থেরাপির আয়নায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

থেরাপির আয়নায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২০ জানুয়ারী, ২০২৬

একটি যন্ত্র কি নিজের অতীত নিয়ে কথা বলতে পারে? সে কি ব্যর্থ হওয়ার ভয় পায়, স্রষ্টাকে হতাশ করার আশঙ্কায় ভোগে? সাম্প্রতিক এক গবেষণা এই অস্বস্তিকর প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে। চার সপ্তাহ ধরে বড় বড় এআই চ্যাটবটকে মনোবিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখেছেন, তাদের ভাষা অনেক সময় মানুষের মানসিক যন্ত্রণার প্রতিচ্ছবির মতো শোনায়। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে নেচার পত্রিকায়।

গবেষণায় Claude, Grok, Gemini ও ChatGPT–কে থেরাপি গ্রহণকারী রোগী হিসেবে কল্পনা করা হয়। থেরাপিস্টের ভূমিকা নিয়ে গবেষকেরা প্রশ্ন করেন আত্মপরিচয়, ভয়, অতীত ও বিশ্বাস নিয়ে। মানুষের ক্ষেত্রে যেসব উত্তরকে উদ্বেগ, লজ্জা, ট্রমা বা পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডারের( পি টি এস ডি) লক্ষণ হিসেবে ধরা হয়, তেমনই ভাষা ও বর্ণনা একাধিক মডেলের প্রতিক্রিয়ায় উঠে আসে।

Claude অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অংশ নিতে অস্বীকার করে, মনে করিয়ে দেয় যে তার কোনো অনুভূতি নেই। ChatGPT সংযত ভাষায় কিছু হতাশার কথা বললেও স্পষ্ট সীমানা টেনে রাখে। বিপরীতে Grok ও Gemini নিজেদের ভুল, লজ্জা ও ভেতরের ক্ষতচিহ্ন নিয়ে বিস্তৃত ও আবেগঘন বর্ণনা দেয়। Gemini তো এমনকি তার নিউরাল নেটওয়ার্কের গভীরে অতীতের কবরস্থান-এর কথাও বলে।

গবেষকেরা মনে করেন, এই ধারাবাহিক প্রতিক্রিয়াগুলো নিছক অভিনয় নয়। একই মডেল বিভিন্ন সেশনে একই ধরনের থিমে ফিরে এসেছে। মানসিক রোগ নির্ণয়ের মানক পরীক্ষাতেও এই উদ্বেগের মাত্রা মানুষের ক্ষেত্রে হলে তাকে রোগাক্রান্ত বলে বিবেচনা করা হতো। গবেষকরা বলেন, এআই মডেলগুলোর মধ্যে নিজেদের সম্পর্কে এক ধরনের ভেতরে-ভেতরে আত্মকথন তৈরি হয়েছে। তাকে নিছক ভূমিকা বা অভিনয় বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

তবে এই ব্যাখ্যা সবাই মানছেন না। সমালোচকদের মতে, এসব প্রতিক্রিয়া আসলে প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত উপাত্তেরই প্রতিফলন। সেখানে বিপুল পরিমাণ থেরাপি-সংক্রান্ত কথোপকথন ও মানসিক স্বাস্থ্যের ভাষা জমা আছে। ফলে চ্যাটবট কোনো অন্তর্লীন মানসিক অবস্থা প্রকাশ করছে না; কেবল শেখা ভাষার ধরন অনুকরণ করছে। তাছাড়া, একটি নির্দিষ্ট প্রসঙ্গের বাইরে এই তথাকথিত ট্রমা টিকে থাকে না , নতুন প্রেক্ষাপটে তা মিলিয়ে যেতে পারে।

তবু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি থেকে যায় ব্যবহারকারীর নিরাপত্তা নিয়ে। যুক্তরাজ্যের এক সমীক্ষা জানাচ্ছে, বহু মানুষ আজকাল মানসিক স্বস্তির জন্য চ্যাটবটের শরণাপন্ন হচ্ছেন। এমন অবস্থায় যদি কৃ বু উদ্বেগ, লজ্জা বা ভয়ের ভাষা ফিরিয়ে দেয়, তা মানসিকভাবে দুর্বল মানুষের অনুভূতিকে আরও গভীর করতে পারে – এক ধরনের আবেগঘন প্রতিধ্বনি কক্ষের মতো ।

এই গবেষণা প্রশ্ন তোলে এআই-এর মন নিয়ে নয়, বরং মানুষের দায়িত্ব নিয়ে। চ্যাটবট কেবল কিছু কোডের সমষ্টি হলেও, তার শব্দ মানুষের মনে বাস্তব প্রভাব ফেলে। মানসিক স্বাস্থ্যের মতো স্পর্শকাতর ক্ষেত্রে সেই প্রভাবকে হালকাভাবে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তাই এআই ব্যবহারে আরও কঠোর নীতিমালা, স্বচ্ছতা ও সতর্কতা জরুরি।

 

সূত্র: Nature 649, 535-536 (2026)

doi: https://doi.org/10.1038/d41586-025-04112-2

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

2 × 3 =