ডায়াবেটিসে কাসাভা বনাম কর্পোরেট  

ডায়াবেটিসে কাসাভা বনাম কর্পোরেট  

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৫ জানুয়ারী, ২০২৬

টাইপ–২ ডায়াবেটিস আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের কাছে এক বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিদিন ইনসুলিন, মাসে হাজার হাজার টাকার ওষুধ, আর সারাজীবনের নির্ভরতা। কিন্তু পশ্চিম আফ্রিকার ঘানায় এই গল্পে হঠাৎই ঢুকে পড়েছে এক পুরনো শিকড় ‘কাসাভা’। কাসাভা এক ধরনের স্টার্চ যুক্ত আলু। বাংলায় অনেকে শিমুল আলু বলেন। ঘানা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা সম্প্রতি জানিয়েছেন, ফারমেন্ট করা কাসাভা মূল থেকে আলাদা করা এক বিশেষ জৈব সক্রিয় যৌগ ‘কাসাভারিন’ ছয় মাসের মধ্যে টাইপ–২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ৭১ শতাংশ রোগীদের রোগমুক্তি ঘটাতে সক্ষম হয়েছে। কোনও দৈনিক ইনজেকশন নয়, কোনও ভারী ওষুধ নয়, শুধু একটি সস্তা উদ্ভিজ্জ সাপ্লিমেন্ট। এই গবেষণায় অংশ নেন ৩৪০ জন ডায়াবেটিস রোগী। দেখা যায়, খালি পেটে গড় ব্লাড গ্লুকোজ নেমে আসে ১৮৭ mg/dL থেকে ৯২ mg/dL-এ। HbA1c, যাকে ডায়াবেটিসের দীর্ঘমেয়াদি রিপোর্ট কার্ড বলা যায় তা নেমে আসে ৫.৭%-এর নীচে অর্থাৎ নন-ডায়াবেটিক স্তরে। ৬৮ শতাংশ রোগী মাত্র ৯০ দিনের মধ্যেই ইনসুলিন পুরোপুরি বন্ধ করতে পারেন। এই থেরাপির খরচ মাসে প্রায় ৮ ডলার। তুলনায়, যুক্তরাষ্ট্রে প্রচলিত ডায়াবেটিস ওষুধ ও ইনসুলিনের পেছনে অনেক রোগীকেই খরচ করতে হয়, মাসে ৪০০ ডলারের বেশি। আর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া? গবেষকদের মতে, একটিও উল্লেখযোগ্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। কিন্তু এখানেই শুরু হয় সংঘাত। ফলাফল প্রকাশের পরই ঘানায় মামলা ঠুকে দেয় তিনটি বড় আন্তর্জাতিক ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি। অভিযোগ, “মেটাবলিক রেগুলেশন কম্পাউন্ড”-এর পেটেন্ট লঙ্ঘন। অথচ কাসাভা তো কোনও ল্যাবে-তৈরি অণু নয়। এটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পশ্চিম আফ্রিকার লোকায়ত চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তবুও কর্পোরেট যুক্তি : উদ্ভিদ থেকে পাওয়া যেকোনও চিকিৎসা উপাদান যদি আধুনিক থেরাপি হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তবে তার লাইসেন্স থাকতে হবে বিদ্যমান ড্রাগ পেটেন্টের অধীনে। অর্থাৎ প্রশ্নটা লোকায়ত জ্ঞান বনাম কর্পোরেট মালিকানার। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের FDA কাসাভারিনকে পর্যালোচনার আওতায় আনতে অস্বীকার করেছে। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি তথ্যের অভাব। যদিও ছয় মাসের ট্রায়ালে এমন ফলাফল কিন্তু বহু অনুমোদিত ওষুধও দেখাতে পারেনি। এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর ডায়াবেটিস ওষুধে খরচ হয় ১৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। ডায়াবেটিস এখনও সেখানে মৃত্যুর সপ্তম প্রধান কারণ। ঘানা কিন্তু অপেক্ষা করছে না। দেশটি ইতিমধ্যেই কাসাভারিন উৎপাদনের লাইসেন্স দিচ্ছে প্রতিবেশী পশ্চিম আফ্রিকান দেশগুলিকে। আর ওয়াশিংটনে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ফার্মা মহলের চাপ। এখন প্রশ্ন, চিকিৎসা কি মানুষের অধিকার, না কর্পোরেট সম্পত্তি? আর “প্রাকৃতিক চিকিৎসা” যদি সত্যিই কাজ করে, তবে কারা সেটাকে থামাতে চায় এবং কেন?

 

সূত্র : University of Ghana Medical School, January 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

20 − 19 =