২০১৯ সালের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ, অর্থকুবের ও দণ্ডিত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টাইন–এর সংশ্লিষ্ট নথি প্রকাশ করতে শুরু করে। সেই সঙ্গেই বিজ্ঞানজগতের অন্দরমহল থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করে এক অস্বস্তিকর সত্য। দেখা যায়, এই বিতর্কিত ব্যক্তির সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল বহু খ্যাতিমান বিজ্ঞানী ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, একের পর এক তথ্য সামনে এলেও একাডেমিক মহলের কোনো সাধারণ প্রতিক্রিয়া ছিল না। যেন কেউ কথা না বললে বিতর্কটা নিজে থেকেই মিলিয়ে যাবে! কিন্তু ঘটনাটি তো কেবল ব্যক্তিগত সম্পর্কের কেলেঙ্কারি নয়, এটি বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা কৃষ্টির গভীরে থাকা এক গুরুতর দুর্বলতারও ইঙ্গিত দেয়। এখানে খুব স্বভাবতই প্রশ্ন আসে, বিজ্ঞান সম্পর্কে কোনো বিশেষজ্ঞতা না থাকা এবং ২০০৮ সালে শিশু যৌন নির্যাতনের অপরাধে দণ্ডিত একজন ব্যক্তি কীভাবে বছরের পর বছর বিজ্ঞানীদের সঙ্গে মিশে গবেষণায় প্রভাব বিস্তার করতে পারলেন? এ প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তাহলে যেসব গবেষক তাঁর সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছিলেন, অর্থ নিয়েছিলেন বা তাঁর অনুরোধে সাহায্য করেছিলেন, তাঁদের ভূমিকা কীভাবে বিচার করা উচিত? এক্ষেত্রে প্রয়োজন তিনটি বিষয়- স্বচ্ছতা, যথাযথ প্রক্রিয়া এবং প্রয়োজনে কঠোর ব্যবস্থা। কোথাও প্রয়োজন হতে পারে সম্মেলন থেকে বাদ দেওয়া, কোথাও বা গবেষক পদ থেকে অপসারণও।
ঘটনাটির সবচেয়ে বড় শিক্ষা আরও গভীর। ধনী পৃষ্ঠপোষকদের সঙ্গে সম্পর্ক, গবেষণা পরিচালনার দায়িত্ব, গবেষকদের একার হওয়া উচিত নয়। এ ধরনের সম্পর্কের উপর প্রতিষ্ঠানের নজরদারি থাকা জরুরি। বিজ্ঞান গবেষণার জন্য অর্থ সংগ্রহ করা স্বাভাবিক। দাতা খোঁজা বা অনুদান গ্রহণ করা কোনো সমস্যা নয়। কিন্তু এপস্টিনের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, অনেক সম্পর্ক বছরের পর বছর চলেছে, এমনকি প্রতিষ্ঠানের প্রশাসন বা তহবিল বিভাগকে না জানিয়েই। পরবর্তীতে কিছু গবেষক দুঃখ প্রকাশ করেন, তাঁরা নাকি গবেষণায় এতটাই ডুবে ছিলেন যে সতর্ক সংকেত বুঝতে পারেননি। কিন্তু এই ব্যাখ্যা আরেকটি সমস্যার দিকে ইঙ্গিত করে। যদি গবেষকদের উপরেই দাতার সঙ্গে সম্পর্কের সব দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলে বিপজ্জনক বা নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ দাতাদের প্রবেশ তো খুব সহজেই অবাধ হয়ে যাবে। তাছাড়া যেসব ভবন, ফেলোশিপ বা পুরস্কার বিতর্কিত দাতাদের নামে রয়েছে, সেগুলো কি সেই নামেই থাকবে? এর আগে এমন নজির রয়েছে। যেমন, অনেক জাদুঘর ও বিশ্ববিদ্যালয় তাদের ভবন বা গ্যালারি থেকে স্যাকলার পরিবারের নাম সরিয়ে দিয়েছে। কারণ তাদের কোম্পানি ‘পারডিউ ফার্মা’–র তৈরি ওষুধ ‘অক্সিকন্টিন’ যুক্তরাষ্ট্রের ওপিওয়েড সংকটের জন্য ব্যাপকভাবে দায়ী বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি নিউইয়র্কের সলোমন আর. গাগেনহাইম মিউজিয়াম এবং লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়াম-এর মতো প্রতিষ্ঠানও সেই নাম বদলেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি কিন্তু এখনও পুরোপুরি আলোচিত হয়নি। এত বড় নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠার সুযোগই বা পেল কীভাবে? বিশ্বজুড়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলি প্রায়ই গবেষকদের ব্যক্তিগত অনুদান খুঁজে আনতে উৎসাহ দেয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনেক গবেষক দাতার নৈতিক বা সামাজিক প্রেক্ষাপট যাচাই করতে অভ্যস্ত নন। কারণ একাডেমিক পদোন্নতি ব্যবস্থায় সতর্কতার চেয়ে বড় অঙ্কের গবেষণা অনুদান আনা-ই বেশি পুরস্কৃত হয়। প্রতিষ্ঠানগুলিও অনেক সময় দাতার অতীত নিয়ে বেশি প্রশ্ন তুলতে আগ্রহী নয়। কারণ অনুদানের একটি বড় অংশ প্রশাসনিক ব্যয় মেটাতে তাদের কাছেই থেকে যায়। ফলে তৈরি হয় এক বিপজ্জনক পরিস্থিতি। যেখানে প্রশিক্ষণহীন গবেষকরা অঘোষিত তহবিল সংগ্রাহকে পরিণত হন, আর নৈতিকভাবে সন্দেহজনক দাতারা সহজেই প্রবেশের পথ খুঁজে পান।
আজও বহু প্রতিষ্ঠানের কাছে ব্যক্তিগত অনুদান গ্রহণের বিষয়ে পরিষ্কার ও স্বচ্ছ নীতিমালা নেই। অথচ বিষয়টি শুধু সুনামের প্রশ্ন নয়, এটি জনস্বার্থেরও বিষয়। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় সরকারি কর ছাড় পায় কারণ তারা শিক্ষা ও জনকল্যাণের কাজ করে। সেই প্রতিষ্ঠানের গবেষকরা যদি ধনী ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত প্রমোদ ভবনে আমন্ত্রিত হয়ে ভোজসভায় অংশ নেন, তাহলে সেই কর-ছাড়ের নৈতিক ভিত্তি প্রশ্নের মুখে পড়ে বৈকি। বর্তমানের স্বার্থ-সংঘাত নীতিগুলোও খুব সীমিত। এগুলো সাধারণত গবেষকের সময় বা দায়িত্বের সংঘাত নিয়ে আলোচনা করে। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন প্রায়ই অনুচ্চারিত থাকে : দাতার মূল্যবোধ কি প্রতিষ্ঠানের মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? বিজ্ঞান গবেষণায় সরকারি অর্থ কমে আসছে, ফলে ব্যক্তিগত অনুদানের গুরুত্ব বাড়ছে। কিন্তু সেই অর্থ গ্রহণের প্রক্রিয়ায় আরও কঠোর যাচাই, স্পষ্ট নীতি এবং গবেষকদের জন্য প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। কারণ শেষ পর্যন্ত এপস্টিনের কাহিনী শুধু একজন ব্যক্তির নয়। এটি এমন এক ব্যবস্থার কাহিনী, যে ব্যবস্থা হয়তো কঠিন প্রশ্ন করতে পারেনি, কিংবা করতে চায়নি। আর বিজ্ঞান যদি হয় সত্যের অনুসন্ধান , তবে সেই অনুসন্ধান শুরু হওয়া উচিত নিজের ঘর থেকেই।
সূত্র : Nature, March 2026
