বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর 

বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৭ মার্চ, ২০২৬

আজকের পৃথিবীর অন্যতম বড় পরিবেশগত ব্যাধি হল প্লাস্টিক দূষণ। এধরণের দূষণকে আমরা সাধারণত একমুখী সংকট হিসেবেই দেখি। আমাদের ধারণা প্লাস্টিক একবার তৈরি হলে তা প্রকৃতিতে থেকে যায়, ক্ষতি ছড়ায়, আর শেষ পর্যন্ত অবিয়োজ্য বর্জ্যে পরিণত হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক এক গবেষণা আমাদের চিরাচরিত ধ্যানধারণাকে বদলে দিয়ে দেখিয়েছে, এটা একাধারে সমস্যা ঠিকই আবার অন্যদিকে সমাধানের পথও বটে। এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা এমন এক অভিনব পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন। এ পদ্ধতিতে ব্যবহৃত প্লাস্টিক বোতল থেকে পারকিনসন রোগের অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ L-DOPA/ LEVODOPA তৈরি করা সম্ভব হয়েছে।

এই গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে ‘নেচার সাস্টেইনিবিলিটি’ পত্রিকায়। গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে একটি আধুনিক গবেষণা কেন্দ্র Carbon-Loop Sustainable Biomanufacturing Hub (C-Loop)-এ। এই উদ্যোগের লক্ষ্য শিল্প – বর্জ্যকে মূল্যবান উপাদানে রূপান্তরিত করা।

এই গবেষণার মূল আকর্ষণ হলো—এখানে রাসায়নিক প্রক্রিয়ার বদলে ব্যবহার করা হয়েছে জীববৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। বিজ্ঞানীরা বিশেষভাবে পরিবর্তিত ই.কোলাই ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার করেছেন, যা প্লাস্টিককে ভেঙে ধাপে ধাপে ওষুধে রূপান্তর করতে সক্ষম। সাধারণত খাবার ও পানীয়ের বোতলে ব্যবহৃত প্লাস্টিক PET (polyethylene terephthalate)-কে প্রথমে ভেঙে তার মৌলিক উপাদান টেরেপথ্যালিক অ্যাসিডে পরিণত করা হয়। এরপর এই উপাদানকে ব্যাকটেরিয়ার জৈবিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে L-DOPA-তে রূপান্তরিত করা হয়।

এই পদ্ধতির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এর স্থায়িত্ব। প্রচলিত ওষুধ তৈরির প্রক্রিয়ায় প্রায়ই জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হয়, যা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু নতুন এই পদ্ধতিতে প্লাস্টিক বর্জ্যই কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত। ফলে একদিকে যেমন প্লাস্টিক দূষণ কমানো সম্ভব, অন্যদিকে তেমনি মূল্যবান ওষুধ উৎপাদনও করা যাচ্ছে— এক ঢিলে দুই পাখি মারা সম্ভব হচ্ছে।

গবেষকরা জানান, প্রতি বছর প্রায় ৫০ মিলিয়ন টন PET প্লাস্টিক উৎপাদিত হয়, যার একটি বড় অংশ সঠিকভাবে পুনর্ব্যবহার করা যায় না। এই নতুন প্রযুক্তি সেই অপচয় হওয়া কার্বনকে পুনরায় ব্যবহারযোগ্য করে তুলতে সাহায্য করবে।

গবেষণার শীর্ষ নেতা স্টিফেন ওয়ালস এই সাফল্যকে ভবিষ্যতের এক ঝলক হিসেবে দেখছেন। তার মতে, এ তো সবে শুরু। এই প্রযুক্তিকে আরও উন্নত করে শিল্প পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া গেলে এটি শুধু ওষুধ নয়, সুগন্ধি, প্রসাধনী কিংবা বিভিন্ন শিল্প-রাসায়নিক উৎপাদনেও ভূমিকা পালন করবে। তিনি আরও বলেন, প্লাস্টিককে শুধুমাত্র বর্জ্য হিসেবে না দেখে একটি মূল্যবান সম্পদ হিসেবে ভাবা উচিত। বর্জ্য মানেই খারাপ তা নয়; সঠিক প্রযুক্তির স্পর্শে সেটাই হয়ে উঠতে পারে নতুন এক সম্ভাবনা। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার হলে পরিবেশ রক্ষা ও মানবস্বাস্থ্য—দুটিই একসঙ্গে উন্নত করা সম্ভব হতে পারে ।

 

সূত্র: Plastic bottles transformed into Parkinson’s drug using bacteria By Linda Stewart 16th March 2026, published in “Nature Sustainability”.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eleven + 10 =