পাইন বনে ত্রিপাক্ষিক লড়াই

পাইন বনে ত্রিপাক্ষিক লড়াই

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৯ জানুয়ারী, ২০২৬

পাইন গাছ নিজের শরীরেই তৈরি করে শক্তিশালী রাসায়নিক প্রতিরক্ষা। আর এই রাসায়নিকই পাইন গাছকে ছত্রাকের আক্রমণ ঠেকাতে সাহায্য করে। তবে প্রকৃতিতে বিষয়টা খুব সহজ নয়। স্প্রুস বার্ক বিটল (পাইন বাকল গুবরে) নামে এক ছোট্ট পোকা এই গাছেরই প্রতিরক্ষা রাসায়নিক চুরি করে নিজের ঢাল বানায়। আবার আর এক ধরনের ছত্রাক সেই ঢাল ভাঙার কৌশল শিখে নেয়। ফলে গাছ, পোকা আর ছত্রাকের মধ্যে তৈরি হয় এক জটিল রাসায়নিক লড়াই। পাইন গাছে থাকে ফেনলিক যৌগ। এমন প্রাকৃতিক রাসায়নিক পদার্থ যা ক্ষতিকর ছত্রাককে দূরে রাখে। জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর কেমিক্যাল ইকোলজির গবেষকরা জানতে চান এই রাসায়নিকটি বনজ পরিবেশে কীভাবে এক দেহ থেকে আরেক দেহে ঘুরে বেড়ায়। তাঁদের নজর পড়ে স্প্রুস বার্ক বিটল-এর উপর, যে পোকা গাছের বাকল ও ভিতরের নরম অংশ খেয়ে বেঁচে থাকে। গবেষকদের মূল প্রশ্ন ছিল, গাছের প্রতিরক্ষা কি পোকার নিজের উপকারে লাগতে পারে? উত্তর খুঁজতে তাঁরা আধুনিক রাসায়নিক বিশ্লেষণ পদ্ধতি ব্যবহার করেন। দেখা যায়, বিটল যখন পাইন গাছ খায়, তখন গাছের প্রতিরক্ষামূলক রাসায়নিক সরাসরি পোকার শরীরে ঢুকে পড়ে। এর মধ্যে থাকে স্টিলবিন ও ফ্ল্যাভোনয়েড প্রভৃতি যৌগ। এই রাসায়নিকগুলো পোকার শরীরে ঢুকে আর আগের মতো অবস্থায় থাকে না। বিটল এগুলোকে বদলে ফেলে আরও শক্তিশালী আকারে। মিষ্টি অংশ ছেঁটে দিয়ে তৈরি হয় নতুন যৌগ, যা ছত্রাকের জন্য অনেক বেশি ক্ষতিকর। এরই ফলে বিটল নিজেকে ছত্রাক সংক্রমণ থেকে রক্ষা করতে পারে। গবেষকরা অবাক হন এই দেখে যে, পোকাটি গাছের প্রতিরক্ষা রাসায়নিককে নিজের জন্য আরও কার্যকর অস্ত্রে পরিণত করতে পারে। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। প্রকৃতিতে প্রতিটি সুবিধারই পাল্টা প্রতিক্রিয়া থাকে। এখানে আসে বোভেরিয়া বাসিয়ানা নামের এক ছত্রাক। এই ছত্রাক পোকামাকড় সংক্রমিত করে মেরে ফেলতে পারে। আগে এই ছত্রাক দিয়ে বার্ক বিটল দমন করার চেষ্টা খুব সফল হয়নি। তবে গবেষকরা দেখেন, কিছু ক্ষেত্রে এই ছত্রাকই বিটলকে সংক্রমিত করে মারছে। কীভাবে তা সম্ভব হলো, সেটাই তখন খুঁজতে শুরু করেন বিজ্ঞানীরা। বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই ছত্রাকের আছে বিশেষ এক রাসায়নিক কৌশল। প্রথমে ছত্রাকটা পোকার শরীরে থাকা বিষাক্ত যৌগে আবার মিষ্টি জুড়ে দেয়। এরপর সেই চিনির সঙ্গে যুক্ত করে আরেকটি ছোট রাসায়নিক অংশ। এই দুই ধাপের ফলে তৈরি হয় এমন যৌগ, যা ছত্রাকের কোনো ক্ষতি করে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই নতুন যৌগগুলি আর পোকার শরীরেও সক্রিয় হতে পারে না। অর্থাৎ, বিটল-এর শক্তিশালী রাসায়নিক ঢাল কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। তখন ছত্রাক সহজেই পোকার শরীরে সংক্রমণ ঘটাতে পারে। আরও চমকপ্রদ ব্যাপার হলো, যেসব বিটল পাইন গাছের প্রতিরক্ষামূলক রাসায়নিক বেশি খেয়েছে, তাদের সংক্রমণ ঘটানো ছত্রাকের জন্য আরও সহজ হয়ে যায়। অর্থাৎ, গাছের রাসায়নিক শেষ পর্যন্ত উল্টে পোকারই জন্য বিপদ ডেকে আনে। এই বিষয়টি নিশ্চিত করতে বিজ্ঞানীরা ছত্রাকের সেই জিনগুলো নিষ্ক্রিয় করে দেন, যেগুলি এই রাসায়নিক পরিবর্তনের জন্য দায়ী। দেখা গেল, এই পরিবর্তিত ছত্রাক বার্ক বিটল সংক্রমণে অনেক কম সফল। এতে স্পষ্ট হয়, এই কৌশল ছাড়া ছত্রাক কার্যত দুর্বল। এই গবেষণা দেখায় কীভাবে গাছের প্রতিরক্ষা একাধিক ধাপে রূপ বদলায়। গাছ থেকে পোকা, আর পোকা থেকে ছত্রাকে – শেষ পর্যন্ত এই রাসায়নিক লড়াইই ঠিক করে দেয় কে জিতবে। এই আবিষ্কারের ব্যবহারিক গুরুত্বও আছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ভবিষ্যতে জৈব কীটনাশক হিসেবে ছত্রাক ব্যবহার করতে হলে, পোকার রাসায়নিক প্রতিরক্ষা এবং ছত্রাকের সেই প্রতিরক্ষা ভাঙার ক্ষমতা—দুটোই বুঝে নিতে হবে। এখন গবেষকরা জানতে চাইছেন, এই ধরনের রাসায়নিক কৌশল অন্য ছত্রাকেও আছে কি না এবং বাস্তব বনের পরিবেশে এগুলো কতটা কার্যকর। কারণ প্রকৃতিতে ছোট ছোট রাসায়নিক বদলই বড় লড়াইয়ের ফল নির্ধারণ করে।

 

সূত্রঃ: “Detoxification of conifer antimicrobial defenses promotes entomopathogenic fungus infection of bark beetles” by Ruo Sun, Baoyu Hu, Yoko Nakamura, Michael Reichelt, Xingcong Jiang, Katrin Luck, Christian Paetz and Jonathan Gershenzon, 29 December 2025, Proceedings of the National Academy of Sciences.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

1 − one =