নাকের প্রবেশ পথেই প্রতিরোধ 

নাকের প্রবেশ পথেই প্রতিরোধ 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

বার্ডফ্লু বা H5N1 এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে । ২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম শনাক্ত হওয়ার পর এই ভাইরাসটি বন্য পাখির সীমানা পেরিয়ে খামারের প্রাণী ও দুগ্ধবতী গাভীতেও সংক্রমণ ঘটিয়েছে । ২০২২ সাল থেকে ৭০–এর বেশি মানবসংক্রমণ ও একাধিক মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা— প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে বারবার সংক্রমণ ভাইরাসটিকে এমন অভিযোজনে ঠেলে দিতে পারে, যা মানুষে–মানুষে ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়াবে। সম্ভাব্য মহামারির আশঙ্কা তাই উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না ।

এই প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি স্কুল অফ মেডিসিনের গবেষকেরা একটি কৌশলগতভাবে ভিন্নধর্মী সমাধান সামনে এনেছেন: নাকের মাধ্যমে টিকা দেওয়া । প্রচলিত ইনজেকশনভিত্তিক ফ্লু-এর টিকা মূলত রক্তে অ্যান্টিবডি তৈরি করে গুরুতর অসুস্থতা কমায়। কিন্তু শ্বাসতন্ত্রের ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সংক্রমণের প্রথম প্রবেশপথ—নাক ও উপরের শ্বাসনালি সুরক্ষিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন নেসাল/নাসিক স্প্রে টিকাটি ঠিক সেই জায়গাতেই শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তোলে, যা সংক্রমণ শুরুর আগেই ভাইরাসকে আটকে দিতে পারে।

ছোটো ইঁদুর ও ইঁদুরের অন্যান্য প্রজাতির ওপর পরীক্ষায় দেখা গেছে, এই টিকা প্রায় সম্পূর্ণ সুরক্ষা দিয়েছে । একই টিকা ইনজেকশনের মাধ্যমে দেওয়ার তুলনায় নাকের মাধ্যমে স্প্রে আকারে দেওয়ায় আরও কার্যকর ফল দেখিয়েছে । তা একেবারে তৎক্ষণাৎ কার্যকর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে—বিশেষত নাক ও ফুসফুসে। এমনকি উচ্চ মাত্রার ভাইরাস–সংস্পর্শেও সুরক্ষা বজায় ছিল। এই ফলাফল ইঙ্গিত করে, সংক্রমণ ও সংক্রমণ–বিস্তার, উভয় ক্ষেত্রেই নাসিক টিকা বাড়তি সুবিধা দিতে পারে।

গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পূর্ববর্তী মরশুমি ফ্লু–প্রতিরোধের প্রভাব। সাধারণত আগের সংক্রমণ বা টিকার কারণে তৈরি ‘ইমিউন মেমোরি’ নতুন টিকার প্রতিক্রিয়াকে দুর্বল করতে পারে। কিন্তু পরীক্ষায় দেখা গেছে, বিদ্যমান ফ্লু–ইমিউনিটি থাকা সত্ত্বেও এই টিকা শক্তিশালী সুরক্ষা দিয়েছে। বাস্তব জীবনের প্রয়োগে যা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে বৈজ্ঞানিক সাময়িকী সেল রিপোর্টস মেডিসিন–এ। গবেষক দলের সহ-নেতা জ্যাকো বুনের মতে, নাকের মাধ্যমে টিকা দেওয়ার এই পদ্ধতি শুধু গুরুতর অসুস্থতা কমায় না, সংক্রমণ ছড়ানোর সম্ভাবনাও কমাতে পারে, কারণ এটি ভাইরাসকে শুরুতেই থামিয়ে দেয়।

গবেষকেরা H5N1–এর এমন কিছু ভাইরাল প্রোটিন নির্বাচন করেছেন, যা মানবদেহে সংক্রমণের সঙ্গে সম্পর্কিত। সেসব প্রোটিনের সাধারণ বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করে একটি অপ্টিমাইজড অ্যান্টিজেন তৈরি করা হয়। এরপর সেটিকে একটি ক্ষতিহীন, প্রতিলিপিহীন অ্যাডেনোভাইরাসে সংযুক্ত করে নাকের স্প্রে আকারে প্রয়োগ করা হয়। লক্ষণীয়, এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে তৈরি একটি কোভিড–১৯ নাসিক টিকাও ২০২২ সাল থেকে ভারতে ব্যবহৃত হচ্ছে ।

এখনও অবশ্য এটি প্রাণী–পর্যায়ের গবেষণা। গবেষক দল এখন আরও প্রাণী পরীক্ষা ও মানব টিস্যু–অর্গানয়েড মডেলে পরীক্ষা চালানোর পরিকল্পনা করছে । এখনো পর্যন্ত ফলাফল আশাব্যঞ্জক। যদি পরবর্তী পরীক্ষায়ও সাফল্য বজায় থাকে, তবে নাকের স্প্রে–ভিত্তিক এই টিকা ভবিষ্যৎ মহামারি প্রতিরোধে কৌশলগত এক গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। সেক্ষেত্রে লক্ষ্য হবে শুধু রোগের তীব্রতা কমানো নয়, সংক্রমণের শৃঙ্খলই ভেঙে দেওয়া।

 

সূত্র: An intranasal adenoviral-vectored vaccine protects against highly pathogenic avian influenza H5N1 in naive and antigen-experienced animals by Baoling Ying, Kelly Pyles, et.al; published in Cell Reports Medicine, 2026; 102582 DOI: 10.1016/j.xcrm.2025.102582

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

2 × 2 =