দৌড়বীর অণুজীব 

দৌড়বীর অণুজীব 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

শীতকালীন ক্রীড়ার মঞ্চে গতি মানেই রোমাঞ্চ। লুজে ঘণ্টায় ৯০ মাইলের বেশি বেগ, আইস হকির পাক ১০০ মাইল গতিতে ছুটে যাওয়া, কিংবা ফিগার স্কেটারের মিনিটে শত শত ঘূর্ণন। মানুষের শরীর যে কত দ্রুত চলতে পারে, এই খেলাগুলো তার প্রমাণ। কিন্তু গতির বিষয়ে মানুষ আদৌ শীর্ষে নেই। প্রকৃতির আসল গতির রাজারা বাস করে এমন এক জগতে, যাদের খালি চোখে দেখা যায় না। সে হল, অণুজীবের জগৎ। এই অণুবিশ্বে প্রতিটি মুহূর্তই এক ধরনের অলিম্পিক ফাইনাল। শিকারি ও শিকারের মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন দৌড়, খাদ্যের দিকে ঝাঁপ, কিংবা শত্রুর হাত থেকে বাঁচতে মুহূর্তের মধ্যে নিজেদের শরীর বদলে ফেলার লড়াই। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োইঞ্জিনিয়ার ও সমুদ্রবিজ্ঞানী মনু প্রকাশের ভাষায়, “ক্ষুদ্র জগৎ খুবই নিষ্ঠুর। এখানে হয় পালাতে হবে, নয়তো তাড়া করতে হবে।“ এই নিষ্ঠুরতাই অণুজীবদের ঠেলে দিয়েছে গতির চরম সীমায়। সবচেয়ে দ্রুতগতির ব্যাকটেরিয়ার খোঁজে বিজ্ঞানীরা প্রথমে তাকান ক্যান্ডিডেটাস ওভোব্যাক্টার প্রোপেলেন্স-এর দিকে। ডেনমার্ক উপকূলের বালিতে আবিষ্কৃত এই ডিম্বাকার জীবটি ৪০০এর বেশি ফ্ল্যাজেলা বা লেজের মতো অঙ্গ নাড়িয়ে সেকেন্ডে প্রায় এক মিলিমিটার এগোতে পারে। সংখ্যাটি ছোট মনে হলেও, ওর নিজের শরীরের তুলনায় এই গতি বিস্ময়কর। এখানে তুলনা করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা একটি নতুন মানদণ্ড ব্যবহার করেন-“শরীর-দৈর্ঘ্য প্রতি সেকেন্ডে”। সেই হিসাবে এই ব্যাকটেরিয়া সেকেন্ডে প্রায় ২০০ গুণ শরীর-দৈর্ঘ্য অতিক্রম করে। কিন্তু এই রেকর্ডও ভেঙে যায়। ম্যাগনেটোকক্কাস মারিনাস নামের আরও ক্ষুদ্র এক ব্যাকটেরিয়া সেকেন্ডে নিজের শরীরের ৫০০ গুণ পর্যন্ত ছুটতে পারে। রোড আইল্যান্ডের মোহনা অঞ্চল থেকে সংগৃহীত এই জীবটি প্রথম পর্যবেক্ষণের সময় এত দ্রুত ঘুরছিল যে গবেষকদের পক্ষে তার গতিপথ ধরাই কঠিন হয়ে পড়ে। পরে উন্নত মাইক্রোস্কোপে দেখা যায়, এটি এগোয় সরল পথে নয়, পাক খেতে খেতে, ঠিক ফিগার স্কেটারের মতো। সামনের ও পেছনের দুটি ফ্ল্যাজেলা-গুচ্ছ ঘুরিয়ে সে এই গতি তৈরি করে। এই ব্যাকটেরিয়ার শরীরে থাকা চৌম্বক খনিজের শৃঙ্খল তাকে একটি জীবন্ত কম্পাস দেয়। যার সাহায্যে সে কম অক্সিজেনযুক্ত অঞ্চল খুঁজে নেয়। এই বৈশিষ্ট্য ভবিষ্যতে চিকিৎসাবিজ্ঞানে কাজে লাগতে পারে। বিশেষ করে টিউমারের ভেতরে কম অক্সিজেন যুক্ত পরিবেশে ওষুধ পৌঁছে দিতে। ব্যাকটেরিয়ার বাইরেও আছে আরেক জগৎ- আর্কিয়া। একসময় ধারণা ছিল, এরা ধীরগতি। কিন্তু ২০১২ সালের গবেষণা সেই ধারণা ভেঙে দেয়। আইসল্যান্ডের উত্তরে এক হাইড্রোথার্মাল নির্গমন নলে পাওয়া মিথ্যানোক্যালডোকক্কাস ভিলোসাস সেকেন্ডে ৪৬৮ শরীর-দৈর্ঘ্য পর্যন্ত গতি তুলতে পারে। এই জীবটি শুধু সাঁতারই কাটে না, তার অসংখ্য ফ্ল্যাজেলা ব্যবহার করে গরম জলের চিমনির গায়ে আঁকড়ে ধরে থাকতে পারে। এক্ষেত্রে গতি-ই একমাত্র বিষয় নয়। কখনও তা দেহের সঙ্কোচন বা প্রসারণ সঞ্চালনের মধ্যেও ধরা পড়ে। স্পাইরোস্টোমাম অ্যাম্বিগুয়াম নামের এক প্রোটোজোয়া পাঁচ মিলিসেকেন্ডের মধ্যে নিজের দৈর্ঘ্যের অর্ধেকেরও কম দৈর্ঘ্যে সঙ্কুচিত হয়। এ আচরণ প্রতিরক্ষার কৌশল। সঙ্কোচনের সময় সে বিষ ছড়িয়ে দেয় এবং জলীয় ঘূর্ণির মাধ্যমে আশপাশের জীবদের সতর্ক করে – এক ধরনের রাসায়নিক সংকেত ব্যবস্থা। এর ঠিক বিপরীত আচরণ দেখা যায় সমুদ্রের জ্বলজ্বলে প্ল্যাঙ্কটন পাইরোসিস্টিস নক্টিলুকা-তে। দশ মিনিটেরও কম সময়ে সে নিজের আকার ছয় গুণ বাড়াতে পারে। সপ্তাহে প্রায় ৫০ মিটার খাড়াখাড়ি পথে যাত্রা করে এই জীব। উপরে সূর্যালোক, আর নীচে পুষ্টির খোঁজে। গভীর থেকে উপরে ফেরার সময় সে জল শুষে নিয়ে নিজের ঘনত্ব কমায়। সবশেষে আসে এক ভয়ংকর ‘স্পিডস্টার’ পরজীবী – অ্যানকালিয়া আলজেরি। এই মাইক্রোস্পোরিডিয়া মানুষের কোষে ঢোকে এক ধরনের হারপুন বা কোঁচ ছোঁড়ে, যার গতি সেকেন্ডে ৩০০ মাইক্রোমিটার কি তারও বেশি। মাত্র চার মাইক্রোমিটার লম্বা বীজকোষের বা স্পোরের ভেতর কুণ্ডলী পাকানো এই ‘পোলার টিউব’ মুহূর্তের মধ্যে খুলে গিয়ে কোষে সংক্রমণ ঘটায়। দেড় শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে পরিচিত হলেও, এই প্রক্রিয়া নিয়ে পদার্থবিদ্যা আজও পুরোপুরি ব্যাখ্যা দিতে অপারগ। অণুজীবদের এই দ্রুতগতির কীর্তি শুধু কৌতূহলের বিষয় নয়। এগুলো জীবনের সম্ভাব্য দিকগুলিকেও তুলে ধরে। একই সঙ্গে চিকিৎসা, ইঞ্জিনিয়ারিং কিংবা নতুন ধরনের যান্ত্রিক নকশায় ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির ইঙ্গিতও দেয়। মনু প্রকাশের কথায়, “এদের এই চরম সীমার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে নতুন ভাবনার বীজ।“ অদৃশ্য এই দৌড়ই হয়তো আগামী দিনের উদ্ভাবনের নকশা আঁকছে।

 

সূত্র: Konwable Magazine, February 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

16 + 2 =