পোষ্য প্রাণী ও পরজীবী নাশক ওষুধ

পোষ্য প্রাণী ও পরজীবী নাশক ওষুধ

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৩০ জানুয়ারী, ২০২৬

পোষা কুকুর ও বিড়ালকে মাত্রাতিরিক্ত পরজীবী আক্রমণের থেকে রক্ষা করতে অনেক ওষুধ প্রয়োগ করা হয়। কিন্তু বর্তমানে বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ওষুধগুলো পরিবেশের জন্য এক অপ্রত্যাশিত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে—এমনই সতর্কবার্তা দিচ্ছে সাম্প্রতিক একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণা। এনভায়রনমেন্টাল টক্সিকোলজি অ্যান্ড কেমিস্ট্রি জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে এই গবেষণার বিবরণ। তাতে বলা হয়েছে, আধুনিক পশুচিকিৎসা সংক্রান্ত ওষুধের কিছু রাসায়নিক উপাদান পোষা প্রাণীর শরীর থেকে বেরিয়ে প্রকৃতির গুরুত্বপূর্ণ পোকামাকড়ের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে।

গবেষণার মূল আলোচ্য বিষয় হলো আইসোক্সাজোলিন শ্রেণির পরজীবী প্রতিরোধী ওষুধ। ২০১৩ সালে বাজারে আসার পর এই ওষুধগুলো দ্রুত জনপ্রিয়তা পায়, কারণ এগুলো মুখে খাওয়ানোর মাধ্যমে এক মাস বা তারও বেশি সময় ধরে কুকুর ও বিড়ালকে মাছি ও এটুলি প্রভৃতি পরজীবীর হাত থেকে সুরক্ষা দিতে সক্ষম। কার্যকারিতার দিক থেকে এই ওষুধগুলো নিঃসন্দেহে সফল হলেও, পরিবেশে এর পরবর্তী প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। এই ওষুধগুলো মূলত পোকামাকড়ের স্নায়ুতন্ত্রে আঘাত করে পরজীবী পোকামাকড় ধ্বংস করে। কিন্তু চিকিৎসা শেষ হওয়ার পরও ওষুধের সক্রিয় রাসায়নিক উপাদান পুরোপুরি ভেঙে যায় না। বরং তা প্রধানত মল, পাশাপাশি মূত্র ও ঝরে পড়া লোমের মাধ্যমে পরিবেশে প্রবেশ করে।

ইউরোপিয়ান মেডিসিনস এজেন্সি আগেই সতর্ক করেছে যে, এই ধরনের পরজীবী নাশক ওষুধ মাটি ও জলব্যবস্থায় প্রবেশ করতে পারে। তবে বাস্তবে পরিবেশে এর প্রভাব কতটা গভীর, সে বিষয়ে তথ্য এখনও সীমিত। গবেষকরা বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন যেসব পোকামাকড়কে মারার উদ্দেশ্যে এই ওষুধ তৈরি করা হয়নি তাদের ওপর এর ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে ।

এক্ষেত্রে বিশেষ ঝুঁকিতে রয়েছে গোবরভুক বা মলভুক পোকামাকড়, যেমন মাছি, গুবরে পোকা এবং কিছু প্রজাতির প্রজাপতি। চিকিৎসাপ্রাপ্ত কুকুর বা বিড়ালের মল খেলে এই পোকামাকড় শরীরে আইসোক্সাজোলিনের অবশিষ্টাংশ গ্রহণ করে, যা তাদের স্নায়ুতন্ত্রে মারাত্মক ক্ষতিকারক প্রভাব ফেলছে। এরা প্রাণীর মল ভেঙে মাটিকে উর্বর করে, পুষ্টি চক্র সচল রাখে এবং প্রাকৃতিকভাবে রোগবাহী জীবাণু ও পোকা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই এইসব পোকামাকড়ের সংখ্যা কমে গেলে পুরো খাদ্যজাল ও বাস্তুতন্ত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ফ্রান্সে পরিচালিত গবেষণায় তিন মাস ধরে ২০টি কুকুর ও ২০টি বিড়ালের মল পরীক্ষা করে দেখা গেছে, নির্ধারিত চিকিৎসা শেষ হওয়ার পরও আইসোক্সাজোলিন শ্রেণির কিছু সক্রিয় উপাদান মলে উপস্থিত থাকে। এর পরিবেশগত ঝুঁকি বিশ্লেষণ করে গবেষকরা সতর্ক করেছেন যে, এই অবশিষ্টাংশ মলভুক পোকামাকড়ের জন্য উচ্চমাত্রার বিষক্রিয়ার কারণ হতে পারে এবং এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে পোকামাকড়ের জীবনচক্র ও পরিবেশের স্বাভাবিক ভারসাম্য গুরুতরভাবে ব্যাহত হতে পারে।

এই গবেষণা আমাদের পোষা প্রাণীর চিকিৎসা নিয়ে আতঙ্কিত হতে বলছে না, বলছে এইধরনের ওষুধের দায়িত্বশীল ব্যবহার, উন্নত পরিবেশগত মূল্যায়ন এবং বিকল্প সমাধান অনুসন্ধানের ওপর জোর দিতে। পোষ্যর সুস্থতা যেমন জরুরি, তেমনি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাও সমান গুরুত্বপূর্ন। আধুনিক চিকিৎসা ও পরিবেশগত দায়িত্ব—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব।

 

সূত্র: “Prolonged fecal elimination of isoxazoline antiparasitic drugs in dogs and cats: is there a risk for nontarget species?” by Philippe J Berny, Bernadette España, Julie Auré and Julia Cado, 14th January 2026, Environmental Toxicology and Chemistry.

DOI: 10.1093/etojnl/vgaf285

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

seventeen + sixteen =