মানবদেহের অস্থিমজ্জাই রক্ত তৈরির আসল কারখানা। এখানেই জন্ম নেয় লোহিত কণিকা, শ্বেত রক্তকণিকা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কোষ। কিন্তু এই জটিল ব্যবস্থাকে ল্যাবরেটরিতে হুবহু তৈরি করা কি সম্ভব ? এমন ধারণা দীর্ঘদিন শুধু স্বপ্নই ছিল। সেই স্বপ্নকেই বাস্তবে রূপ দিলেন সুইজারল্যান্ডের বেসেল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা।
গবেষকেরা এই প্রথম পূর্ণাঙ্গ মানবকোষ ব্যবহার করে এমন একটি ক্ষুদ্র, ত্রি-মাত্রিক অস্থিমজ্জা মডেল তৈরি করেছেন, যা বাস্তব অস্থিমজ্জার মতোই কাজ করে। এটি কয়েক সপ্তাহ ধরে রক্তকণিকা তৈরির প্রক্রিয়া বজায় রাখতেও সক্ষম। এটি চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক দিক্দর্শী অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মানব অস্থিমজ্জা এক অত্যন্ত জটিল ব্যবস্থা, যেখানে অস্থিকোষ, রক্তনালী, স্নায়ু, প্রতিরোধী কোষ এবং আরও বহু ধরনের কোষ একসঙ্গে মিলেমিশে রক্ত তৈরি করে। বিশেষ করে ‘এন্ডোস্টিয়াল নিচ’ (অস্তিমজ্জার অন্তর্গত ক্ষুদ্র কুঠুরি) নামক অঞ্চলে নতুন রক্ত তৈরির কার্যক্রম সবচেয়ে সক্রিয়। এতদিন এই জটিলতা বোঝার জন্য গবেষকরা প্রাণীদের ওপর নির্ভর করতেন, কিন্তু তা মানব অস্থিমজ্জার প্রকৃত পরিবেশকে পুরোপুরি প্রতিফলিত করতে পারত না। এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার লক্ষ্যেই প্রফেসর ইভান মার্টিন ও ড. আন্দ্রেস গার্সিয়ার নেতৃত্বে বেসেলের এই দলটি পূর্ণাঙ্গ মানবকোষ ব্যবহার করে বাস্তবসম্মত একটি ত্রি-মাত্রিক অস্থিমজ্জা মডেল তৈরি করেছেন। গবেষষণাপত্রটি ‘সেল স্টেম সেল’ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
বেসেলের গবেষকেরা প্রথমে দাঁত ও হাড় থেকে পাওয়া প্রাকৃতিক খনিজ হাইড্রোক্সি-অ্যাপাটাইট দিয়ে একটি কৃত্রিম হাড়ের ফ্রেম তৈরি করেন। এরপর মানবদেহের কোষ থেকে বিশেষ প্রযুক্তিতে বহু কৌণিক বিভাজ্য ক্ষমতা সম্পন্ন মাতৃকোষ ( প্লুরিপোটেন্ট স্টেম সেল) তৈরি করে সেগুলোকে নির্দিষ্ট সংকেত দিয়ে নানা ধরনের অস্থিমজ্জা কোষে রূপান্তরিত করা হয়। ধাপে ধাপে এই কোষগুলোকে কৃত্রিম ফ্রেমে স্থাপন করা হলে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে একটি সত্যিকার কার্যকর অস্থিমজ্জা ব্যবস্থা।
আট মিলিমিটার ব্যাস এবং চার মিলিমিটার বেধ বিশিষ্ট এই মডেলটি আগের যেকোনো ল্যাবে-তৈরি অস্থিমজ্জা কাঠামোর চেয়ে উন্নত, স্থিতিশীল এবং বাস্তবসম্মত। এটি শুধু গবেষণার জন্যই নয়—রক্ত ও অস্তিমজ্জার ক্যান্সার/ লিউকেমিয়া, ওষুধ পরীক্ষাসহ বহু চিকিৎসাক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে।
বিশ্ব জুড়ে এখন প্রাণী পরীক্ষার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে মানব-কেন্দ্রিক গবেষণায় এগিয়ে যাওয়ার যে প্রচেষ্টা চলছে, এই প্রযুক্তি তাতে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ব্যক্তি-রোগীর নিজস্ব প্রয়োজন অনুসারী চিকিৎসা কৌশলও গড়ে উঠতে পারে। প্রতিটি রোগীর নিজস্ব অস্থিমজ্জা মডেল তৈরি করে কোন ওষুধ বা কোন চিকিৎসা পদ্ধতিটি সবচেয়ে কার্যকর হবে তা আগে থেকেই পরীক্ষা করা যাবে। এখনই সে পর্যায়ে পৌঁছাতে আরও কাজ বাকি, তবে এই গবেষণা নিঃসন্দেহে মানব অস্থিমজ্জা গবেষণায় এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
সূত্র: Scientists grow a tiny human “blood factory” that actually works by Qing Li, Marina T. Nikolova,et.al; Materials provided by University of Basel, 20th November,2025.
