প্রাণীরা পৃথিবীকে কেমন দেখে? আমরা পৃথিবীকে যেভাবে দেখি, সেটিই তো প্রকৃতির প্রকৃত রূপ নাও হতে পারে। নতুন এক ক্যামেরা প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষ এই প্রথম দেখতে পাবে, প্রাণীরা কিভাবে পৃথিবীকে দেখে। প্রাণীর দৃষ্টিশক্তি নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করছেন, বিজ্ঞানী ভেরা ভাসাস। তিনি জর্জ ম্যাসন বিশ্ববিদ্যালয়-এর হ্যানলি কালার ল্যাবের সহকর্মীদের সঙ্গে মিলে এমন একটি ক্যামেরা ও সফটওয়্যার তৈরি করেছেন, যা বিভিন্ন প্রাণীর চোখ দিয়ে পৃথিবী দেখার অভিজ্ঞতা তৈরি করতে পারে। প্রাণীরা রঙ দেখে চোখের ভেতরের বিশেষ কোষ, ‘ফোটোরিসেপ্টর’-এর মাধ্যমে। এই কোষের সংখ্যা ও ধরন প্রজাতি অনুযায়ী বদলে যায়। মানুষের চোখে থাকে তিন ধরনের কোষ, যেগুলো লাল, সবুজ ও নীল আলো শনাক্ত করে। তাই আমাদের দৃষ্টিশক্তিকে বলা হয় ত্রিবর্ণ। কিন্তু প্রকৃতির অনেক প্রাণী মানুষের চেয়ে অনেক বেশি রঙ দেখতে পারে যেমন, পাখি। অধিকাংশ পাখির রয়েছে ‘টেট্রাক্রোম্যাটিক দৃষ্টি’। অর্থাৎ, তারা চার ধরনের ফোটোরিসেপ্টর ব্যবহার করে। এর ফলে তারা এমন আলো দেখতে পারে যা মানুষের চোখে ধরা পড়ে না। সেটা হল অতিবেগুনি আলো। এই অতিরিক্ত রঙের জগৎ তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক পাখি সঙ্গী নির্বাচন বা খাদ্য খুঁজে পাওয়ার সময় অতি বেগুনি রঙের সংকেত ব্যবহার করে। একইভাবে মৌমাছি বা অন্য অনেক পোকাও ফুলের উপর থাকা অদৃশ্য অতি বেগুনি নকশা দেখতে পারে। মানুষের চোখে যে ফুলটি হয়তো একরঙা, মৌমাছির কাছে সেটিই যেন আলো ঝলমলে পথনির্দেশক। অন্যদিকে অনেক স্তন্যপায়ী প্রাণীর রঙ দেখার ক্ষমতা, মানুষের তুলনায় কম। কুকুর বা বিড়ালের রয়েছে ‘ডাইক্রোম্যাটিক দৃষ্টি’। তারা মূলত নীল ও হলুদ ধরনের রঙ দেখতে পারে। লাল ও সবুজ তাদের কাছে প্রায় একই রকম লাগে। এই পার্থক্য প্রাণীদের আচরণ ও পরিবেশের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক বোঝার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরেই জানতেন প্রাণীরা ভিন্নভাবে পৃথিবী দেখে। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা মানুষের সামনে তুলে ধরা ছিল কঠিন। একটি পদ্ধতি ছিল ফলস-কালার ইমেজিং। এতে বিশেষ আলোর সাহায্যে প্রাণীর সম্ভাব্য দৃষ্টির অনুকরণ করা হতো। কিন্তু এতে বেশি সময় লাগত এবং আলো নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন ছিল। তাছাড়া চলমান দৃশ্য এতে ঠিকভাবে ধরা যেত না। ফলে বাস্তবে প্রাণীর চোখ দিয়ে পৃথিবী দেখা প্রায় অসম্ভব ছিল। এই সমস্যার সমাধানেই ভাসাসের দল তৈরি করেছে এই নতুন ক্যামেরা ব্যবস্থা। এটি স্বাভাবিক আলোতেই ছবি ও ভিডিও ধারণ করে সঙ্গে সঙ্গে বিশ্লেষণ করতে পারে। ভাসাস বলেন, “আমাদের সিস্টেম চারটি রঙের চ্যানেলে তথ্য রেকর্ড করে—নীল, সবুজ, লাল এবং অতি বেগুনি।”তারপর সফটওয়্যার সেই তথ্যকে রূপান্তরিত করে “পারসেপচুয়াল ইউনিট’’-এ। অর্থাৎ নির্দিষ্ট প্রাণীর ফোটোরিসেপ্টর তথ্য অনুযায়ী সেই রঙগুলোকে এমনভাবে সাজানো হয়, যাতে মানুষের কাছে প্রাণীর দৃষ্টির অনুকরণ তৈরি হয়। পরীক্ষায় দেখা গেছে, প্রচলিত স্পেকট্রোফোটোমেট্রি পদ্ধতির সঙ্গে তুলনা করলে এই প্রযুক্তির নির্ভুলতা ৯২ শতাংশেরও বেশি। অর্থাৎ এটি শুধু অভিনব নয়, বিশ্বাসযোগ্যও বটে। এই প্রযুক্তির দ্বারা একটি পাখি, মৌমাছি বা অন্য কোনো প্রাণীর চোখে পৃথিবী কেমন, তা বিজ্ঞানীদের বুঝতে সাহায্য করবে। ফলে প্রাণীদের আচরণ, যোগাযোগ ও বাস্তুতন্ত্রের ভূমিকা বোঝা আরও সহজ হবে। চলচ্চিত্র নির্মাতারাও এতে বড় সুবিধা পাবেন। ভবিষ্যতে প্রকৃতি বিষয়ক ডকুমেন্টারিতে দর্শকেরা হয়তো দেখতে পাবেন, মৌমাছিকে পথ দেখানো অতি বেগুনি নকশা কিংবা কুকুরের সীমিত রঙের পৃথিবী। ভাসাসের কথায়, “এই প্রযুক্তি মানুষের দৃষ্টি ও প্রাণীর দৃষ্টির মধ্যে ব্যবধান কমিয়ে দেবে। এর মাধ্যমে আমরা যে শুধু প্রাণীদের ভালোভাবে অধ্যয়ন করতে পারি তাই নয়, মানুষকেও এমন এক পৃথিবী দেখাতে পারি, যা তারা আগে কখনও দেখেনি।‘’ প্রাণীদের দৃষ্টিশক্তি বুঝতে গেলে বিবর্তনের কাহিনীও সামনে চলে আসে। উদাহরণ হিসেবে ম্যান্টিস শ্রিম্প-এর কথা বলা যায়। এই সামুদ্রিক প্রাণীর চোখে রয়েছে ১২ থেকে ১৬ ধরনের ফোটোরিসেপ্টর। যা পৃথিবীর সবচেয়ে জটিল দৃষ্টি ব্যবস্থার একটি। তারা অববর্তিত আলোও শনাক্ত করতে পারে। সাপ আবার অন্ধকারে শিকার ধরতে ব্যবহার করে ‘অবলোহিত দৃষ্টি’। আর আর্কটিক অঞ্চলের বলগা হরিণ তুষারের ওপর লুকিয়ে থাকা শিকারি শনাক্ত করতে পারে অতিবেগুনি আলো দিয়ে। এই সব ক্ষমতা কোটি কোটি বছরের বিবর্তনের ফল। একেকটি প্রজাতির দৃষ্টিশক্তি তার পরিবেশ ও বেঁচে থাকার কৌশল অনুযায়ী গড়ে উঠেছে। কখনও এই রঙের পরিসরই নির্ধারণ করে দেয়, একটি প্রজাতি টিকে থাকবে নাকি বিলুপ্ত হবে। সুতরাং প্রাণীরা পৃথিবীকে কীভাবে দেখে তা বোঝা সংরক্ষণ নীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ। ভাসাসের আশা, “এটি আমাদের সাহায্য করতে পারে বাড়ি, রাস্তা বা আলোর ব্যবস্থা তৈরিতে, যাতে বন্যপ্রাণীর উপর নেতিবাচক প্রভাব কম হয়।‘’ নতুন এই ক্যামেরা প্রযুক্তি তাই কেবল একটি যন্ত্র নয়, এটি যেন অন্য প্রাণীর চোখ ধার নেওয়ার উপায়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবী একটিই, কিন্তু তার রঙের জগৎ অসংখ্য। আর সেই অদৃশ্য রঙগুলো দেখতে পারলে হয়তো আমরা প্রকৃতিকে নতুন করে চিনতে শিখব।
সূত্র: Earth.com March, 2026
