পার্কিনসন্স রোগের নতুন চিত্র 

পার্কিনসন্স রোগের নতুন চিত্র 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৯ মার্চ, ২০২৬

ফিনল্যান্ডের তুর্কু বিশ্ববিদ্যালয় এবং সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের সাম্প্রতিক এক গবেষণা পার্কিনসন্স রোগ সম্পর্কে দীর্ঘদিনের একটি প্রচলিত ধারণাকে নতুন আঙ্গিকে তুলে ধরেছে। এতদিন মনে করা হতো, পার্কিনসন্স রোগে যে ‘রেস্ট ট্রেমর’ বা বিশ্রামরত অবস্থায় হাত কাঁপার সমস্যা দেখা যায়, তা মূলত ডোপামিন নামক নিউরোট্রান্সমিটারের ঘাটতির ফল। কিন্তু নতুন এই গবেষণা বলছে, বাস্তব চিত্রটি অনেক বেশি জটিল।

গবেষণায় ৪১৪ জন রোগীর ক্লিনিক্যাল তথ্য ও ডোপামিন ট্রান্সপোর্টার (DAT) ইমেজিং বিশ্লেষণ করা হয়। এই রোগীরা মূলত পার্কিনসনিজম বা কম্পনের অস্পষ্ট লক্ষণ নিয়ে চিকিৎসাধীন ছিলেন, ফলে এ গবেষণার ফলাফল বাস্তব চিকিৎসা ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে আমেরিকান একাডেমি অফ নিউরোলজির পত্রিকা ‘নিউরোলজি’তে।

পার্কিনসন্স রোগের তিনটি প্রধান উপসর্গ — ধীর গতি (ব্র্যাডিকিনেসিয়া), পেশীর শক্ত হয়ে যাওয়া (রিজিডিটি), এবং বিশ্রামরত অবস্থায় কম্পন (রেস্ট ট্রেমর)। প্রথম দুটি উপসর্গ যে ডোপামিন উৎপাদনকারী নিউরনের ক্ষয়জনিত কারণে হয়, তা আগে থেকেই জানা। সাধারণত এই ক্ষয় মস্তিষ্কের এক পাশে হলে তার বিপরীত পাশে উপসর্গ দেখা যায়।

কিন্তু এই গবেষণায় একটি অবাক করা বিষয় সামনে আসে। দেখা যায়, যেসব রোগীর রেস্ট ট্রেমর বেশি, তাদের মস্তিষ্কের একই পাশে (যেদিকে কম্পন হচ্ছে) ডোপামিন ট্রান্সপোর্টারের কার্যকারিতা তুলনামূলকভাবে বেশি সংরক্ষিত। অর্থাৎ, কম্পনটি ডোপামিনের ঘাটতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়, বরং ভিন্ন একটি স্নায়ুবৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ার ফল।

এই অপ্রত্যাশিত ফলাফলই গবেষণার সবচেয়ে বড় চমক। গবেষণাপত্রের প্রধান লেখক কালে নিয়েমি বলেন, “ কম্পন আসলে ডোপামিনের ঘাটতির সরল প্রতিফলন নয়।‘’ বরং এটি আংশিকভাবে আলাদা স্নায়বিক নেটওয়ার্ক ও প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত।

এখানেই শেষ নয়। গবেষণাটি আরও দেখায়, পার্কিনসন্সের নিদারুণ কষ্টদায়ক দিক, যেমন বিষণ্নতা, উদ্বেগ বা আর ই এম স্লিপ ডিসঅর্ডার, এগুলি শুধু ডোপামিনের ঘাটতি নয়, অন্যান্য মনোঅ্যামিন নিউরোট্রান্সমিটারের কার্যপ্রণালীর সঙ্গেও সম্পর্কিত।

এই গবেষণা সত্যিই আমাদের সামনে পার্কিনসন্স রোগের এক নতুন প্রতিচ্ছবি তুলে ধরল। এটি কেবল একটি রাসায়নিকের ঘাটতির গল্প নয়, বরং বহু স্নায়বিক নেটওয়ার্কের জটিল সমন্বয়। এই নতুন বোঝাপড়া শুধু যে বৈজ্ঞানিক কৌতূহলই মেটায় তার নয়। যা বোঝা যাচ্ছে এটি ভবিষ্যতের চিকিৎসার অভিমুখও বদলে দিতে পারে। একদিন হয়তো রোগীর নির্দিষ্ট উপসর্গ অনুযায়ী, স্বতন্ত্র , আরও নিখুঁত চিকিৎসা সম্ভব হবে। আর সেই পথেই দৃঢ় ভাবে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে এই গবেষণা।

সূত্র: “Striatal Dopamine Transporter and Rest Tremor in Parkinson Disease A Clinical Validation” by Kalle J. Niemi, Elina Jaakkola, et.al;19th March 2026, published in Neurology.

DOI: 10.1212/WNL.0000000000214811

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ten + seven =