নাসার নতুন চন্দ্রাভিযান আর্টেমিস–২  

নাসার নতুন চন্দ্রাভিযান আর্টেমিস–২  

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৯ জানুয়ারী, ২০২৬

প্রায় অর্ধশতাব্দীর নীরবতার পর আবারও চাঁদের দিকে মানুষের প্রত্যাবর্তনের মুহূর্ত ঘনিয়ে এসেছে। চাঁদের দিকে এই নতুন যাত্রা আসলে অতীতের স্মৃতিকে সম্মান জানিয়ে ভবিষ্যতের দিকে সাহসী দৃষ্টিপাত। নাসার নতুন চন্দ্রাভিযান কর্মসূচি আর্টেমিস–২ মানব মহাকাশ অভিযানের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা করতে চলেছে।

দীর্ঘদিন পর আবার মানুষকে চাঁদের পথে পাঠানোর প্রস্তুতিতে নাসার বিশাল নতুন রকেট স্পেস লঞ্চ সিস্টেম (এস এল এস) অবশেষে কেনেডি স্পেস সেন্টারের উৎক্ষেপণ মঞ্চে পৌঁছেছে। এই পদক্ষেপ শুধু একটি প্রযুক্তিগত মাইলফলক নয়, বরং ভবিষ্যৎ চন্দ্রাভিযান ও গভীর মহাকাশ অনুসন্ধানের প্রতি মানবজাতির নতুন প্রত্যয়ের প্রতিফলন।

শনিবার ভোরে ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টারের ঐতিহাসিক ভেহিকল অ্যাসেম্বলি বিল্ডিং থেকে ধীরগতিতে যাত্রা শুরু করে ৩২২ ফুট লম্বা, প্রায় ১ কোটি ১০ লক্ষ পাউন্ড ওজনের এই রকেট। ঘণ্টায় মাত্র এক মাইল বেগে চলা এই চার মাইল দীর্ঘ যাত্রা শেষ হতে পুরো দিন লেগে যায়। এই ধীরে চলার মধ্যেই লুকিয়ে ছিল দশকের অপেক্ষা, ব্যর্থতা পেরিয়ে ওঠার দৃঢ়তা এবং ভবিষ্যতের প্রতি অবিচল আস্থা। হাজার হাজার নাসা কর্মী ও তাঁদের পরিবার এই দৃশ্য প্রত্যক্ষ করতে ভোরের ঠান্ডায় জড়ো হন। বহু বছরের বিলম্ব, প্রযুক্তিগত জটিলতা এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর এই মুহূর্তের জন্যই যেন সবাই অধীর অগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন।

এই রকেটের শীর্ষে রয়েছে ওরিয়ন ক্যাপসুল—যেখানে বসবেন চারজন নভোচারী। তাঁরা হলেন কমান্ডার রিড উইসম্যান, পাইলট ভিক্টর গ্লোভার, মিশন বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টিনা কখ এবং কানাডার নভোচারী জেরেমি হ্যানসেন। আর্টেমিস–২ মিশনটি হবে একটি “আউট-অ্যান্ড-ব্যাক” চন্দ্রাভিযান— অর্থাৎ নভোচারীরা চাঁদের চারপাশ দিয়ে উড়ে আবার পৃথিবীতে ফিরে আসবেন। তাঁরা চাঁদের কক্ষপথে প্রবেশ করবেন না, অবতরণ তো দূরের কথা। ঠিক যেমন অ্যাপোলো-১৭ অভিযানে শেষবার মানুষ করেছিল ১৯৭২ সালে। তারপর দীর্ঘ ৫৩ বছর মানুষ আর চাঁদের পথে যায়নি। এবার সেই ইতিহাস ভাঙতে চলেছে আর্টেমিস–২। এই ১০ দিনের মিশন ভবিষ্যতের আরও সাহসী অভিযানের ভিত্তি গড়ে দেবে।

এই মিশন কোনও হঠাৎ চন্দ্রাভিযান বা অবতরণের গল্প নয়—বরং এটি ভবিষ্যতের প্রস্তুতি। আগের পরীক্ষামূলক উড়ানে ওরিয়ন ক্যাপসুলের তাপরোধী ঢালে ক্ষতি ধরা পড়েছিল। সেই ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে নাসা এবার আরও সতর্ক। ফেব্রুয়ারির শুরুতে জ্বালানি ভরার চূড়ান্ত পরীক্ষা সফল হলেই উৎক্ষেপণের তারিখ ঘোষণা করা হবে।

আর্টেমিস–২–এর প্রকৃত গুরুত্ব লুকিয়ে আছে তার প্রতীকি তাৎপর্যে। তা মনে করিয়ে দেয়, মানুষ এখনও অজানার দিকে তাকাতে ভয় পায় না। আর, স্বপ্ন বড় হলে অপেক্ষাও দীর্ঘ হয়, কিন্তু সেই স্বপ্ন সত্যি হওয়ার মুহূর্তটি ইতিহাসে অমর হয়ে থাকে।

একসময় নীল আর্মস্ট্রং ও বাজ ওল্ড্রিন–এর পায়ের ছাপ যেমন মানব ইতিহাস বদলে দিয়েছিল, মানবজাতিকে আবারও পৃথিবীর গণ্ডি ছাড়িয়ে অজানার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সাহসী পদক্ষেপ হিসেবেই আর্টেমিস–২ ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। নাসার এই অভিযান কেবল অতীতের গৌরব পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা নয়; এটি ভবিষ্যতের চন্দ্রঘাঁটি, মঙ্গল অভিযানের প্রস্তুতি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার এক শক্তিশালী বার্তা।

 

সূত্র: NASA’s new moon rocket moves to the pad ahead of astronaut launch as early as February By MARCIA DUNN, AP News.

Updated 6:03 AM GMT+5:30, January 18, 2026.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

four × 5 =