বার্ধক্যেও সতেজ স্মৃতি

বার্ধক্যেও সতেজ স্মৃতি

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৩ মার্চ, ২০২৬

সম্প্রতি নেচার জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব মানুষের স্মৃতিশক্তি বয়সেও অসাধারণ ভালো থাকে, যাদের আমরা “সুপার এজার’’ বলি, তাদের মস্তিষ্কে নতুন নিউরন তৈরির প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে বেশি সক্রিয়। এই আবিষ্কারটি আমাদের মস্তিষ্কের বার্ধক্য ও স্মৃতিশক্তির সম্পর্ক সম্পর্কে নতুন ধারণা দিয়েছে ।

গবেষকেরা বিভিন্ন বয়সের মৃত দাতাদের মস্তিষ্কের নমুনা পরীক্ষা করেন। এই নমুনাগুলোর মধ্যে ছিল তরুণ প্রাপ্তবয়স্ক, স্বাভাবিকভাবে বয়স্ক মানুষ এবং ৮০ বছরের বেশি বয়সী এমন কিছু ব্যক্তি যাদের স্মৃতিশক্তি আশ্চর্যরকম শক্তিশালী—অর্থাৎ “সুপার এজার’’। বিশ্লেষণে দেখা যায়, যেসব মানুষের মানসিক ক্ষমতা ভালো ছিল, তাদের মস্তিষ্কে নিউরোজেনেসিস (নতুন নিউরন তৈরির প্রক্রিয়া) বয়সের তুলনায় অনেক বেশি সক্রিয় ছিল।

গবেষণায় বিশেষভাবে নিশানা করা হয় মস্তিষ্কের হিপ্পোক্যম্পাস অংশটিকে । এই অংশটি স্মৃতি গঠন ও শেখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞানীরা অনুমান করেন, নতুন তৈরি নিউরনগুলোর সংখ্যা মোট নিউরনের তুলনায় খুবই কম—প্রায় মাত্র ০.০১%। কিন্তু এত সামান্য সংখ্যাও স্মৃতিশক্তি ও মানসিক কার্যক্ষমতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

অন্যদিকে, যেসব মানুষের স্মৃতি-ধারণের ক্ষমতা কমে যাচ্ছিল, বিশেষ করে অ্যালঝাইমার্স-এ আক্রান্ত ব্যক্তিদের মস্তিষ্কে নতুন নিউরন তৈরির প্রক্রিয়া অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিল। তাদের মস্তিষ্কে অপরিণত বা বিকশিত নিউরনের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম দেখা গেছে। কিন্তু “সুপার এজার”দের মস্তিষ্কে অপরিণত নিউরনের সংখ্যা অন্য সব দলের তুলনায় বেশি পাওয়া গেছে। অর্থাৎ তাদের মস্তিষ্ক বার্ধক্যেও নতুন কোষ তৈরি করতে তুলনামূলকভাবে বেশি সক্ষম। তবে গবেষণায় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা খুব কম ছিল। প্রতিটি দলে ১০ জনেরও কম। তাই বিজ্ঞানীরা সাবধানে এই ফলাফল ব্যাখ্যা করতে বলেছেন।

এই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত বিজ্ঞানীরা মনে করেন, যদি তারা বুঝতে পারেন কীভাবে মস্তিষ্ক বার্ধক্যেও নতুন নিউরন তৈরি করে, তাহলে ভবিষ্যতে এমন ওষুধ বা চিকিৎসা তৈরি করা সম্ভব হতে পারে যা স্মৃতিভ্রংশ বা আলঝাইমার রোগে আক্রান্ত মানুষের মস্তিষ্কে নিউরন তৈরির প্রক্রিয়া আবার সক্রিয় করতে সাহায্য করবে।

মজার বিষয় হলো, অতীতে বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করতেন যে মানুষের মস্তিষ্ক জন্মের পরে আর নতুন নিউরন তৈরি করতে পারে না। বিখ্যাত স্নায়ুবিজ্ঞানী Santiago Ramón y Cajal বিংশ শতকের শুরুতে এমন ধারণা দিয়েছিলেন। কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েক দশকের গবেষণা দেখিয়েছে যে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মস্তিষ্কেও নতুন নিউরন তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে হিপোক্যাম্পাস অঞ্চলে।

এই নতুন গবেষণা সেই ধারণাকেই আরও শক্তিশালী করেছে এবং ইঙ্গিত দিয়েছে যে মস্তিষ্কের এই পুনর্গঠন ক্ষমতা হয়তো দীর্ঘদিন সুস্থ স্মৃতিশক্তি বজায় রাখার অন্যতম গোপন রহস্য।

 

 

সূত্র: Brains of ‘super agers’ are strong producers of new neurons Older people with exceptional memory have a surprisingly high number of young neurons, study finds.By Mariana Lenharo, Nature, 25th February 2026. doi: https://doi.org/10.1038/d41586-026-00599-5

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

two + nine =