টেস্টটিউবে প্রোটিন তৈরিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

টেস্টটিউবে প্রোটিন তৈরিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২ মার্চ, ২০২৬

এভানস্টনে অবস্থিত নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির পিএইচডি গবেষক, সিন্থেটিক জীববিজ্ঞানী মেগান ওলসেন ইলিনয়। তাঁর লক্ষ্য ছিল, টেস্টটিউবে প্রোটিন তৈরির খরচ কমানো। গত বছর প্রায় চার মাস ধরে তিনি ৪০টিরও বেশি পরীক্ষা করেন। চিনি, অ্যামিনো অ্যাসিড এবং নানা রাসায়নিক উপাদানের মোট ১,২৩১টি আলাদা সংমিশ্রণ তিনি যাচাই করেন। বহুবার ব্যর্থ হওয়ার পর অবশেষে তিনি এমন একটি রাসায়নিক মিশ্রণ বা “ককটেল” তৈরি করেন, যার খরচ বিনা কোষে উৎপন্ন প্রোটিন তৈরির প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় অন্তত ছয় গুণ কম। কিন্তু সেই সাফল্য বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। এবার তাঁর রেকর্ড ভেঙেছে একটি ‘স্বয়ংক্রিয় ল্যাবরেটরি’ ব্যবস্থা। এটি যৌথভাবে তৈরি করেছে ক্যালিফোর্নিয়ার সান ফ্রান্সিসকোভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংস্থা ওপেন এ আই এবং ম্যাসাচুসেটসের জৈবপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান জিঙ্কগো বায়োওয়ার্কস। এই স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় ছিল একটি উন্নত ভাষা মডেলভিত্তিক ‘এ আই বিজ্ঞানী’ , ল্যাবের স্বয়ংক্রিয় রোবট এবং মানুষ তত্ত্বাবধায়ক দল। ছয় মাসে তারা ৩০ হাজারেরও বেশি পরীক্ষার পরিস্থিতি পরীক্ষা করে। তাতে প্রোটিন তৈরির খরচ আরও ৪০ শতাংশ কমানো সম্ভব হয়েছে। এরপর থেকেই প্রশ্ন উঠেছে, চ্যাটবট-চালিত রোবট কি ভবিষ্যতে মানুষের জায়গা নেবে? এই প্রকল্পে ব্যবহার করা হয় GPT-5 নামের একটি উন্নত ভাষা মডেল। আগে এটি গণিত, কম্পিউটার কোডিং এবং তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে দক্ষতা দেখিয়েছে। এবার তাকে সরাসরি জীববিজ্ঞানের পরীক্ষায় ব্যবহার করা হয়। GPT-5 একেকটি পরীক্ষালব্ধ ফল বিশ্লেষণ করে পরবর্তী পরীক্ষার পরিকল্পনা করত। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী জিঙ্কগোর ল্যাব রোবট স্বয়ংক্রিয়ভাবে তরল স্থানান্তরণসহ নানা কাজ করত। গবেষকেরা প্রয়োজনীয় উপাদান দিতেন এবং প্রয়োজনে প্রোটোকলে সামান্য পরিবর্তন আনতেন। প্রথম তিন দফা পরীক্ষার পর GPT-5–কে ইন্টারনেট ব্যবহার ও ওলসেনের গবেষণাপত্র পড়ার অনুমতি দেওয়া হয়। মডেলটি নিজের মতো করে একটি ডিজিটাল ল্যাব নোটবই রাখত, যেখানে তথ্য বিশ্লেষণ ও সম্ভাব্য অনুমান লিখে রাখত। অদ্ভুত বিষয়, ইন্টারনেট ব্যবহার করার আগেই GPT-5 একটি সস্তা রাসায়নিক বিকল্প ব্যবহারের প্রস্তাব দেয়, যা ওলসেনের দলও ব্যবহার করেছিল। গবেষকদের মতে, মডেলটির জৈবরসায়নভিত্তিক যুক্তি প্রয়োগ করার ক্ষমতা রীতিমতো ভালো। তবে বড় উন্নতি এল তখনই, যখন এটি নতুন তথ্য ও গবেষণাপত্র থেকে শিখতে পারল। সেল-ফ্রি প্রোটিন তৈরির পদ্ধতিতে ব্যাকটেরিয়ার কোষ ভেঙে পাওয়া উপাদানের সঙ্গে বিভিন্ন রাসায়নিক ও ডিএনএ মিশিয়ে প্রোটিন তৈরি করা হয়। এখানে অসংখ্য উপাদানের অনুপাত বদলানো যায়। ফলে সম্ভাব্য পরীক্ষার সংখ্যা বিপুল। ওলসেন প্রায় ১,০০০টি প্রতিক্রিয়া পরীক্ষা করেছিলেন। স্বয়ংক্রিয় ল্যাব সেটিকে ৩০,০০০–এ নিয়ে যায়। এত বড় পরিসরে পরীক্ষা মানুষ একা করতে পারত না। তবে সব গবেষণায় এমন পদ্ধতি কার্যকর নাও হতে পারে। এই প্রকল্পে অগ্রগতি মাপা হয় একটি প্রভমান প্রোটিনের উৎপাদন দেখে, যা সহজে পরিমাপযোগ্য। কিন্তু অনেক বৈজ্ঞানিক সমস্যায় এমন সরল মাপকাঠি থাকে না। তখন এ আইয়ের পক্ষে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হতে পারে। আরেকটি সীমাবদ্ধতা হল রোবোটিক প্রযুক্তি। সূক্ষ্ম কাজ, যেমন টিস্যুর পাতলা অংশ কেটে নেওয়া বা প্রাণীর ওপর জটিল পরীক্ষা, এখনও পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় করা সম্ভব হয়নি। চিকিৎসা উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিষক্রিয়া বা দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব যাচাইয়ের মতো কাজ টেস্টটিউব পরীক্ষায় প্রতিস্থাপন করা যায় না। খরচ ও পরিকাঠামোর প্রশ্নও রয়েছে। সব গবেষণাগারে পূর্ণাঙ্গ স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা বসানো সম্ভব নয়। তাই ভবিষ্যতে হয়তো বিশ্ববিদ্যালয় বা গবেষণা প্রতিষ্ঠানে যৌথভাবে ব্যবহারের জন্য স্বয়ংক্রিয় ল্যাব থাকবে, যেখানে গবেষকেরা দূর থেকে পরীক্ষা চালাতে পারবেন। তবু বিজ্ঞানীদের মতে, এআই ও রোবট মানুষের বিকল্প নয়, সহায়ক শক্তি। মানুষের অভিজ্ঞতা, সৃজনশীলতা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এখনো অপরিহার্য। স্বয়ংক্রিয় ল্যাব দ্রুত বিপুল তথ্য সংগ্রহ করতে পারে, কিন্তু সেই তথ্যের অর্থ বের করে নতুন প্রশ্ন তোলা, সেটি এখনও মানুষেরই কাজ। মেগান ওলসেনের মতে, তাঁর কাজের ওপর ভিত্তি করে যদি অন্য কেউ, এমনকি একটি চ্যাটবটও আরও এগিয়ে যেতে পারে, সেটাই হবে বিজ্ঞানের স্বাভাবিক অগ্রগতি। জীববিজ্ঞানের ভবিষ্যৎ হয়তো মানুষ ও যন্ত্রের মিলিত প্রয়াসেই এগোবে।

 

সূত্র: Nature, 18 February 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

14 − 13 =