষ্টি শোষণ করে গাছকে দেয়, আর গাছ তাদের তৈরি কার্বোহাইড্রেট ছত্রাককে সরবরাহ করে। এই পারস্পরিক সহযোগিতা ছাড়া অধিকাংশ উদ্ভিদের বেঁচে থাকাই তো সম্ভব নয়।
বিখ্যাত ছত্রাকবিশেষজ্ঞ মার্লিন শেলড্রেক তার বই এনট্যাঙ্গলড লাইফ-এ লিখেছেন, এই ছত্রাক নেটওয়ার্ক ছাড়া পৃথিবীতে কোনো স্থলজ জীবনই সম্ভব হতো না। অর্থাৎ, ছত্রাকরা শুধু সহায়ক নয়, এরাই আসলে জীবনের ভিত্তি।
ছত্রাক পরিবেশগত দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা মৃত উদ্ভিদ ও প্রাণীকে ভেঙে পুষ্টি উপাদানে রূপান্তর করে, যা আবার নতুন জীবনের জন্য প্রয়োজনীয়। প্রায় ৯০০ মিলিয়ন বছর আগে তারা প্রথম মাটি তৈরি করতে সাহায্য করেছিল, যার ফলে উদ্ভিদ সমুদ্র থেকে স্থলে উঠে আসতে পেরেছিল। আজও তারা মাটির উর্বরতা বজায় রাখে এবং বাস্তুতন্ত্রকে স্থিতিশীল রাখে।
এছাড়া ছত্রাক কার্বন সংবন্ধনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মাইকোরাইজাল ছত্রাক প্রতি বছর প্রায় ১৩ বিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড মাটিতে সংরক্ষণ করে, যা বিশ্বের জীবাশ্ম জ্বালানি নির্গমনের এক-তৃতীয়াংশের সমান। ফলে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় তাদের অবদান অপরিসীম।
মানবজীবনেও ছত্রাকের অবদান ব্যাপক। পেনিসিলিন, স্ট্যাটিনের মতো ওষুধ থেকে শুরু করে পনির, রুটি, বিয়ার, এমনকি প্রসাধনী ও জ্বালানি তৈরিতেও এটি ব্যবহৃত হয়। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ছত্রাকের অর্থনৈতিক মূল্য প্রায় ৫৫ ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে।
তবুও এই গুরুত্বপূর্ণ জীবগোষ্ঠী নানা হুমকির মুখে। জলবায়ু পরিবর্তন, বৃক্ষচ্ছেদন, এবং ভূমির আচরণ পরিবর্তনের কারণে ছত্রাকের বৈচিত্র্য দ্রুত কমছে। বিশেষ করে মূল মাইকোরাইজাল কেন্দ্রগুলো মাত্র ১০ শতাংশই সুরক্ষিত এলাকায় রয়েছে।
এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য বিশ্বজুড়ে নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। SPUN (Society for the Protection of Underground Networks) নামের একটি সংস্থা ডিএনএ ও মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে ছত্রাক নেটওয়ার্ক মানচিত্র তৈরি করছে এবং গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করছে। এছাড়া FUNDIS প্রকল্পে সাধারণ মানুষও অংশ নিচ্ছে, যা ছত্রাকের গবেষণাকে আরও বিস্তৃত করছে।
২০২৪ সালে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে “ছত্রাক সংরক্ষণ অঙ্গীকার’’-এর প্রস্তাব করা হয়। লক্ষ্য হলো ছত্রাককে উদ্ভিদ ও প্রাণীর সমান গুরুত্ব দিয়ে সংরক্ষণ করা। এই উদ্যোগ সফল হলে ভবিষ্যতে গবেষণা, নীতি এবং সংরক্ষণে ছত্রাক রাজ্য আরও বড় স্থান পাবে।
ছত্রাকরা আসলে কোনো গৌণ জীব নয়, তারা পৃথিবীর জীবনের ভিত্তি। তাদের ছাড়া উদ্ভিদ, প্রাণী, এমনকি মানুষও টিকে থাকতে পারত না। এখন সত্যিই সময় এসেছে এই অদৃশ্য, অপরিহার্য সাম্রাজ্যকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়ার। বিজ্ঞানীরা একে বলছেন “ ছত্রাক জাগরণ’’। এ হয়তো আমাদের ভবিষ্যৎ রক্ষার জন্য অত্যন্ত জরুরি পদক্ষেপ।
সূত্র: Grist.org
