ব্যাকটেরিয়ার আঁকা ছবি 

ব্যাকটেরিয়ার আঁকা ছবি 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২২ মার্চ, ২০২৬

প্রতি বছর বিশ্বের নানা প্রান্তের অণুজীববিজ্ঞানীরা এক অদ্ভুত প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। এখানে তুলি নেই, নেই রং -এর কোনো টিউব। শিল্পীর সরঞ্জাম বলতে, পেট্রি ডিশে জন্মানো ব্যাকটেরিয়া। এই অনন্য প্রতিযোগিতার নাম আগারে অণুজীব দিয়ে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা। বিষয়টি অবাক করার মতো। অণুজীবের জগৎ আসলে রঙে ভরপুর। বিভিন্ন প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া স্বাভাবিকভাবেই তৈরি করে উজ্জ্বল রঞ্জক। কোথাও দীপ্ত হলুদ, কোথাও গভীর লাল, কোথাও আবার সবুজের আলোকছটা কিংবা বেগুনির আভা। রঙগুলোই হয়ে ওঠে শিল্পীর রংপ্যালেট। আগার হল, এক ধরনের জেলির মতো পদার্থ, যা মূলত লাল শৈবাল থেকে তৈরি। বিজ্ঞান গবেষণাগারে আগার খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি অণুজীব, বিশেষ করে ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য একটি পুষ্টিমাধ্যম । সূক্ষ্ম সূচ বা লুপ দিয়ে বিজ্ঞানীরা ক্যানভাসে আঁকার মতো করে অণুজীবের রেখা ও বিন্দু সাজিয়ে দেন। শুরুতে সেই নকশা চোখে পড়ে না, থাকে মাত্র কয়েকটি ক্ষুদ্র বিন্দু। তারপর শুরু হয় আসল বিস্ময়। কয়েকটি ঘণ্টা কিংবা দিনের ব্যবধানেই ব্যাকটেরিয়াগুলো বংশ বিস্তার করতে থাকে। ছোট্ট বসতি ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে, রাঙিয়ে দেয় পুরো পৃষ্ঠ। প্রথমে যে বিন্দুগুলো প্রায় অদৃশ্য ছিল, সেগুলোই ক্রমে গড়ে তোলে জটিল নকশা। কখনও ফুলের মতো, কখনও জ্যামিতিক রূপ, কখনও আবার পুরো দৃশ্যপটের মতো শিল্পকর্ম। এ যেন ধীরে ধীরে তৈরি হওয়া এক জীবন্ত চিত্রকর্ম। এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করে অণুজীববিজ্ঞানের আন্তর্জাতিক সংগঠন আমেরিকান সোসাইটি ফর মাইক্রোবায়োলজি। শুধু শিল্প প্রদর্শন নয়, তাদের উদ্দেশ্য হল মানুষকে দেখানো যে অণুজীবের জগতটা কতটা রঙিন এবং বিস্ময়কর। তবে এই শিল্প সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকে না। শিল্পীরা মূলত পরিকল্পনা করে থাকেন, কোন ব্যাকটেরিয়া কোথায় বসবে, কীভাবে ছড়াবে, কোন রঙ কোন জায়গায় ফুটে উঠবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যাকটেরিয়ার নিজস্ব আচরণই নির্ধারণ করে ছবির চূড়ান্ত রূপ। অণুজীবেরা যেমনভাবে বৃদ্ধি পায়, তাপমাত্রা বা পুষ্টির প্রতি যেভাবে সাড়া দেয়, সবকিছু মিলিয়েই তৈরি হয় চিত্রের শেষ অবয়ব। ফলে প্রতিটি শিল্পকর্মই অনন্য। একই নকশা দিয়ে শুরু হলেও শেষ ফলাফল কখনও পুরোপুরি এক হয় না। অনিশ্চয়তার মধ্যেই যেন লুকিয়ে থাকে এর সৌন্দর্য। বিজ্ঞান আর শিল্প এখানে যেন এক অদ্ভুত ভারসাম্যে দাঁড়িয়ে। একদিকে মানুষের কল্পনা, অন্যদিকে জীবনের স্বতঃস্ফূর্ততা।

 

সূত্র: Quantum Cookie

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eighteen − fifteen =