ভ্রূণ-জরায়ু নীরব সংলাপ

ভ্রূণ-জরায়ু নীরব সংলাপ

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১ জানুয়ারী, ২০২৬

গর্ভধারণ মানে জরায়ুতে এসে শুধু একটি নিষিক্ত কোষের বাসা বাঁধা নয়। নতুন গবেষণা বলছে, গর্ভধারণের একেবারে প্রথম দিকেই, এমনকি প্রথম ঘণ্টার মধ্যেই ভ্রূণ ও জরায়ুর মধ্যে সক্রিয় যোগাযোগ শুরু হয়ে যায়। এই যোগাযোগের মাধ্যমেই ঠিক হয়, গর্ভধারণ কতটা সফল হবে। আসলে ভ্রূণ কোনো নিষ্ক্রিয় যাত্রী নয়। সে জরায়ুর পরিবেশ বুঝতে পারে, সংকেত পাঠায়, আবার জরায়ুও তার সাড়া দেয়। অর্থাৎ, গর্ভধারণের শুরুতেই দু’পক্ষের মধ্যে একটি জৈব “সংলাপ” তৈরি হয়। গবেষকরা দেখেছেন, ভ্রূণ ও জরায়ুর কোষ একে অপরের দিকে খুব ছোট ছোট কণিকা পাঠায়। এগুলোর নাম এক্সট্রাসেলুলার ভেসিকল। যা দেখতে ক্ষুদ্র বুদবুদের মতো, কিন্তু এর ভিতরে থাকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য – শক্তি জোগানোর জন্য প্রয়োজনীয় চর্বিজাত উপাদান, কোষের কাজকর্ম চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় রাসায়নিক উপাদান এবং জিনগত নির্দেশ বহনকারী অণু। কণিকাগুলোর মাধ্যমে ভ্রূণ জানায়, সে সুস্থ ও সক্রিয়। আবার জরায়ু বুঝতে পারে, সে ভ্রূণটিকে গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত কি না। এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ার অন্তরালে বড় ভূমিকা নেয় নারী-শরীরের হরমোন।বিশেষ করে ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন। হরমোনগুলি জরায়ুর কোষগুলিকে এমনভাবে প্রস্তুত করে, যাতে তারা ভ্রূণের পাঠানো সংকেত বুঝতে পারে। হরমোনের প্রভাবেই জরায়ুর কোষগুলি ঠিক করে, কোন ধরনের বার্তা তারা পাঠাবে বা গ্রহণ করবে। সহজ কথায়, হরমোন যেন জরায়ুকে একটা কান দেয়। অন্যদিকে গবেষণা বলছে, ভ্রূণ মোটেও চুপচাপ বসে থাকে না। সে-ও সক্রিয়ভাবে নিজের শক্তি উৎপাদন বাড়ায়, কোষের কার্যকলাপ জোরদার করে এবং জরায়ুর পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেয়। এই সক্রিয় আচরণ না হলে, ভ্রূণ জরায়ুতে ঠিকভাবে স্থাপিত নাও হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে বারবার গর্ভধারণ ব্যর্থ হওয়ার পিছনে এই যোগাযোগের সমস্যা দায়ী। পরিবেশ ও খাদ্যাভ্যাসের প্রভাবও এই কোষীয় যোগাযোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। বাতাসে থাকা দূষণ, খাদ্যের রাসায়নিক উপাদান বা শরীরে ঢুকে পড়া ক্ষতিকর পদার্থ, সবই এই কণিকাগুলির মাধ্যমে সংকেত হিসেবে প্রভাব ফেলতে পারে। অর্থাৎ, একজন নারীর জীবনযাপন শুধু তাঁর শরীরের উপর নয়, গর্ভধারণের প্রাথমিক সিদ্ধান্তগুলির উপরও প্রভাব ফেলতে পারে। গবেষণাটি মূলত পরীক্ষাগারে কোষের উপর করা হয়েছে। বাস্তব গর্ভধারণে রক্তপ্রবাহ, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং শরীরের নানা জটিল প্রক্রিয়া একসঙ্গে কাজ করে। তাই বাস্তব পরিস্থিতিতে এই ফলাফল কতটা একই রকম হবে, তা বুঝতে আরও গবেষণা প্রয়োজন। তবে এটুকু বলা যায়, ভ্রূণ ও জরায়ুর মধ্যে এই প্রথম ঘণ্টার “নীরব কথোপকথন” সফল গর্ভধারণের ভিত্তি তৈরি করে। ভবিষ্যতে এই জ্ঞান বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসা ও গর্ভধারণ সংক্রান্ত সমস্যার সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।

 

সূত্রঃ Extracellular Vesicles, Lipid Droplets and AhR Ligands in Early Implantation: The Dynamics of Embryo‐Maternal Crosstalk; Alisa Komsky‐Elbaz; et.el ; PMCID

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

20 + 13 =