সম্প্রতি জাপানের তোহো বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীদের এক গবেষণায় দেখা গেছে, চালের ভূষিতে উপস্থিত ফেরুলিক অ্যাসিড নামক একটি প্রাকৃতিক রাসায়নিক যৌগ, অন্ত্রের পেশির সংকোচন নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিশেষভাবে সক্ষম। এই আবিষ্কার ভবিষ্যতে Irritable Bowel Syndrome (IBS) এবং Inflammatory Bowel Disease (IBD)–এর মতো জটিল অন্ত্রজনিত সমস্যার চিকিৎসায় খাদ্যভিত্তিক নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন ডা. কেইশুক ওবারা , কেনতো ইওশিওকা এবং অধ্যাপক ইওশিও তানাকা। তাদের গবেষণায় দেখা যায়, ফেরুলিক অ্যাসিড অন্ত্রের মসৃণ মাংসপেশির সংকোচনকে কমাতে সক্ষম। কোষের ভেতরে ক্যালসিয়াম প্রবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ হল ভোল্টেজ-নির্ভর ক্যালসিয়াম চ্যানেল। এই যৌগটি ওই চ্যানেল আংশিকভাবে বন্ধ করে দেয়। সাধারণত এই চ্যানেলগুলোর মাধ্যমে কোষে ক্যালসিয়াম প্রবেশ করলে পেশি সংকুচিত হয়। ফলে ফেরুলিক অ্যাসিড যখন এই প্রবাহকে কমিয়ে দেয়, তখন অন্ত্রের অতিরিক্ত সংকোচনও কমে যেতে পারে।
ফেরুলিক অ্যাসিড একটি পরিচিত পলিফেনল, যা প্রাকৃতিকভাবে বিভিন্ন শস্যজাতীয় খাদ্যে পাওয়া যায়। বিশেষ করে চালের ভূষিতে এর পরিমাণ বেশি। এই যৌগটি যে একটি শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং এর যে স্নায়ু সুরক্ষা- দায়ী গুণ রয়েছে সেটা কিছুটা হলেও আগে জানা ছিল । কিন্তু অন্ত্রের চলাচল নিয়ন্ত্রণে এর ভূমিকা নিয়ে এতদিন খুব বেশি গবেষণা হয়নি।
এই গবেষণায় বিজ্ঞানীরা গিনিপিগের অন্ত্রের একটি মসৃণ মাংসপেশি ব্যবহার করে পরীক্ষা চালান। পরীক্ষায় দেখা যায়, ফেরুলিক অ্যাসিড অ্যাসিটাইলকোলিন, হিস্টামিন, প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিন F2α এবং সেরোটোনিন প্রভৃতি বিভিন্ন নিউরোট্রান্সমিটার দ্বারা সৃষ্ট পেশি সংকোচনকে কমিয়ে দেয়। আরও লক্ষ করা যায়, ফেরুলিক অ্যাসিডের ঘনত্ব যত বাড়ানো হয়, এর প্রভাবও তত বেশি শক্তিশালী হয় এবং এই প্রভাবটি আবার উল্টানোও সম্ভব ।
এই পরীক্ষায় বিজ্ঞানীরা দেখতে পান, পটাশিয়াম ক্লোরাইডের প্রভাবে কোষের ভেতরে যে ক্যালসিয়ামের মাত্রা বাড়ে, ফেরুলিক অ্যাসিড তা কমিয়ে দিতে পারে। অর্থাৎ যৌগটি ক্যালসিয়াম চ্যানেলের কাজকর্মে সরাসরি হস্তক্ষেপ করে এবং সেই কারণেই পেশির সংকোচন হ্রাস পায়।
গবেষকদের মতে, এই বৈশিষ্ট্যটি বিশেষভাবে উপকারী হতে পারে যাদের ডায়রিয়া-প্রধান IBS বা IBD রয়েছে, কারণ এতে অন্ত্রের অতিরিক্ত গতিশীলতা কমে যেতে পারে। তবে তারা সতর্ক করে বলেছেন, যাদের কোষ্ঠকাঠিন্য-প্রধান IBS আছে, তাদের ক্ষেত্রে এই প্রভাব কিন্তু উল্টে সমস্যা বাড়াতে পারে।
যদিও পরীক্ষাগারে ব্যবহৃত ফেরুলিক অ্যাসিডের মাত্রা সাধারণ খাদ্যের তুলনায় বেশি ছিল, তবু গবেষকেরা মনে করেন খাবারের মাধ্যমে গ্রহণের পর অন্ত্রের ভেতরে স্থানীয়ভাবে এর ঘনত্ব তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে। তাই ভবিষ্যতে মানুষের ওপর আরও গবেষণা ও ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল প্রয়োজন।
বিজ্ঞানীরা আশা করছেন চালের ভূষির মতো সাধারণ খাদ্য উপাদানে উপস্থিত একটি প্রাকৃতিক যৌগ ভবিষ্যতে অন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা সহায়ক মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।
সূত্র : “Ferulic acid suppresses guinea pig ileal longitudinal smooth muscle contractions by inhibiting voltage-dependent Ca2+ channels” by Keisuke Obara, Kento Yoshioka, and Yoshio Tanaka, 14th May 2025, Journal of Pharmacological Sciences.
DOI: 10.1016/j.jphs.2025.05.012
